নয়াদিল্লি: ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার্থে রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পার্টি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের সাংবিধানিক প্রধান। রামনাথ কোবিন্দের এই সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘ এক দশক পরে ফের ইফতার পার্টি বন্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রপতি ভবনে।

ইঙ্গিতটা মিলেছিল আগেই। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসার পরেই দিওয়ালি এবং বড় দিন পালন বন্ধ করে দিয়েছিলেন রামনাথ কোবিন্দ। সেই সময়েই বোঝা গিয়েছিল যে ২০১৮ সালে রমজান মাসে ইফতার পার্টির আসর বসবে না রাইসিনা হিলে। যদিও দিওয়ালিতে এলইডি বাল্ব দিয়ে সমগ্র রাষ্ট্রপতি ভবনে সাজানো হয়েছিল।

এর আগে রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ইফতার পার্টি বন্ধ করেছিলেন। ২০০৭ সালে প্রতিভা পাটিল সেই পদে আসীন হলে তিনি ফের রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পার্টির রেওয়াজ চালু করেন। সেই ধারা বজায় রেখেছিলেন দেশের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। দশ বছর পরে কালামের দেখানো পথ অনুসরণ করতে চলেছেন কোবিন্দ।

এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, ২০০২ সালে আব্দুল কালাম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী হিসেবে। ২০১৭ সালে দেশের সাংবিধানিক প্রধানের চেয়ারে বসা রামনাথ কোবিন্দও পদ্মের প্রার্থী। তাহলে কি গৈরিকীকরণের স্বার্থেই ইফতার বন্ধের সিদ্ধান্ত? এই বিষয়ে অবশ্য মুখ খুলতে নারাজ কেন্দ্রের বিরোধী কংগ্রেস। তাদের বক্তব্য, “সকল ধর্মের জন্যেই যদি এই নিয়ম কার্যকর হয় তাহলে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের উপর প্রশ্ন তোলার কোনও মানে হয় না।”

অন্যান্য বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতোই রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পারটির আয়োজন করা হতো। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনেরা সেই ইফতারে অংশ নিতেন। রাষ্ট্রপতি সকলকে শুভেচ্ছা জানাতেন। ইফতার পার্টির বিশেষত্ব ছিল রাষ্ট্রপতি অভ্যাগতদের জন্য নৈশভোজের ব্যবস্থা করতেন।

রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পার্টির রেওয়াজ শুরু হয়েছিল ৭০-র দশকের গোড়ার দিকে। যখন ইন্দিরা গান্ধী প্রথমবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যেটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম। তাঁর যুক্তি ছিল যে জনগণের করের টাকায় কোনও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা অনুচিত। ইফতারের জন্য বরাদ্দ অর্থ অনাথাশ্রমে দান করে দিতেন রাষ্ট্রপতি কালাম। যদিও ঈদের দিনে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেদের তিনি শুভেচ্ছা জানাতেন।

২০০৭ সাল থেকে যখন ফের রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পার্টি শুরু হয় প্রতিভা পাটিলের হাত ধরে। সেই ধারা বজায় রেখেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। সেই দশ বছর সময়ে রাইসিনা হিল-এর ইফতার পার্টিতে কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপি এবং বাম নেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ত।

স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতে ইফতার পার্টির রেওয়াজ শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হেমাবতি নন্দন বহুগুনার হাত ধরে শুরু হয় সেই প্রথা। যদিও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু ইফতার পার্টির আয়োজন করতেন তবে তা তিনি কংগ্রেস সদর দফতরে ব্যক্তিগতভাবে আয়োজন করতেন। এরপরে ১৯৮০ সালে পুনরায় ক্ষমতা দখলের পরে সাড়ম্বরে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এর পিছনে ভোট ব্যাংকের স্বার্থ কাজ করেছিল বলে দাবি করেন অনেকে। তারপর থেকে দ্বিতীয় ইউপিএ জামানা পর্যন্ত দেশের সকল প্রধানমন্ত্রীই ইফতার পার্টির আয়োজন করে এসেছেন। তালিকায় বিজেপি প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীও রয়েছেন।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই ধারা বন্ধ করেছেন নরেন্দ্র মোদী। এমনকি রাষ্ট্রপতি ভবনে বা অন্যান্য প্রশাসনিক দফতরের ইফতারও তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর মন্ত্রী সভার অন্য একাধিক সদস্য ইফতারে অংশ নিলেও নিজেকে এসবের থেকে দূরেই রেখেছেন মোদী। যে ধারা এখনও অক্ষত রয়েছে। ব্যস্ততার অজুহাতেই ইফতার এড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর জন্য অন্য কোনও কারণ দেখান হয়নি।

রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ অবশ্য যুক্তি দেখিয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কোনও একটি ধর্মের অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দেওয়া অনুচিত সেই তত্ত্বেই ইফতার পার্টি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোবিন্দ। এর আগে বড়দিনের প্রার্থনাও বন্ধ করেছিলেন তিনি। ২০০৮ সালে মুম্বই হামলার পরে বড়দিনে উৎসব বন্ধ রাখা হয়েছিল রাষ্ট্রপতি ভবনে। সেই অর্থ দিয়ে ত্রাণ পাঠানো হয়েছিল বাণিজ্য নগরীর দুর্গতদের উদ্দেশ্যে।