সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ছবিতে প্রেম নেই, মহিলা নেই। ছবি তৈরির প্রযোজকই পাচ্ছিলেন না তিনি। তবু কোনও জায়গায় সমঝোতা করতে রাজি ছিলেন না সত্যজিৎ রায়। তার উপরে আবার ছবিতে ছিল ভিস্যুয়াল এফেক্ট। টাকা যে ঢালবেন প্রডিউসর, ঘরে টাকা তুলবেন কিভাবে? ঠিক এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল বিশ্ব সিনেমার অন্যতম সেরা ছবি ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ এবং ছবির নির্মাতা বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে।

ছেলে সন্দীপ তখন বছর দশেকের। অদ্ভুত আবদার যে বাচ্চাদের জন্য সিনেমা বানাতে হবে। ছেলের আবদার রাখতে বাবা সত্যজিৎ হাতে তুলে নিলেন ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোরের গুগাবাবাকে। কিন্তু ছবি বানাব বললেই তো হল না , প্রডিউসর চাই। বড় ছবি বানাতে গেলে যেটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সত্যজিৎ তখন সত্যজিৎ হয়ে গিয়েছেন। আর.ডি বনসল তার বেশিরভাগ ছবিই প্রযোজনা করেছেন। তাই তাঁর কাছেই তিনি গেলেন। বনসল দেখলেন, পড়লেন, শুনলেন কিছুটা এগিয়েই পিছিয়ে এলেন।

তাঁর দাবি ছিল ছবিতে একটু প্রেম থাকতে হবে, সুন্দরী মহিলা থাকতে হবে। তবে না লোক দেখবে। কিছুই নেই একটা লোক গান গাইবে আরেকজন ঢোল বাজাবে তা দিয়ে আবার সিনেমা হিট হয়য় নাকি? হয়তো এমনই ধারনা তৈরি হয়েছিল প্রযোজকের মনে। আবার যখন দেখলেন যে ভিস্যুয়াল এফেক্ট রয়েছে ছবিতে তখন তো তাঁর মাথায় বাজ পড়েছিল। বাংলা ছবি তাতে নাকি ভিস্যুয়াল এফেক্ট! সাড়ে ছয় লক্ষ টাকাড় সিনেমা! অটো খরচ করতে রাজি ছিলেন না সত্যজিতের অত্যন্ত পরিচিত প্রযোজক।

ছবিটি হিন্দিতে করবেন ভেবেও এগিয়েছিলেন রায়বাবু। চেষ্টা করা হয় ফিল্ম ফিন্যান্স কর্পোরেশনে। সে চেষ্টাও জলে যায়। ছবি করাবার জন্যে এগিয়ে এসেছিলেন রাজ কাপুর। ছবি হবে আর.কে ফিল্মসের ব্যনারে কিন্তু ছবির মুখ্য দুই ভূমিকায় থাকবেন হবেন পৃথ্বীরাজ কাপুর (গুপী গাইন), শশী কাপুর (বাঘা বাইন)। এই সমঝোতায় আরই রাজি ছিলেন না সত্যজিৎ।

ছবি বানাতে দেরী হলে দেরী হবে কিন্তু নিজের ভাবনার সঙ্গে মিলবে না এমন কোনও মুখকে দিয়ে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করানো যাবে না। শেষে যোগাযোগ করেন নেপাল দত্ত। ঠিক হয় ছবির বাজেট চার লক্ষ টাকা দেবেন নেপাল দত্ত ও অসীম দত্ত। তাতেই হবে ছবি। হয়েওছিল। আর বাকিটা তো ইতিহাস। চার চারটে জাতীয় পুরস্কার সঙ্গে বিদেশে আরও কত পুরস্কার।

একসময় কিশোর কুমার গুপী করবেন বলেও ভেবেছিলেন সত্যজিৎ। গানও গাইবেন তিনি। ‘ডেট’ নিয়ে সমস্যার কারণে কিশোরকুমার করতে পারলেন না ছবি। আজ গুপী বাঘা পায়ে পায়ে পঞ্চাশ। ১৯৬২ থেকে পরিকল্পনা করে শেষে ১৯৬৯ , ৮ জুলাই পঁচিশে বৈশাখ, বৃহস্পতিবার মিনার, বিজলী, ছবিঘর ও ইংরেজি সাবটাইটেলসহ গ্লোবে মুক্তি পায় সত্যজিৎরায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’।