ড. সোমনাথ চ্যাটার্জী, সহকারী অধ্যাপক ,আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ম্যানেজমেন্ট এবং বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এই আতঙ্কে আতঙ্কিত। বেঁচে থাকে শুধু আশা। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখব এক সুন্দর, ভয়হীন, সুস্থ সকাল। সব কিছু আবার আগের মতো। কিন্তু, সত্যই কি তা হবে, নাকি এই অতিমারীর প্রভাবে প্রভাবিত হবে মানব সমাজ? হয়তো সময়ই তার উত্তর দেবে।

ড. সোমনাথ চ্যাটার্জী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে যখন স্বচ্ছতা অভিযানের নীতি প্রনয়ণ করেন, তখন সেই নীতির মূল অন্তদর্শন ছিল পরিচ্ছন্নতা। কারণ রূপে জানা যায় যে, সঠিক পরিচ্ছন্নতা না থাকায় গড়ে প্রত্যেক ভারতবাসী প্রতি বছর প্রায় ৬৫০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ করে। এছাড়াও একই কারণে ডায়েরিয়া, টাইফয়েড প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হয়।

প্রসঙ্গত দেখা যায় যে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির সাথে বিশেষ ভাবে সম্পর্কিত। যদিও এই প্রকল্পের কয়েকটি অসামঞ্জস্য দেখা যায় যেমন, পরিকাঠামোগত উন্নয়নের উৎসাহ সমরূপে সাধারণ জনগণের মনোভাব গঠনে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিবিম্বিত না হওয়া, সরকারি এবং স্বতন্ত্র উদ্যোগে প্রাপ্ত তথ্যে ভিন্নতা প্রভৃতি।

তথাপি ‘স্বচ্ছ ভারত’ প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প রূপে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে শৌচাগার নির্মাণ একটি তাৎপর্যপূর্ণ কার্যকলাপ হলেও মূল ভাবনা ‘পরিচ্ছন্নতা’-কে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।

এই সময়ে কোভিড-১৯ অতিমারীর সাথে যুক্ত হয়েছে সমগ্র মানবসমাজ। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ স্তিমিত করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং তার ডিরেক্টর জেনারেল ডা. টেডরোস আধানম যে কয়েকটি বিধান দিয়েছেন। যেমন সামাজিক দূরত্ব স্থাপন, মাস্কের ব্যবহার, সাবান বা স্যানিটাইজার দ্বারা বারবার হাত পরিস্কার, হাঁচি কাশির সময় টিসুর ব্যবহার ও তার সঠিক নিক্ষেপ, চোখ নাক ও মুখে হাত স্পর্শ থেকে বিরত থাকা প্রভৃতি। সেখানেও পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এখনও পর্যন্ত ভুটান দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা কম থাকার অনেকগুলি কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হল এই পরিচ্ছন্নতা অভ্যাস। সেখানে গ্রামগুলিতে সর্ব সুবিধাযুক্ত, বাঁশ নির্মিত সঙ্গরোধ গৃহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাছাড়া ভুটান দেশের প্রায় সকল গৃহপ্রধানরা সাধারণ জনগণের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সাবান সহ হাত পরিস্কারের ব্যবস্থা করেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারও অতিমাত্রায় কোভিড-১৯ পরীক্ষার (দেশটির ৬৭টি চলমান পরীক্ষা কেন্দ্রে) পাশাপাশি উন্নত পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে দেশে সংক্রমণের সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত রেখেছে, যদিও এই দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট।

বর্তমানে ভয়ঙ্কর ভাইরাসের হামলার সময়ে ‘সামাজিক দূরত্বে’র সাথে ‘পরিচ্ছন্নতা’ আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। আগামীতে এই ভাইরাসের সম্পূর্ণ অবলুপ্তি সম্ভব না হলে ভ্যাকসিনের আবিষ্কার এবং আবশ্যিক পরিচ্ছন্নতাই মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষা করবে। এখন যে কাজগুলি ভীতির কারণে করতে আমরা বাধ্য, আগামী সময়ে তাই সম্ভবত অভ্যাস হবে।

জোর করে মাস্ক বা সাবান-পুলিশের ব্যবহার ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু তার অভ্যাসের জন্য প্রয়োজন ‘বিশ্বাস’। বিশ্বাস বিজ্ঞানের প্রতি, বিজ্ঞান চেতনার প্রতি। আপৎকালীন ভিত্তিতে সেই বিশ্বাসটুকু এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রয়োজন সঠিক ভাবে তা বজায় রাখা।

‘সুস্থতা অপেক্ষা প্রতিরোধ শ্রেয়’ – এই দর্শনের মান্যতার জন্য সার্স, মার্স, ইবোলা ইত্যাদির অভিজ্ঞতা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি বিশ্বাসের সাথে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস। সেক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক জাতীয় প্রকল্প, জাতীয় অভ্যাস এবং অভিজ্ঞতার মিলিত প্রচেষ্টা কোভিড-১৯ বা অন্য কোন অদেখা প্রতিপক্ষকে অনেকখানি প্রতিহত করার দৃঢ়তা অর্জন করবে।

প্রশ্ন অনেক: দ্বিতীয় পর্ব