সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ঘুমিয়ে যদি পড়েছ , তাহলে ভালো বর পাওয়া হবে না। তাই হবে উদ্দাম নৃত্য। বাজবে কাঁসর, ঢোল। শিবরাত্রিতে এমন ভাবেই জাগবে হাওড়ার গ্রাম। সৌজন্যে কালিকাপাতাড়ি নাচ।

ছৌ-নাচ, রণপা, ঝুমুর, টুসু, নাচনি নৃত্যের ন্যায় বঙ্গ লোকসংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ হাওড়া জেলার নিজস্ব সংস্কৃতি ‘কালিকাপাতাড়ি লোক নৃত্য’। বিংশ শতকের সূচনা লগ্নে কালিকাপাতাড়ি বা কালকেপাতাড়ি নৃত্যের উদ্ভব। মূলত, শিবচতুর্দশীর রাতে শিবের ব্রত পালন করা মহিলাদের জাগিয়ে রাখতে ও আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় এই লোকশিল্প পরিবেশিত হয়। প্রধানত, পুরাণ ও মহাকাব্যের ভিত্তিতে মুখে মুখে রচিত হয় একটি একটি টুকরো কাহিনী। বাদ্যযন্ত্র সহকারে এই কাহিনীগুলিই অভিনীত হয়। কাহিনীগুলি পুরাণ ও মহাভারতের এমন সমস্ত অংশ থেকে গৃহীত হয় যেখানে শক্তির প্রদর্শনের বর্ণনা আছে।

শিব-দূর্গা-কালী অশুভ শক্তির বিনাশ করে ত্রিভুবনে কীভাবে শান্তির বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন তা প্রধানত তুলে ধরা হয় হাওড়া প্রত্যন্ত গ্রামীণ মানুষের কাছে এই নৃত্যের মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন বেশভূষায় সুসজ্জিত হয়ে কলাকুশলীরা পালায় অংশ নেন। অন্যদিকে মঞ্চের বাইরে থেকে পুতুল নৃত্যের ন্যায় সঞ্চালনা করেন একজন ব্যক্তি। সাথে ঢোল-মাদল-কাঁসরের রব। এভাবেই মনোরঞ্জন করেন কলাকুশলীরা। সময়ের সঙ্গে এই নৃত্য হারিয়েছে তার জৌলুস,হারিয়েছে তার স্বরূপ। বর্তমানে শ্যামপুরে ৩টি দলে ৫০ জন শিল্পী আছেন যারা এই কালিকাপাতাড়িকে হারিয়ে যেতে যেতে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

এক একটি দলে ১৫ থেকে ২০ জন করে শিল্পী প্রাচীন এই শিল্পে অভিনয় করেন। ২০১৮ সাল থেকে রাজ্য সরকার এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজস্ব উদ্যোগ নিয়েছে। কালিকাপাতাড়ি পেশায় জড়িত শিল্পীরা এই পেশা থেকে মুখ ঘুরিয়েছিল। রাজ্যের পালাবদলের ফলে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে লোকপ্রসার শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের মাসিক ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে কিছুটা হলেও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন শিল্পীরা। জেলার এই প্রাচীন লোকশিল্পে একমাত্র শ্যামপুরের শিল্পীরাই যুক্ত আছে। বাগনান ও আমতায় এই অবলুপ্তপ্রায় এই লোকনৃত্যের চল রয়েছে।

মহাশিবরাত্রি ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয়। বলা হয়, সব ব্রতের শ্রেষ্ঠ শিবরাত্রি। ব্রতের আগের দিন ভক্তরা নিরামিষ আহার করেন। রাতে বিছানায় না শুয়ে মাটিতে শোয়া হয়। ব্রতের দিন তারা উপবাসী থাকে। তারপর রাত্রিবেলা চার প্রহরে শিবলিঙ্গকে দুধ, দই, ঘৃত, মধু ও গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করানো হয়। তারপর বেলপাতা, নীলকন্ঠ ফুল, ধুতুরা, আকন্দ, অপরাজিতা প্রভৃতি ফুল দিয়ে পূজা করা হয়। আর ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ এই মহামন্ত্র জপ করা হয় । সেদিন রাত্রি জাগরণ করা হয় ও শিবের ব্রতকথা, মন্ত্র আরাধণা করা হয়। ভারতবর্ষের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ তথা সমস্ত শিবমন্দিরে এই পূজা চলে, তান্ত্রিকেরাও এইদিন সিদ্ধিলাভের জন্য বিশেষ সাধনা করে। মহাশিবরাত্রি সাধারণত ইংরাজী মাসের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ এ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। হিন্দু মহাপুরাণ তথা শিবমহাপুরাণ অনুসারে এইরাত্রেই শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মহা তান্ডব নৃত্য করেছিলেন । আবার এইরাত্রেই শিব ও পার্বতীর বিবাহ হয়েছিল । এর নিগুঢ় অর্থ হল শিব ও শক্তি তথা পুরুষ ও আদিশক্তি বা পরাপ্রকৃতির মিলন। এই মহাশিবরাত্রিতে শিব তার প্রতীক লিঙ্গ তথা শিবলিঙ্গ রূপে প্রকাশিত হয়ে জীবের পাপনাশ ও মুক্তির পথ দিয়েছিলেন।

ছবি সৌজন্যে – তপন কুমার সেন