“এই তো তোমার আলোকধেনু সূর্য তারা দলে দলে কোথায় বসে বাজাও বেনু চরাও মহা গগণতলে” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেতনায় ধরা পড়েছিল এক প্রেমময় সুরের ছন্দে সূর্য তারা সহ সমগ্র বিশ্বসংসার চালিত হচ্ছে৷ তাঁর অনুভবে ধরা পড়েছিল কোন এক আদি সঙ্গীতের সুর মূর্চ্ছনা কোনো অজানা স্পন্দনে স্পন্দিত হয়ে চলেছে জগৎ মাঝে৷ বোধ হয় এই সুর ঝংকার অনুভব করেই রোমান দার্শনিক Boethius সঙ্গীতের দুই প্রকার শ্রেণীবিভাগ করেছিলেন- Musica Mundana (জাগতিক সঙ্গীত) এবং Musica Divina (দিব্য সঙ্গীত বা মহাজাগতিক সঙ্গীত)৷ “ঐ মহাসিন্ধুর পার থেকে কি সঙ্গীত ভেসে আসে!” Sir Einstein তাঁর আপেক্ষিকতাবাদ (Theory of Relativity) বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেন, “It occured to me by intuition, and music was the driving force behind that intuition. My discovery was the result of musical perception.”

আমরা জানি, উনি বেহালা বাজাতে খুব ভালোবাসতেন৷ এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, কোন্ সেই সুরের সাথে তিনি নিজের চিন্তা তরঙ্গের মিলন ঘটাতে পেরেছিলেন, যার ফলে জগৎ লাভ করলো “আপেক্ষিকতাবাদ” নামক যুগান্তকারী এক তত্ত্ব৷ আবার দেখি, বিজ্ঞানী Fritjof Capra তাঁর “The Tao of Physics” এ লিখছেন, “I saw the atoms of the elements and those of my body participating in this cosmic dance of energy, I felt its rythm and I heard its sound…”- এখানে ‘saw’, ‘heard’ এই শব্দগুলি ‘felt’ শব্দের সমতুল বলেই বোঝা উচিত। তাই বলে, এগুলো বিজ্ঞানীর নিছক imagination নয়, এটা তাঁর realization বা perception।

জগতে এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে মানুষ শান্ত হয়ে অন্তর্মুখী হয়ে সাধনা করতে করতে জগৎ জুড়ে প্রবহমান সুরটিকে উপলব্ধি করেছেন। ভারতবর্ষে সঙ্গীতশাস্ত্র শুধু বিনোদনের জন্য আবিষ্কৃত হয়নি; এটি এমন এক উৎকৃষ্ট পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল যেখানে নিষ্ঠাসহ সঙ্গীতচর্চা করে মানুষ পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারতেন। কণ্ঠ নিঃসৃত সুর সঙ্গীত কখন যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় সেই বৃহৎ মহাজাগতিক সুরের সাথে যা অনেক রহস্যের দ্বার উন্মোচন করে দিতে পারে।

শ্রীমদভাগবতের মধ্যে আছে, চার বেদ সৃষ্টি হওয়ার পর চার উপবেদ সৃষ্টি হয়, যেগুলির মধ্যে গান্ধর্ববেদ বা সঙ্গীত শাস্ত্র অন্যতম।
আয়ুর্বেদম্ ধনুর্বেদম্ গান্ধর্বম্ বেদমাত্মনঃ।
স্থাপত্যম্ চাসৃজদ্ বেদং ক্রমাৎ পূর্বাদিভির্মুখৈ ।।” (৩/১২/৩৮)
অর্থাৎ, চিকিৎসা বিদ্যা, অস্ত্র বিদ্যা, সঙ্গীত ও স্থাপত্য বিদ্যা – এই চারটি বিদ্যাকে ভারতবর্ষে উপবেদ বলা হলো। চার বেদের মধ্যে একটি হলো সামবেদ। শ্রীমদ্ভগবদ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন, “বেদানাং সামবেদঃ অস্মি” অর্থাৎ বেদের মধ্যে তিনি সামবেদ। মূল বিষয়টি তুলে আনতে হলে বলা চলে, বেদের মধ্যে সামবেদ শ্রেষ্ঠ বা সামবেদের মধ্যে সুন্দরের প্রকাশ বেশী। সামবেদের মন্ত্রগুলি সঙ্গীতের আকারে সৃষ্ট অর্থাৎ সুর সহযোগে গীত হয়। ভারতবর্ষে সঙ্গীতের চর্চা শুরু হয়েছিল এই সামগানের মধ্য দিয়ে। সঙ্গীতের ভিত্তি বা base যে সপ্ত সুর, অর্থাৎ ষড়্জ (সা), ঋষভ (রে), গান্ধার (গা), মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা), ধৈবত (ধা), নিষাদ (নি)- যার উল্লেখ শ্রীমদ ভাগবতে আছে, “স্বরাঃ সপ্ত বিহারেণ ভবন্তি স্ম প্রজাপতে।” (৩/১৩/৪৭)

ভারতবর্ষে যে সময় বেদের চর্চা হতো, সেইসময় পৃথিবীতে এত উন্নত কোনো সভ্যতার জন্মও হয়নি। Ethel Rosenthal তাঁর “The story of Indian music and instruments” গ্রন্থে লিখেছেন, “This ancient art (Music) was developed and finally tuned in India at a time when most of the world was still ignorant of the beauty and solace that could be found in it.”

সঙ্গীত বলতে আমরা বুঝি বিভিন্ন মাত্রার শব্দের একটি পর্যায়ক্রমিক শ্রুতিমধুর সজ্জা। কোনো ব্যক্তির কণ্ঠই হোক বা কোনো বাদ্য যন্ত্র, সুর বা সঙ্গীত সেই শব্দেরই খেলা। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে মৌলিক স্বর সাতটি- সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি। এই যে ক্রমবর্ধমান কম্পাঙ্ক বিশিষ্ট সাতটি স্বর রয়েছে, তাদের সমবায়কে সপ্তক বা octave বলে। কম্পাঙ্ক বলতে বোঝায়, স্পন্দনশীল শব্দ-উৎসের স্পন্দনের হারকে অর্থাৎ, কত দ্রুত একটি শব্দ মাধ্যম কম্পিত হচ্ছে। কম্পাঙ্কের প্রকারভেদে মানুষ মোট তিনটি সপ্তক পর্যন্ত গাইতে পারে। সেগুলি হলো, মন্দ্র সপ্তক (Lower Octave), মধ্যম সপ্তক (Medium Octave) ও তার সপ্তক (Higher Octave)। সবথেকে কম কম্পাঙ্ক বিশিষ্ট শব্দগুলোর যে সমবায় তাকে মন্দ্র বলে। মধ্যম সপ্তকের ‘সা’ এর কম্পাঙ্ক মন্দ্র সপ্তকের ‘সা’ এর কম্পাঙ্কের দ্বিগুণ।

একইভাবে তার সপ্তকের ‘সা’ এর কম্পাঙ্ক মধ্যম সপ্তকের ‘সা’ এর কম্পাঙ্কের দ্বিগুণ। শব্দ আমাদের শরীর মধ্যস্থ বাতাসের চাপে গলায় অবস্থিত ভোকাল কর্ড-এর কম্পনের ফলে উৎপন্ন হয়। গলার বিভিন্ন অংশ থেকে বিভিন্ন গ্রামের সুর সৃষ্টি হয়। যেমন গলার উপরিভাগ থেকে উদাত্ত, নিম্নভাগ থেকে অনুদাত্ত ও মধ্যভাগ থেকে স্বরিত- এগুলির সাহায্যে সঙ্গীতের সুর বাঁধা হয়। এছাড়াও natural notes, half notes, যথা- কোমল রে, কোমল গা, কোমল ধা, কোমল নি, এবং একটি তীব্র স্বর, তীব্র মা- মোট ১২ টি স্বর রয়েছে। স্বরগুলির বিভিন্ন অন্তর্বর্তী স্বরের ধারণা প্রাচীন ভারতবর্ষে ছিল, যার নাম ‘শ্রুতি’। এবং এইরকম শ্রুতির সংখ্যা হলো ২২।

এগুলির নির্দিষ্ট নাম আছে, যেমন- তীব্র, কুমুদবতী, ছন্দ, দয়াবতী, রঞ্জনি প্রভৃতি। ‘সঙ্গীত পারিজাত’, ‘সঙ্গীত দর্পণ’ প্রভৃতি গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে তাত্ত্বিক ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ভারতীয় সঙ্গীতের মধ্যে (Classical Music) Higher, Medium, Lower সমস্ত octave-এর সুরই সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এবং সমস্ত ধরণের শ্রুতির ব্যবহারও ছিল। সংগীতজ্ঞ বাবু নানক প্রসাদের মতে, “A man ought to sing in the middle one and rise up in the third or go down in the first so that they may be able to produce all varieties of melody. However, the present practice is to sing usually in the highest octave…. this necessarily keeps the voice in one and the same octave, it being impossible to rise higher and weak seeming to fall lower.” তাই সুরের যে বিবিধ বৈচিত্র্য বা variety তা অনেকাংশে কমে গেছে। স্বামী হরিদাস, তানসেন প্রমুখরা দ্বিগুণ মন্দ্র বা double lower octave পর্যন্ত গাইতে পারতেন বলে শোনা যায়।

রাগ রাগিণীর সৃষ্টি একটি সুচিন্তিত বিজ্ঞান। এর মধ্যে permutation, combination, sequence, generating function প্রভৃতি গাণিতিক ধারণা সুস্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হয়। বারোটি স্বরের একটি combination যা একটি শ্রুতিমধুর নির্দিষ্ট সুর সৃষ্টি করে, তাকে রাগ বলা হয়। প্রাচীন ভারতে মূলত ছটি প্রধান রাগের কথা জানা যায়- ভৈরব, শ্রী, মালকোষ, হিন্দোল, দীপক ও মেঘ। প্রত্যেকটি রাগের মধ্যে আরও বিভিন্ন প্রকারের সজ্জা গঠন করে সুর সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের রাগিণী বলে। এইরকম রাগের সংখ্যা প্রতিটি রাগের জন্য ৫ টি বা মতান্তরে ৬ টি করে ছিল অর্থাৎ প্রায় ৩৬ টি মূল রাগিণী পাওয়া যায়। রাগিণীর নামকরণে বিভিন্ন মতভেদ আছে তবে সুরের প্রকৃতি অনুসারে তাদের মধ্যে বিভিন্নতা নেই।

বর্তমানে প্রধানত চারটি মত বিশেষ ভাবে স্বীকৃত- কালিনাথ মত, সোমেশ্বর মত, হনুমান মত ও ভরত মত। ভৈরবী, বাঙালী, বরদী প্রভৃতি ভৈরব রাগের রাগিণী, তোদী, খম্ববতী, গৌরী প্রভৃতি মালকোষের রাগিণী, বিলাবলী, ললিতা, দেবশাখ্যা প্রভৃতি হিন্দোলের রাগিনী, আশাবরী, ধনশ্রী, মালশ্রী প্রভৃতি শ্রী রাগের রাগিণী, কন্দরা, দেশী, কম্বোদি প্রভৃতি দীপকের রাগিণী এবং মল্লার, ভূপালি, গুজরি মেঘ রাগের রাগিণী। এই মূল কয়েকটি রাগিণীর সজ্জাগুলির সংমিশ্রণে নতুন নতুন আরও রাগিণী ভারতবর্ষে চলে আসছে যাদের অনেকে রাগ-রাগিণীর পুত্র, কন্যা, অপত্য ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করেন। এই রাগ রাগিণী গাইবার জন্য সময় নির্দিষ্ট ছিল। যেমন- গ্রীষ্মকালে দীপক, বর্ষাকালে মেঘ, শরৎ কালে ভৈরব, হেমন্তকালে শ্রী, শীতকালে মালকোষ ও বসন্তকালে হিন্দোল। আবার দিনের কোন সময় কোন রাগ রাগিণী গাওয়ার আদর্শ সময়, তারও নিয়ম আছে। যেমন- ভোরবেলা ভৈরবী, আশাবরী প্রভৃতি আবার রাত্রিবেলা কল্যাণ, বিলাবল প্রভৃতি। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে রাগ-রাগিণী গাইবার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ভারতবর্ষে ছিল। এথেকে সহজেই বোঝা যায়, প্রকৃতি ও সুরের মধ্যে যে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ আছে, তা ভারতবর্ষ জানতো বহু প্রাচীনকালে।

হান্স ক্রিশ্চান অ্যাণ্ডারসন বলেছিলেন, “where word fails music speaks.” তাই দেখা যায়, সঙ্গীত চর্চায় নিমগ্ন থাকা নিষ্ঠাবান মানুষ সঙ্গীতের সাহায্যে পৌঁছে যান অন্য এক জগতে, সৃজনশীলতার জগতে, সুরের জগতে, প্রেমের জগতে। আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের সুর নিজের আত্মাকে সেই পরমাত্মার সঙ্গে একই ছন্দে বাঁধার প্রয়াস। তা সে প্রাচীন সামগানই হোক কিংবা সহজিয়া সাধকদের গান বা এক কথায় ভক্তিগীতি। ভারতীয় দেবদেবীর মূর্তিতেও বিভিন্ন রকমের বাদ্য যন্ত্র লক্ষ্য করা যায়। সরস্বতীর বীণা, মহাদেবের ডমরু, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি প্রভৃতি। শব্দ-ভক্তি-প্রকৃতি তিনটি বিষয়ই মানুষের মনে গভীর ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “A singer has everything within him. The notes come out from his very life. They are not materials gathered from outside.” ভারতীয় সঙ্গীত এই অন্তরের সত্যটির সন্ধান, বাইরে থেকে আগত কোনো আগন্তুক বিষয় নয়।

রাগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর মধ্যে আরোহী ও অবরোহী- এই দুটি বিষয় সুস্পষ্ট রূপে বর্তমান থাকে। আরোহী হলো ক্রমবর্ধমান (Ascending) স্বরের ব্যবহার আর অবরোহী হলো ক্রমহ্রাসমান স্বর (Descending)। সাত টি স্বরের মধ্যে সবগুলি স্বর আরোহী বা অবরোহীতে ব্যবহৃত হলে তাকে বলে সম্পূর্ণ, ছয়টি ব্যবহৃত হলে তাকে ষড়ভ, পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হলে তাকে অরভ বলে। আরোহণ ও অবরোহণে স্বরের সংখ্যা অনুযায়ী আবার রাগের শ্রেণীবিভাগ আছে। যেমন, সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ, সম্পূর্ণ-ষড়ভ, ষড়ভ-ষড়ভ ইত্যাদি। সাত টি স্বর আরোহীতে ও সাত টি স্বর অবরোহীতে ব্যবহৃত হলে তাকে সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ, সাতটি স্বর আরোহীতে ছয়টি অবরোহী তে থাকলে সম্পূর্ণ-ষড়ভ ইত্যাদি। এর থেকে বোঝা যায় সুরের বৈচিত্র্য কত ব্যাপক হতে পারে।

ভারতীয় সঙ্গীতে বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। কণ্ঠ সঙ্গীতের সঙ্গতে ব্যবহৃত হওয়া ছাড়াও শুধুমাত্র যন্ত্রসঙ্গীত বা instrumental হিসাবে সব যন্ত্রই স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেই ধারা বর্তমান কালেও বহুল পরিমাণে দেখা যায়। সুর সৃষ্টি বা সুর বাঁধার ক্ষেত্রেও বাদ্যযন্ত্রের বিশেষ ভূমিকা আছে। বাদ্যযন্ত্রের বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগ আছে। বৈদিক যুগে বিভিন্ন ধরণের বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে, যেমন- দুন্দুভি (normal drum), ভূমি দুন্দুভি (earth drum), সুশির (flute) প্রভৃতি। রামায়ণ, মহাভারতে অনেক জায়গায় বাদ্য যন্ত্রের উল্লেখ আছে। ভারতবর্ষে মূলত চার ধরণের বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়, যথা- তন্তু, সুশির, অবনদ্ধ ও ঘন।

তন্তু বাদ্য– তারের বাদ্য যন্ত্র। এটি তত (plucked sting) ও বিতত (bowed sting) এই দুইভাগে বিভক্ত। তত হলো সাধারণত আঙ্গুলের সাহায্যে তারের ওপর টান দিয়ে বাজানো বাদ্য যন্ত্র- রুদ্র বীণা, মোহন বীণা, সরস্বতী বীণা, সরোদ, সেতার, তানপুরা প্রভৃতি আর বিতত হলো কোনো দণ্ডের সাহায্যে তারে টান দিয়ে বাজানো বাদ্য যন্ত্র- সারেঙ্গী, এসরাজ প্রভৃতি।

সুশির– বাতাসের সাহায্যে যে সমস্ত বাদ্য যন্ত্র বাজানো হয়। যেমন- বাঁশি, সানাই, শঙ্খ প্রভৃতি। যুদ্ধের সময় ভারতবর্ষে বীর যোদ্ধাদের শঙ্খ বাজানোর রীতি ছিল। যেমন- শ্রীকৃষ্ণের শঙ্খ পাঞ্চজন্য, অর্জুনের দেবদত্ত প্রভৃতি।

অবনদ্ধ– চামড়ার উপরে হাত, আঙ্গুল বা কোনো বস্তু দিয়ে বাজানো বাদ্য যন্ত্র। যেমন- পাখোয়াজ, তবলা, নাকাড়া, ঢোল, মৃদঙ্গ প্রভৃতি।

ঘন– ধাতব বাদ্য যন্ত্র যার উপর হাত বা কোনো বস্তুর সাহায্যে আঘাত করে শব্দ উৎপন্ন হয়। যেমন- খঞ্জনি, জলতরঙ্গ, মঞ্জিরা, করতাল প্রভৃতি।

সুর (melody) হলো ভারতীয় সঙ্গীতের প্রাণ যেখানে ঐক্যতান (harmony) হলো পাশ্চাত্য সঙ্গীতের বিশেষত্ব। অনেক ধরণের বাদ্য যন্ত্রাদি ও একাধিক কণ্ঠের সঙ্গতে একটা harmony তৈরী করে শ্রোতার মনোরঞ্জনই পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মধ্যে বিশেষ ভাবে দেখা যায়। আজকাল ভারতীয় সঙ্গীতও অনেকাংশে পাশ্চাত্যের ধাঁচে তৈরী হয়। বর্তমানে ভারতে ভালো সুর বা সঙ্গীত তৈরী হয়না এমন নয়, পাশ্চাত্য সঙ্গীত যে সমৃদ্ধ নয়, তা তো নয়ই, কিন্তু যা আমাদের নিজস্ব সেই ভারতীয় সঙ্গীত পৃথিবীর মধ্যে উৎকৃষ্টতম। তাকে হারিয়ে ফেলা বোধ হয় সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ভারতীয় সঙ্গীতের মূল অনেক গভীরে প্রোথিত, অনেক বেশী অন্তর্মুখী। বাইরে শ্রুতি মধুর সুরমুর্চ্ছনা, অন্তরে সুন্দরের আরাধনা। ভারতবর্ষের সমস্ত বিদ্যার উদ্দেশ্য ছিল সত্য উপলব্ধি।

উৎসের (কণ্ঠ বা বাদ্যযন্ত্র) কম্পনের ফলে শব্দ উৎপন্ন হয়ে তরঙ্গাকারে বাতাসের সংকোচন প্রসারণ ঘটিয়ে শ্রোতার কানে এসে পৌঁছায়। সেই পর্যায়ক্রমিক শব্দ ধারায় প্রভাবিত হয়ে শ্রোতার মস্তিস্ক সেই শব্দের প্রকৃতি অনুযায়ী একটি ভাব সৃষ্টি করে। যদি এই শব্দ ধারার প্রভাব শ্রোতার আভ্যন্তরীক অনুভূতির চেয়ে তীব্রতর হয়, তবে তাঁর মানসিক অবস্থা সেই সঙ্গীত বা সুরের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরিবর্তিত হয়ে যায়। শব্দের গুণভেদ আছে- সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক। মহালয়ার পুন্য প্রভাতে যখন “নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ” আমাদের কানে এসে পৌঁছায় তখন মন এক পবিত্র, সুন্দর, সাত্ত্বিক আনন্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে, মায়ের স্তুতি সঙ্গীত শ্রবণে মাতৃ মূর্তি মানসপটে ভেসে ওঠে, তাঁর চরণ কমলে প্রণত হতে ইচ্ছে করে। স্বাধীনতা দিবসের শুভ্র সকালে দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের সুরে ও সুসংযত সঙ্গতে অন্তরে জেগে ওঠে দেশপ্রেমের অনুভূতি। আবার উচ্চৈস্বরে অনেক বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগে সৃষ্ট গান শুনে মন হয়ে ওঠে চঞ্চল। যে শব্দ মনকে শান্ত করে, সুস্থ চিন্তার সহায়ক সেই শব্দ হলো সাত্ত্বিক। যা মনকে চঞ্চল করে তা রাজসিক শব্দ এবং যে গান বা সুর মনে বিষণ্ণতার জন্ম দেয় তা হলো তামসিক শব্দ। এই সমস্ত ভাব একই মানুষে দৃষ্ট হয়।

সঙ্গীতের মধ্যে প্রেম, হাস্য, আনন্দ, শোক, ক্রোধ, উৎসাহ, ভয়, বিস্ময় প্রভৃতি ভাব এবং শৃঙ্গার, হাস্য, বেদনা, বীর, ভয়ঙ্কর, অদ্ভুত, শান্ত প্রভৃতি বিবিধ রসের সমাবেশ থাকে। ভরতমুনি রচিত ‘নাট্যশাস্ত্র’ নাটক সঙ্গীত ও নৃত্যকলার একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ। জাগতিক ও ঐশ্বরিক সমস্ত রকমের ভাব ও রসের বিষয়ে ভারতবর্ষে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে, ভারতবর্ষ কখনোই জগৎকে অস্বীকার করেনি। মনোজগতের ঊর্ধে উঠে নির্বেদ অবস্থা প্রাপ্তির পথে অগ্রসরমান হলেও প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জাগতিক ও দিব্য সকল প্রকার ভাব ও রসের সন্ধান দিয়ে গেছেন।

রাগ-রাগিণীর প্রত্যেকটির এক একটি মূর্তি নিরূপন করেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানের প্রভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিজ্ঞানীরা যন্ত্রের সাহায্যে দেখিয়েছেন স্বাভাবিক মানুষের কন্ঠস্বর কিভাবে এক একটি জ্যামিতিক ছবি বা মূর্তির রূপ পরিগ্রহ করছে। শব্দ তরঙ্গের কম্পাঙ্ক, তীব্রতা, প্রাবল্য, বিস্তার প্রভৃতির বিভিন্নতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি সৃষ্টি হয়। যন্ত্রটি শব্দ তরঙ্গের সংশ্লিষ্ট রূপটিকে ফুটিয়ে তোলে।

প্রাচীন ভারতীয়রা সূক্ষ্ম ভাবে পর্যবেক্ষণ করে রাগ-রাগিণীকে পুরুষ স্ত্রী এই দুভাবে ভাগ করেছেন এবং প্রত্যেকটির রূপ কেমন তাও ব্যাখ্যা করেছেন। ভারতবর্ষে সঙ্গীত একটি সাধনা, মনকে অন্তর্মুখী করে সেই মহান সুরের আনন্দে আত্মনিষ্ঠ হওয়া। সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা মহাশয় বলেছেন, “spirituality and music in our country were inseparable, but in course of time due to many factors we are sort of losing out that tradition.” অনেক বছর পূর্বে ছোট্ট নিষ্পাপ অমিতবীর্য দুই কুমার লব ও কুশ তাদের সুমিষ্ট কণ্ঠ ও সিদ্ধ সুরের প্রয়োগে রামায়ণ গান গেয়ে অযোধ্যা বাসীর হৃদয় ভক্তি প্রেমে আপ্লুত করে দিয়েছিল।
“ততঃ প্রবৃত্তং মধুরং গান্ধর্বমতিমানুষম্।
ন চ তৃপ্তিং যযুঃ সর্বে শ্রোতারো গেয়সম্পদা।
অর্থাৎ, “এরপর মধুর সঙ্গীতের তার বাঁধা হলো। অত্যন্ত অলৌকিক সেই সঙ্গীত। সেই সঙ্গীতের বিশেষত্বের জন্য সমস্ত শ্রোতাগণ মুগ্ধ হয়ে তা শুনলেন। কারো যেন মন ভরে না।”

আবার মহাভারতের যুগে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাঁশির সুরে ভরিয়ে তুলেছিলেন ভারত বর্ষের বাতাস, সেই সুর যিনি শুনেছেন তিনিই কৃতকৃত্য হয়েছেন। গরু ও বন্য পশু পাখিরাও সেই মধুর সুরে মাতোয়ারা হয়ে উঠতো। একদিকে যেমন এই প্রাণ সঙ্গীতের উৎকৃষ্টতার নিদর্শন, আবার এই বাঁশির মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে সাতটি ছিদ্র আছে। জাগতিক ভাবে এই সাতটি ছিদ্র হলো- ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মোহ, জন, তপ ও সত্য আবার শরীরাভ‍্যন্তরস্থ সাতটি গ্রন্থি যথা- মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, বিশুদ্ধ, অনাহত, আজ্ঞাচক্র ও সহস্রার। এই বাঁশির সুর হলো প্রেম। বৈষ্ণব পদাবলীকার
বলেছেন, “কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো, আকুল করিল মোর প্রাণ।” অর্থাৎ এই প্রেম কিন্তু সুরের সান্নিধ্যে হয়ে উঠেছে অতুলনীয় ও স্বর্গীয়। মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য এই মাটির পৃথিবীতে তাঁর প্রেমের সঙ্গীতে মানুষকে ভক্তি প্রেমে আকুল করে তুলেছিলেন। এখানে সুর, ভগবৎ প্রেম বা ভক্তি সমার্থক হয়ে গেল। ধন্য ভারতবর্ষ! ধন্য তার সঙ্গীতশাস্ত্র!

পরবর্তী কালেও বহু সঙ্গীতজ্ঞ, সাধক জন্ম গ্রহণ করেছেন যাঁরা ভারতবর্ষকে পবিত্র করেছেন। সাধক ত্যাগরাজ, স্বামী হরিদাস ও তাঁর সুযোগ্য শিষ্য তানসেন, বৈজু বাওরা প্রমুখেরা সঙ্গীত সাধনার সেই চরম উন্নয়নের ধ্বজাকে ইতিহাসের বুকে কালজয়ী করে গেছেন। ত্যাগরাজ তাঁর সঙ্গীতের সুরে প্রেমের জোয়ার নিয়ে এসেছিলেন। তিনি তাঁর পরমারাধ‍্য শ্রীরামচন্দ্রের উপর প্রেম, বিরহ ও মিলন বিষয়ক অসংখ্য সঙ্গীত রচনা করেন, যার অধিকাংশ লুপ্ত হলেও বেশ কিছু এখন ভারতীয় সঙ্গীতের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে।

“ভবসাগরমু থতলেক নে বহুগসি পড়ি নি মরু গুজেরিথিনি অবনিজধিপ শ্রীতরক্ষক আনন্দকর” অর্থাৎ ভবসাগর পার করতে অসমর্থ, ক্লান্ত আমি তোমার শরণাগত, হে সীতাপতি, হে ভক্তজনরক্ষক, হে আনন্দময়। স্বামী হরিদাস সিদ্ধ মহাত্মা ছিলেন, তিনি কেবল ভগবানকেই তাঁর অপূর্ব সঙ্গীতের অর্ঘ্য নিবেদন করতেন। শোনা যায়, স্বামী হরিদাস শিষ্য তানসেন, যিনি সম্রাট আকবরের রাজসভার নবরত্নের মধ্যে এক রত্ন ছিলেন, তিনি দীপক রাগের প্রভাবে আগুন জ্বালাতে পারতেন, মেঘ রাগের আকর্ষণে নিয়ে আসতেন বৃষ্টি।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ছাড়াও ভক্তি মূলক সঙ্গীত, ভজন, বাউল গান, কীর্ত্তন, লোকগীতি প্রভৃতি সঙ্গীতের মধ্যেও পাওয়া যায় সেই আধ্যাত্মিকতা ও ঈশ্বরপ্রেম। রবীন্দ্র সঙ্গীত ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীতে খ্যাতি লাভ করেছে। রজনীকান্তের গানেও সেই একই সুর। নজরুলগীতি আজও মানুষের মনে স্বমহিমায় বিরাজমান। লালন ফকির একটি নাম মাত্র নয়, তাঁর সৃষ্ট বাউল গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে। মীরাজীর ভজন, তুলসীদাসজীর গান অতি প্রসিদ্ধ। সাম্প্রতিক কালেও অনেক বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী আছেন যাঁদের সুর সঙ্গীতের উৎকৃষ্টতা দেখে সারা পৃথিবীর মানুষ স্তব্ধ হয়ে যান, যার ফলে ভারত ছাড়াও আমেরিকা, ইউরোপ মহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় সঙ্গীত শিল্পীরা অত্যন্ত সম্মানিত হয়েছেন। যেমন- ম্যাসাচুসেটস (আমেরিকা) ১৯৮৪ সালের ২০শে এপ্রিল দিনটিকে “আমজাদ আলি খান দিবস” বলে ঘোষণা করেছে। বিষ্ণু গোবিন্দ যোগ-কে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র “ভায়োলিন সম্রাট” বলে আখ্যা দেয়। এছাড়াও পণ্ডিত রবি শঙ্কর, ওস্তাদ বিসমিল্লা খান, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, ওস্তাদ জাকির হোসেন, ওস্তাদ গুলাম আলি খান, পণ্ডিত যশরাজ, টি ভি কৃষ্ণান, ভীমসেন যোশী প্রমুখরা সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তবে বর্তমান কালে ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত (classical music) মানুষের কাছে কম জনপ্রিয়। ভারতীয় সঙ্গীতের মধ্যে যে বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও আদর্শ নিহিত আছে তা বোধগম্য করতে হলে অনেক বেশী শান্ত হওয়া প্রয়োজন, অনেক বেশী সুচিন্তার শক্তি থাকা প্রয়োজন। জগৎ জুড়ে যে অনাদি-অনন্ত-শাশ্বত সুর ধ্বনিত হয়ে চলেছে তা শোনার মত সময় বা ইচ্ছা আমাদের কোথায়? হয়তো আবার কোনোদিন ভারতের বাতাসে সেই সুর বেজে উঠবে যার ছন্দের আঘাতে আমাদের হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ারগুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, আবার হয়তো কোনোদিন আমরা নিজেদের অন্তরের সুরটিকে শুনতে পাবো!

কলম ধরলেন – শাশ্বত বসু, সিনিয়ার অ্যাসোসিয়েট, কগনিজেন্ট টেকনোলজি সলিউশনস

(ঋণ স্বীকার:- “Theory of Indian Music”, “The srory of Indian music and its instruments” – এথেল রসেনথল, “Indian Music”- বাবু নানক প্রসাদ, “ব্রহ্মবাদী ঋষি ও ব্রহ্মবিদ্যা”- স্বামী সন্তদাস)