স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: পূর্ব বর্ধমান জেলা সহ মোট ৪টি জেলায় এবার নতুন আঙ্গিকে অবৈধ বালি পাচারের প্যাড চালু হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসল পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন। ইতিমধ্যেই এই সিণ্ডিকেটের প্যাড দেখতে পেলেই কড়া জরিমানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসন থেকে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া এবং বীরভূম জেলা জুড়ে বালি পাচারের জন্য একটি অবৈধ সিণ্ডিকেট রাজ কায়েম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছিল। এই বালি কারবারকে মসৃণভাবে পরিচালনার জন্য ওই সিণ্ডিকেট জায়গায় জায়গায় তাঁদের প্রতিনিধিদেরও নিয়োগ করেছে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই রীতিমত জোরকদমে শুরু হয়েছে এই বালির সিণ্ডিকেট। কোথাও যাতে কোনও রকম বালির কারবার বাধাপ্রাপ্ত না হয় সেজন্য চলছে জোরকদমে প্রস্তুতির কাজও। আর এরই মাঝে চালু হয়ে গেল নতুন আঙ্গিকে প্যাড।

এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুসারে, প্রত্যেকটি জেলার জন্য আলাদা আলাদা রঙের এই প্যাড চালু হয়েছে। প্রতিটি প্যাডে লেখা থাকছে ” বেঙ্গল (সাউথ) স্যাণ্ড ব্লক ওনারস, পার্টনারস্ এণ্ড ওয়ার্কাস এ্যাসোসিয়েশন।” প্রতিটি প্যাডে ডেভেলপমেণ্ট ফাণ্ড হিসাবে প্রতিটি গাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে ১২০ টাকা। বলা হচ্ছে, ডেভেলপমেণ্ট এ্যাসোসিয়েশন এবং সোস্যাল সার্ভিসের জন্য এই টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। যদিও এই টাকার রসিদে থাকছে না কোনও স্বাক্ষর।

এমনকি অভিযোগ উঠেছে, ১২০ টাকার স্বাক্ষরবিহীন রসিদ দেওয়া হলেও নেওয়া হচ্ছে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ। জানা গিয়েছে, মেরুন, গেরুয়া এবং নীলচে রঙের এই প্যাড চালু করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দুই বর্ধমান জেলা সহ বাঁকুড়া এবং বীরভূম জেলায় অবৈধ বালি কারবার নিয়ে বারবারই সোচ্চার হয়েছেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। কিভাবে এবং কেন চলছে এই বালি কারবার তা নিয়ে তিনি সরাসরি প্রশাসনিক বৈঠকে প্রশ্নও তোলেন।

রীতিমত কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, কোনও ভাবেই এই বালির কারবার চালাতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর সেই নির্দেশকে তোয়াক্কা না করেই দিনের পর দিন চলছেই এই অবৈধ বালির কারবার। এর আগেও বিভিন্ন ধরণের প্যাড দিয়ে বালির কারবার চালানো হয়েছে। বছর খানেক আগে যা নিয়ে রীতিমত হৈ চৈ শুরুও হয় রাজ্য জুড়ে। থানা ভিত্তিক এই প্যাড চালু নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্নও তোলেন।

জানা গিয়েছে, ঠাকুর-দেবতার ছবি থেকে বিভিন্ন সাংকেতিক ছবিযুক্ত সেই প্যাডের পরিবর্তে গতবছর থেকে বিশেষত পূর্ব বর্ধমান জেলায় চালু হয়েছে মোবাইল মেসেজ। গাড়ির চালকদের কাছে থাকা মোবাইলে বিভিন্ন থানা থেকে মেসেজ পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্যাডের মতই সেই মোবাইলের সেই মেসেজ দেখিয়েই চলছে অবাধে বালি কারবার। খোদ গাড়ি চালকদের দাবি, প্রতিটি থানা ভিত্তিক মাসে ১ হাজার টাকা দিতে হয় এজন্য। উল্লেখ্য, গত ৩১ ডিসেম্বর গভীর রাতে পূর্ব বর্ধমানের গলসী থানার শিকারপুরে ওভারলোডেড বালির গাড়ি উল্টে একই পরিবারের ৫জনের মৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন।

বেশ কিছুদিন ওই এলাকার প্রায় ১০টি বালিখাদানকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবৈধ ওভারলোডিং বালির জন্য একই পরিবারের মৃত্যুর ঘটনায় জনরোষে পুড়ে ছাই হয় গলসী এলাকার ৩টি বালির ঘাটের লক্ষ লক্ষ টাকার মেশিন, গাড়ি, যন্ত্রপাতি। শুধু তাই নয়, খোদ জেলাশাসক নিজে গলসী এলাকায় ৭৭টি ওভারলোর্ডিং বালির গাড়ি আটকান ২নং জাতীয় সড়কে। সবমিলিয়ে অবৈধ বালির কারবার নিয়ে উঠেপড়ে নামে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন।

কার্যত, সাময়িকভাবে এই বালির কারবার কিছুটা থিতিয়ে যাওয়ার পর এবার নতুন আঙ্গিকে প্যাড চালু হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন। জানা গিয়েছে, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান জেলার পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে এই সিণ্ডিকেট রাজ পরিচালনায় হাত রয়েছে এক দাপুটে তৃণমূল নেতার। ফলে অনেকেই এব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না। এদিকে, নতুন করে এই প্যাড চালুর বিষয়টি স্বীকার করেছেন পূর্ব বর্ধমানের অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি) শশী কুমার চৌধুরী।

তিনি জানিয়েছেন, নতুন করে এই প্যাড চালুর বিষয়টি তাঁদের নজরে আসার পরই তাঁরা কড়া ব্যবস্থা নিয়েছেন। জেলা পুলিশ সুপার সহ ভূমি দফতরের আধিকারিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও এই প্যাড দেখতে পেলেই তাদের বিরুদ্ধে দ্বিগুণ অর্থ জরিমানা করতে হবে। তিনি আরও জানান, কোনও ভাবেই এই কাজ চলতে দেওয়া হবে না।

প্রসঙ্গত, অতিরিক্ত জেলাশাসক জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কালে জেলা ভূমি দফতর বিভিন্ন জায়গায় হানা দিয়ে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা রেভিন্যুবাবদ আদায় করেছে। একইসঙ্গে এই কাজে কয়েকটি টিম নিয়মিত টহলও দিচ্ছে। প্রসঙ্গত, তিনি জানিয়েছে্ন, বালির কারবার নিয়ে লাগাতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বালিখাদান এবং রাস্তায় বালির গাড়ির ওপর নজরদারীর জন্য ভূমি দপ্তরের পক্ষ থেকে ৪টি অত্যাধুনিক শক্তিশালী ড্রোণ কেনার জন্য ইতিমধ্যেই টেণ্ডার ডাকা হয়েছে। আর তা হাতে পেলেই এই নজরদারীর কাজ আরও সহজ হবে।