সুমন ভট্টাচার্য: অরুন্ধতী রায় লিখেছেন আমরা আসলে একটা সরকার চাই|

বুকার জয়ী লেখকের কথা একটু যদি ঘুরিয়ে বলা যায়, দেশের মানুষ এমন একটা সরকার চায় যারা তাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেবে, জীবনের নিরাপত্তা দেবে এবং রোজগারের সুযোগ করে দেবে|

করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই সবকিছুর চাইতে মনুমেন্ট গড়তে বেশি উৎসাহী| দেশে সকলের জন্য ভ্যাকসিনে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে না রাজধানীতে ২০ হাজার কোটি ব্যায়ে সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পে, সেটাই আসলে সরকারের চরিত্র বা অভিমুখ বলে দেয়|

এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, যিনি পদাধিকার বলে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এর ও দায়িত্বে, তিনি অক্সিজেন বা ভ্যাকসিন এর বিলিবন্টন এর জন্য কি করেছেন? মনে রাখবেন এই অমিত শাহ বিপক্ষ দল ভাঙানোর জন্য যথেচ্ছ সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, চাটার্ড ফ্লাইট এবং অর্থের ব্যবহার করেছেন| সেটা শুধু পশ্চিমবঙ্গে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়,রুদ্রনীল ঘোষের মতো রাজনীতিতে অর্বাচীনদের দিল্লি নিয়ে যেতে চাটার্ড ফ্লাইটের ব্যবহার করেছেন তাই নয়, মধ্যপ্রদেশে কমলনাথের কংগ্রেস সরকারকে ফেলতেও জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার মতো বিক্ষুব্ধ নেতাদের জন্য চাটার্ড ফ্লাইট আর পাঁচতারা হোটেলের ছড়াছড়ি ছিল| উত্তর পূর্বের রাজ্য মণিপুরেও যখন বিজেপি র সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেস অনাস্থা এনেছিল, অমিত শাহ বিপক্ষের বিধায়কদের কিনতে চাটার্ড ফ্লাইট আর অর্থের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল|

অমিত শাহ বা তাঁর দল বিজেপি যে টাকা বা মনোযোগ বিপক্ষ দল ভাঙতে ব্যয় করে, সেই অর্থ বিজেপি মানুষের কাছে অক্সিজেন পৌছে দিতে খরচ করেছে? এমনকি অমিত শাহ নিজের রাজ্য গুজরাট বা নিজের লোকসভা কেন্দ্র আমেদাবাদের মানুষদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে ব্যয় করেছেন? গুজরাটের করোনা পরিস্থিতির অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ| হাসপাতালে আগুন লেগে পর্যন্ত করোনা রোগীরা মারা যাচ্ছেন| সেই বিষয়ে অমিত শাহের কি উদ্যোগ?

কেউ যদি বিজেপি সাংসদদের সঙ্গে কথা বলে, তাহলেই বোঝা যাবে কেন্দ্রের শাসক দলের অধিকাংশ সাংসদই জানেন না সরকার কোন পথে চলছে| কবে সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়ার মতো জায়গায় সরকার পৌছবে| বা রাজ্যগুলিই কবে ভ্যাকসিন পাবে|

আদার পুনাওয়ালা বলে যে ভদ্রলোক, যাঁর দিকে বা যাঁর সংস্থা সেরাম টেকনোলজির দিকে গোটা দেশ ভ্যাকসিনের জন্য তাকিয়েছিল, তিনি গিয়ে লন্ডনে বসে আছেন| এবং ব্রিটেনে কত বিনিয়োগ করবেন, সেই বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করছেন| খুব ভালো কথা, কিন্তু তাঁর সংস্থা মাসে কত ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারবে এবং সেই ভ্যাকসিন কেন্দ্র কত পাবে, রাজ্যগুলিকে কি ভিত্তিতে দেওয়া হবে, তা কেউ জানে? না, কেউ জানে না|

বরং ইতিমধ্যেই সরকার পাওয়ার বদলে বেসরকারি সংস্থার হাতে বেশি পরিমাণে চলে যাওয়া শুরু হয়েছে| এবং সেটা হচ্ছে সহজবোধ্য কারণে| কারণ কেন্দ্র যে দাম ঠিক করে দিয়েছে তাতে ভ্যাকসিন উৎপাদক সংস্থা কম দাম পাবে রাজ্য সরকারগুলির কাছ থেকে আর বেশি দাম পাবে বেসরকারি সংস্থার কাছে| এবং কেন্দ্রের তরফে এমন কোনো নির্দেশিকাও নেই যে ভ্যাকসিন আগে রাজ্য সরকারগুলিকে দিয়ে তারপরে উৎপাদক সংস্থাগুলি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারবে|

তার মানে কি? মানে হচ্ছে বড়লোকরা ভ্যাকসিন কিনে নিতে পারবে আর গরিবরা হাসপাতালে হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরবে! এটা কোনো সরকারের নীতি হতে পারে? এটা সবকা সাথ, সবকা বিকাশ?

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো রাজ্যবাসীকে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দিতে চান| কিন্তু উৎপাদক সংস্থা ভ্যাকসিনের যোগান দিতে পারছে না| বাধ্য হয়ে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হয়েছে|

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের ন্যাশনাল মিডিয়া বা ইংরেজি সংবাদমাধ্যম সেরাম কর্তা আদার পুনাওয়ালার কত গাড়ির শখ আছে, কটা কোটি টাকার গাড়ি আছে, তাই নিয়ে খবর করে| কিন্তু সাহস করে জিজ্ঞেস করে না, আপনি ভ্যাকসিন উৎপাদন করে কবে দেশের মানুষকে দেবেন?

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.