একদিকে কলকাতায় ধরা পড়া জঙ্গিদের নিয়ে তদন্ত যেমন এগচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে খাদিম কর্তা অপহরণ মামলার দ্বিতীয় দফার রায়দানের দিনও এগিয়ে আসছে৷ এই খাদিম কর্তার মুক্তিপণ বাবদ প্রাপ্ত অর্থই কলকাতা থেকে হাওলার মাধ্যমে পৌঁছেছিল আল-কায়েদার হাতে৷ পৌঁছে দিয়েছিল ডি-কোম্পানির হাওলা সিন্ডিকেট৷ আল-কায়েদার কমান্ডার খালেদ শেখ মহম্মদের কাছে সেই টাকা পৌঁছানোমাত্র আমেরিকার মাটিতে মহম্মদ আটাদের ৯/১১ ঘটানোর ব্যবস্থা পাকা হয়ে যায়৷

আরও পড়ুন: কলকাতা থেকে পলাতক জঙ্গি গ্রেফতার নেপাল সীমান্তে

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

গতকালই লিখেছি, কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চল বহু বছর ধরেই সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি৷ বছরের পর বছর ধরে তারা পশ্চিমবঙ্গকে ট্রানজিট রুট হিসাবে ব্যবহার করছে এবং তাদের যাবতীয় রসদ জোগাড়ের নিরাপদ জায়গাও এই রাজ্য৷ সম্প্রতি সন্ত্রাসবাদীরা তাদের বেআইনি কার্যকলাপের শাখাপ্রশাখা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জায়গাতেও ছড়িয়েছে বটে, কিন্তু নেটওয়ার্কের মূল ঘাঁটি হিসাবে কলকাতাই তাদের কাছে অনেক বেশি ভরসার জায়গা৷ এই শহর এবং লাগোয়া জেলাগুলিতে বহু ভাষাভাষী ও ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বাস করেন৷

আরও পড়ুন: এবিটি-র জঙ্গিদের জেরা করতে কলকাতায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশ

এদেশের বহু বাংলা ও উর্দুভাষী মুসলমান নাগরিক যেমন কলকাতা ও তার আশপাশে থাকেন, তেমনই বাংলাদেশি মুসলিম কিংবা পাকিস্তানি মুসলমান এসে এখানে বাসা বাঁধলে সেটাও ধরার কোনও উপায় এখানে নেই৷ মুশকিলটা আরও বেড়ে গিয়েছে এই জন্যই যে, জাতিধর্মনির্বিশেষে বহু লোকই চাঁদির জুতোর ভক্ত৷ তা সেই টাকাটা ভায়া বাংলাদেশ আরব দুনিয়া থেকেই আসুক আর অন্য যে কোনও জায়গা থেকেই আসুক৷ ফলে, জেনে অথবা না-জেনে এ রকম কত লোক যে ভারত-বিরোধী সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়েছে এবং এখনও পড়ছে, তার লেখাজোখা নেই৷

আরও পড়ুন: কলকাতায় দ্বিতীয় ঘাঁটি বানাতে চাইছে বাংলাদেশি জঙ্গিরা

সংকটটা আরও পেকে উঠছে তার কারণ, পশ্চিম এশিয়ায় আইএস দমনের অভিযানটা একেবারেই স্বচ্ছভাবে এগচ্ছে না৷ কিছু দিন আগে সিরিয়ায় রাক্কা শহর আইএসের দখলদারিমুক্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমেরিকা ও ব্রিটেন যৌথভাবে সেখান থেকে অন্তত ২০০-২৫০ আইএস পরিবারকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে৷

এর পর ওই আইএস পরিবারগুলি যদি অন্য কোনও দেশে গিয়ে হিংসার বিষ ছড়াতে থাকে, তাহলে তার দায় কে নেবে? ভুললে চলবে না, ভারত থেকেও কিন্তু বহু তরুণ-তরুণী মগজ ধোলাই হওয়ার পর আইএসে যোগ দিয়েছে৷ অনেকে তো নিজ ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছে আইএসের হয়ে ‘ধর্মযুদ্ধ’ চালাবে বলে! তার মানে কি আইএসের উত্থান এবং ক্রমবিলুপ্তির পিছনেও কাজ করছে পেট্রোলিয়াম বাণিজ্য সংক্রান্ত কোনও বড় গেমপ্ল্যান? ঠিক যেমন তালিবানের উত্থানের পিছনেও কাজ করেছিল? কিন্তু এদের হামলায় যে কত নিরীহ মানুষ তাদের জীবন হারাল, তার দায় কে নেবে?

আরও পড়ুন: কলকাতায় জঙ্গি-যোগে অভিযুক্ত সংখ্যালঘু সংগঠনের সমাবেশ ঘিরে বিতর্ক

আপাতত ভারতের নিরাপত্তা তথা গোয়েন্দা বাহিনীর অবশ্য অত বড় মাপের চিন্তাভাবনার অবকাশ নেই৷ তাদের কাজ একটাই, আরও বেশি সতর্ক থাকা৷ কারণ, পলিটিশিয়ানদের একমাত্র চিন্তা— তাঁরা কী করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করবেন৷ আর, নিরাপত্তা বাহিনী তথা গোয়েন্দা বাহিনীকে গোটা দেশের সাধারণ মানুষের সুরক্ষার কথা ভাবতে হয়, সেইসঙ্গে তাদের নিজেদের পরিবারবর্গের কথাও৷

আরও পড়ুন: মণিপুরি জঙ্গির বয়ানে কলকাতায় ডাকাতির সূত্র খুঁজছে পুলিশ

ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী তথা গোয়েন্দা বাহিনী অবশ্যই জানে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের সীমান্ত কী রকম পলকা৷ সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে নানা কারণে সেটা মেনেও নিতে হয়৷ না হলে, বহু জায়গাতেই উভয় দিকের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে৷ কিন্তু তার সুযোগ নিয়ে অসংখ্য দুর্বৃত্ত তথা সন্ত্রাসবাদী যে হারে পশ্চিমবঙ্গ তথা অন্যান্য রাজ্যে ঢুকছে তা কি শুধুমাত্র নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের পক্ষে আটকানো সম্ভব? যদি না রাজনীতিকদের সে ব্যাপারে সত্যিকারের সদিচ্ছা থাকে?

আরও পড়ুন: কলকাতা থেকে খাগড়াগড়-কাণ্ডে জঙ্গিনেতাকে গ্রেফতার করল এসটিএফ

কিছু দিন আগে একটি ইংরেজি সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে অন্তত ১৪০টি চোরাচালানের ফাঁক রয়েছে যেখান দিয়ে নাশকতাকারীরা অনায়াসেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকতে পারে৷ সেই ছিদ্রপথগুলি বিএসএফ কখনই একা আটকাতে পারবে না৷ একই অবস্থা নেপাল সীমান্তের প্রহরীদের৷ বিশেষ করে যাঁরা বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে নেপাল সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন৷ কয়েক মাস আগে রক্সৌলের কাছে চোরাচালানকারীদের আটকাতে গিয়ে এমন অবস্থা হয়েছিল যে, ভারতের সীমান্ত প্রহরীরাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন৷ সামরিক বাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল৷

এর পরেও কি বুঝতে অসুবিধা হয়, ভিনদেশি নাশকতাকারী ও চোরাচালানকারীরা এদেশে ঢুকে দাপিয়ে বেড়ায় কাদের মদতে? পয়দার জন্য ইদানীং এদেশের পলিটিশিয়ানদের কোনও রকম ছুৎমার্গ নেই৷ অন্তত তিন-চার দশক ধরে এই ট্রাডিশন সমানে চলছে৷

আরও পড়ুন: হাওড়া সহ কলকাতার আশেপাশেই ঘাঁটি গেড়েছে IS জঙ্গিরা! রিপোর্ট তলব কেন্দ্রের

কিছু দিন আগে ইংরেজি সংবাদপত্রেই আর একটি খবর বেরিয়েছিল৷ আরব থেকে গুজরাত উপকূল বরাবর মাদক চালানের এই রুটের হদিশ পেয়েছে ভারতের নৌবাহিনী৷ কিন্তু তার পর সেই খবরের আর কোনও পরবর্তী সূত্র মেলেনি৷ এই সূত্র লোপাটের পিছনে নিশ্চয়ই নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা বাহিনীর কোনও হাত নেই৷ হয়তো কোনও রাজনৈতিক লবির গায়ে হাত পড়তেই তারা লাফিয়ে উঠেছিল৷ অতঃপর সেই খবর চাপা দেওয়া হয়েছিল৷ হয়তো ওই খবর নিয়ে বেশি এগলে সাংবাদিকেরই প্রাণ সংশয় ঘটত৷

আরও পড়ুন: এবিটি-র জঙ্গিদের জেরা করতে কলকাতায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশ

এই অবস্থায় ভারতের সাধারণ মানুষেরই চোখ-কান খোলা রাখা বেশি দরকার৷ একমাত্র তাঁরাই উপযুক্ত সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে নাশকতাকারীদের হালহদিশ বাতলে দিতে পারেন৷ ২৬/১১-র আগে মুম্বইতে গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ার কাছে আইইডি বিস্ফোরণের পর ওই শহরেরই বস্তির বাসিন্দা জনৈক মুসলমান দর্জি দেখেছিলেন, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলার সময় পাশের ঘর ভাড়া-নেওয়া এক মুসলিম পরিবার খুব হইহুল্লোড় করছে৷ খেলায় পাকিস্তান জিতছিল৷ ওই দর্জির সন্দেহ হয়৷ তিনিই পুলিশে খবর দেন৷ পুলিশ গিয়ে পরিবারটিকে পাকড়াও করার পর জানা যায়, তারা পাকিস্তান থেকে এসেছে এবং গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ায় বিস্ফোরণ কাণ্ড তাদের হাত দিয়েই ঘটিয়েছে পাকিস্তানি সামরিক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই৷

কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা ভারতের জাতিধর্মনির্বিশেষে সাধারণ মানুষ যদি এই রকম সৎ সাহস দেখাতে পারেন, তাহলে কোনও দিনই এদেশে কোনও নাশকতাকারীই হালে পানি পাবে না৷ পপুলার ফ্রন্ট থেকে শুরু করে কোনও রকম সাইনবোর্ডের ঝান্ডা তুলেই তারা তাদের জাল ছড়াতে সক্ষম হবে না.

আরও পড়ুন: কলকাতায় জঙ্গি হামলার আশঙ্কা, সতর্ক করলেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা

- Advertisement -