দেবযানী সরকার, কলকাতা: ‘আমার জীবনে দুটো সান্টা৷ আমার প্রতিদিনই বড়দিন৷’ মীরের এই শুভেচ্ছা বার্তা মেনে নিতে পারেনি কেউ কেউ। লিখেছিলেন সঞ্চালক মীর৷ তারপরেই শুরু হয়েছিল ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের তীব্র আক্রমণ৷ মুসলিম হয়ে বড়দিন পালন ঘোরতর অপরাধ বলে মনে করেছিলেন তাঁরা৷ তীব্র সমালোচনা করে মীরকে ক্ষমা চাইতেও বলা হয়েছিল৷

বিপুলা ধরণীতে মীরের ঘটনা অসহিষ্ণুতার সামান্য উদাহরণ মাত্র৷ এরকম নজির প্রায় প্রতিদিন ভুরি ভুরি ঘটছে৷ কিন্তু এতকিছুর পরও এমন কিছু মানুষ আছেন যারা গোঁড়া ধর্মের উপরে উঠে মানুষকে ভাবতে শেখান৷ এরা হলেন তাহের, নূর, ওয়াসিম, সরফরাজ এবং অবশ্যই সেলিম আহমেদ৷ কোরান শরিফ পড়েও এরা ক্রিসমাসে হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় সান্টা৷

মহানগর কলকাতা এরকমই মুসলিম ‘সান্টা’-র সাক্ষী৷

এই ভারতে কখনও বাবরি ধংস হয়, কখনও দাদরির মতো ঘটনা ঘটে৷ তবুও ভারত অতুল্য৷ মহানগরের অন্ধকার গলিপথে মুসলিম সান্টারা সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছেন৷

বেডফোর্ড লেন৷ মধ্য কলকাতার এই এলাকায় সংখ্যালঘু মুসলিমদের বসবাস৷ তবে এই জায়গায়টার একটা অন্য পরিচয় আছে৷ প্রতিবছর বড়দিনের সময় বেডফোর্ড লেন বিশেষ পরিচিত পায়৷ এখান থেকেই থেকে জ্যান্ত সান্টাক্লজ ভাড়া পাওয়া যায়৷ এলাকার অধিকাংশ ছেলেই লাল জামা, লাল টুপি পড়ে দাড়ি-গোঁফ লাগিয়ে গলায় গিফটের ব্যাগ ঝুলিয়ে বেড়িয়ে পরেন৷

তিন-চার ঘণ্টার জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে পান মাত্র ৩০০ টাকা৷ সবাই যে টাকার প্রয়োজনে সান্টা সাজেন তা নয়৷ কেউ কেউ শখেও এই রূপ নেন৷ প্রত্যেকের নিজস্ব পেশা আছে৷ বড়দিনের এই সময়টা বাদ দিলে বছরের অন্যান্য সময় জোকার, চার্লি চ্যাপলিনও সাজেন তারা৷

ছবি- সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতার সান্টা দাদুদের মাথা সেলিম আহমেদ৷ তিনি সেলিম জোকারওয়ালা নামেই পরিচিত৷ ১৯৯৩ সালে এক পার্টিতে প্রথম সান্টা সেজেছিলেন সেলিম৷ তারপর থেকে সান্টার সাপ্লাই চেন-এর কাজ করেন৷ পাড়ার ছেলেদের নিয়ে ব্যবসার পসার জমিয়েছেন তিনি৷

বেডফোর্ড লেনের সান্টা ‘প্রধান’ সেলিম জানিয়েছেন, এবছর ২৪, ২৫ ও ৩১ শে ডিসেম্বর- শুধু এই তিনটে দিনই পঞ্চাশটা সান্টাক্লজের অর্ডার এসেছে৷ এখন অর্ডার পিছু এখন ১০০০টাকা করে নেন তিনি৷ যারা সান্টা সাজে তাদের দেন ৩০০ টাকা৷ ড্রেস এবং গাড়ি ভাড়া বাদ দিয়ে বাকিটা তাঁর লাভ৷

সেলিম আহমেদের দুই ছেলে এবং নাতিরাও এখন সান্টাক্লজ, চার্লি চ্যাপলিন সাজছে৷ ধর্ম নিয়ে যখন চারিদিকে এত অসহিষ্ণুতা তখন কট্টরপন্থী মুসলিমদের উদ্দেশ্যে সেলিমের একটাই বক্তব্য, ‘মানুষের জাত বড় জাত৷ এর থেকে বড় জাত কিছু হয় না৷’

ছবি- সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়

সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে একমত তাহের, নূর, ওয়াসিম, সরফরাজরা৷ তাদেরও ধর্ম নিয়ে কোনও ছুঁৎমার্গ নেই৷ ক্লাস এইট পাস করা নূর-এর কথায়, ‘উৎসব উৎসবই৷ ধর্ম দিয়ে উৎসবের ভেদাভেদ করা যায় না৷ আমরা জোকার- সান্টাক্লজ সেজে মানুষকে হাসাই৷ মানুষের দুঃখ ভোলানো আমাদের কাছে বড় আনন্দের৷’

শেরওয়ানির কারিগর সরফরাজ বলেন, ‘আমি তো শখে সান্টা সাজি৷ আমার অনেক অন্য ধর্মের বন্ধু আছে৷ যারা ঈদের সময় আমার বাড়িতে এসে পরোটা, সেমাই খায়৷ পলিটিশিয়ানরা এসব হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান করে৷ সাধারণ মানুষ এসবের ধার ধারে না৷’

এতদিন বেডফোর্ড লেন শুধুমাত্র কলকাতার সান্টাক্লজ-দের সেরা ঠিকানা হয়েই ছিল৷ কিন্তু এঁদো স্যাঁতস্যাঁতে গলির অল্পশিক্ষিত মানুষগুলোর ধর্মীয় উদারতা ছিল অন্ধকারেই ঢাকা৷