সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ভারতীয় রেলের ১৬৭ বছরের ইতিহাসে যা ঘটেনি তা ঘটছে। মাঝে গিয়েছে দুই বিশ্বযুদ্ধ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবু বন্ধ হয়নি রেল চলাচল। কিন্তু এবার বাধ্য হয়ে বন্ধ করতেই হয়েছে ভারতীয় রেল পরিষেবা। উদ্দেশ্য করোনা ভাইরাসকে আটকানো। ভয় সংক্রমণের।

দেশে যতই কঠিন পরিস্থিতি হোক না কেন ‘রেল কাম ঝমাঝম’এই শব্দ কখনও বন্ধ হয়নি। কিন্তু এখন তা হচ্ছে। বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, রেল চলেছে। দেশ ভাগ হয়েছে, রেল চলেছে। জরুরি অবস্থা, দেশে রেল থামেনি। কিন্তু ঘটনা হল যে কোনও যুদ্ধে বিপক্ষকে দেখতে পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশ যে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাকে চোখে দেখা যায় না। অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই যে কী কঠিন ভারত টের পাচ্ছে।

তাই সদা সচল রেলের চাক্কা জ্যাম হয়েছে। ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যাচ্ছে যে ভারতীয় রেল দুই বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কাতেও সচল ঠেকেছে সেই রেল আজ বন্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হলে যুক্তরাজ্য, মেসোপটেমিয়া, পূর্ব আফ্রিকায় বিভিন্ন জিনিস পাঠানোর জন্য ইংরেজরা কাজে লাগিয়েছিল রেলকে। রেলপথে সেনা ও খাদ্যশস্য পাঠানো হত তৎকালীন বোম্বাই ও করাচি বন্দর নগরের উদ্দেশ্যে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ভারতে রেল ব্যবস্থা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯২৩ সালে জিআইপিআর ও ইআইআর কোম্পানিদুটির রাষ্ট্রায়ত্ত্বকরণ করা হয়। সরকার এই দুই কোম্পানির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের ভার সম্পূর্ণ নিজের হাতে গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভারতের রেলব্যবস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্থ করে। রেলের রোলিং স্টক সম্পূর্ণটাই চলে যায় মধ্যপ্রাচ্যে। রেলওয়ে ওয়ার্কশপগুলি অস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছিল। তবু রেল চলেছিল। আজ এক অদৃশ্য শত্রুর জেরে বন্ধ রেল পরিষেবা।

প্রসঙ্গত , উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় উপনিবেশিক বাংলায় রেলওয়ে স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে ইংল্যান্ডে চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা শুরু হয়। ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডালহৌসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালক পর্ষদের কাছে ভারতবর্ষে রেলওয়ে স্থাপন কাজ শুরু জন্য অনেকগুলি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। ১৮৪৪ সালে আর.এম স্টিফেনসন কলকাতার সন্নিকটে হাওড়া থেকে পশ্চিম বাংলার কয়লাখনি সমৃদ্ধ রানীগঞ্জ শহর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি গঠন করেন।

এদিকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে ও সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়। ১৮৫০ সালে গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেলওয়ে নামক কোম্পানি মুম্বই থেকে থানে পর্যন্ত ৩৩ কিমি দীর্ঘ রেললাইন স্থাপন করতে থাকে। লাইনটি উদ্বোধন করা হয় ১৬ এপ্রিল ১৮৫৩ সালে। এটিই ছিল ব্রিটিশ ভারতে রেলওয়ের প্রথম যাত্রা। ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ৩৮ কিমি রেললাইনের উদ্বোধন হয় ১৮৫৪ সালে এবং এর মাধ্যমে চালু হয় বাংলার প্রথম রেললাইন।