স্বাগত ঘোষ, কলকাতা: ১৯৭৩ মোহনবাগান ক্লাব থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোয় এনেছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। তবে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়ে প্রথম কয়েকটি ম্যাচে কিছুতেই সেভাবে দাগ কাটতে পারছিলেন না। বাবাকে জানিয়েছিলেন ক্লাবে এসে বাবা যেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। ছাড়বার পাত্র ছিলেন না জ্যোতিষ গুহ। তাঁর জহুরির চোখ যে খুব সহজে রত্ন চিনতে ভুল করেন না।

এরিয়ানের বিরুদ্ধে পরের ম্যাচে না জানিয়েই মাঠে নামতে বলেন ভোম্বলকে। ম্যাচ খেলা নিয়ে টেনশন করার সুযোগটুকু পাননি সেদিনের ভোম্বল অর্থাৎ আজকের সুভাষ ভৌমিক। দূরপাল্লার শটে ওইদিন এরিয়ানের জাল কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এরপর বাকিটা ইতিহাস। বৃহস্পতিবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ইস্টবেঙ্গল শতবর্ষের মূল অনুষ্ঠান শুরু হতে তখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি। ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, বড়ে মিয়াঁ মহম্মদ হাবিবকে নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে আড্ডাচক্রে তখন বেশ নস্টালজিক সুভাষ ভৌমিক।

শতবর্ষের সেরা কোচ হিসেবে প্রদীপ বন্দোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর ফুটবল জীবনে গুরু প্রদীপের সীমাহীন অবদান সম্পর্কেও সাংবাদিকদের ধৈর্য্য ধরে বোঝাচ্ছিলেন সুভাষ। প্রসঙ্গত প্রদীপ বন্দোপাধ্যায়ের কোচিংয়েই ১৯৭৫ মহামেডানের টানা পাঁচবার কলকাতা লিগের নজির ভেঙে টানা ছ’বার লিগ জয়ের নজির গড়েছিল লাল-হলুদ। সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। ওই বছরেই আইএফএ শিল্ড ফাইনালে মোহনবাগানকে ৫ গোলে হারানোর পিছনে সুভাষ ছিলেন অন্যতম কারিগর। ওই ম্যাচে জোড়া গোল এসেছিল শ্যাম থাপার পা থেকে। যার প্রথমটা এসেছিল ভোম্বলের ক্রস থেকেই।

আরও পড়ুন: দ্বিতীয় রাউন্ডেই দৌড় শেষ সাইনার

যাইহোক ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে তাঁর ফুটবলজীবনের স্মৃতি বলতে গেলে হয়তো একটা উপন্যাস তৈরি হয়ে যাবে। তবে শুধু ফুটবলার হিসেবেই তো নয়, পরবর্তীতে প্রশিক্ষক সুভাষও তো লেসলি ক্লডিয়াস সরণির এই ক্লাবের মুকুটে গেঁথে দিয়েছেন একের পর এক পালক। ২০০২-০৩ ও ২০০৩-০৪ প্রথম ক্লাব হিসেবে পরপর দু’বার জাতীয় লিগ জয় থেকে জাকার্তার মাটিতে আসিয়ান জয়। ইস্টবেঙ্গল কোচ হিসেবেও সুভাষের তৃপ্তির ঢেকুর তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তাইতো শতবর্ষ অনুষ্ঠানের ঠিক আগে নিঃসংকোচে বললেন, ‘ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে কোচিংটা করিয়ে আমি বেশি আনন্দ পেয়েছি।’

আরও পড়ুন: কিছু ইতিহাসের কোনও ভৌগলিক গন্ডি হয় না, লাল-হলুদ শতবর্ষ অনুষ্ঠানে তথাগতকে কটাক্ষ মুখ্যমন্ত্রীর

কারণ হিসেবে সবার উপরে অবশ্যই রাখলেন ২০০৩ জাকার্তার মাটিতে বেক তেরো সাসানাকে হারিয়ে আসিয়ান জয়কেই। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুভাষ এদিন বলেন, আসিয়ানে প্রবলতর প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে দেশীয় সংবাদমাধ্যমেও তখন নানা কটুক্তি ধেয়ে এসেছিল ইস্টবেঙ্গলকে ঘিরে। কিন্তু কাপ জয়েই সব সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন তারা। তাই সুভাষ ভৌমিকের কথায়, ‘আসিয়ান জয় ভারতীয় ফুটবলের একটা মাইলস্টোন হয়ে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কাছেই রয়ে গিয়েছে।’

পরবর্তীতে কোনও ভারতীয় ক্লাব আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবলে আর এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারল না। এমনকি ইস্টবেঙ্গলও না। এপ্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তাই শেষবেলায় হতাশা ঝড়ে পড়ল সুভাষ ভৌমিকের গলায়। আসিয়ান জয়ী কোচের কথায়, ‘আসিয়ান জয় তাঁর কাছে যেমন আনন্দের ঠিক তেমনই দুঃখের। কারণ আসিয়ান জয়ের পর ভারতীয় ক্লাব ফুটবল এক পা-ও এগোল না।’