গৌতম রায়

মহারাষ্ট্র বিধানসভার সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে কোনও রাজনৈতিক দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেনি। বিজেপি সরকার তৈরির জন্য নানা ধরনের চেষ্টা চরিত্র চালিয়েও শেষ পর্যন্ত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বিজেপির সরকার গঠন জনিত চেষ্টাকে কেন্দ্র করে তাদের দলের সঙ্গে শিবসেনার সম্পর্কটি আপাতত যথেষ্ট খারাপ হয়ে গেছে। আদর্শগত ভিত্তিতে শিবসেনাই হল বিজেপির একমাত্র কাছের রাজনৈতিক দল।

উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী চিন্তা চেতনার ভিত্তিতে শিবসেনা ও বিজেপি পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিকে অতিক্রম করে জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্রের সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার যে সংঘাত, সেই সংঘাতের পেছনে কিন্তু কোনও আদর্শবাদের তাগিদ নেই।

শিবসেনার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল; মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীত্ব আড়াই বছর তাঁরা চলাবেন। বাকি আড়াই বছর তাঁরা চেয়েছিলেন, বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীত্ব করুক। শিবসেনা স্বরাষ্ট্র, অর্থ দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর চেয়েছিল। এই দপ্তরগুলি সরকারের প্রাণভ্রমরা। তাই স্বভাবতই বিজেপি, শিবসেনার এই সব শর্তে রাজি হয়নি।

এই কারণেই কিন্তু শিবসেনার সঙ্গে বিজেপির বিরোধ। এই বিরোধের জেরে নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রীসভা থেকে শিবসেনা তার প্রতিনিধিকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। শিবসেনার সঙ্গে বিজেপির যে মহারাষ্ট্র সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে সাময়িক বিরোধ, তা যে কোনও অবস্থাতেই দীর্ঘস্থায়ী হবে না, একথা এখনই জোর দিয়ে বলতে পারে যায়।

কারণ, দুটি সম আদর্শবোধের দ্বারা তাড়িত রাজনৈতিক দলের কাছে কালনেমির লঙ্কা ভাগটি সবথেকে বড় বিবেচ্য বিষয়। এই ভাগবাটোয়ারার বিষয়টি নিয়ে যখন তাদের মধ্যে ঐক্যমত্য স্থাপন সম্ভব হবে, তখন আবার আমে দুধে মিশে যাবে।

এইরকম একটি পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল এনসিপিকে সরকার গঠনের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছেন। একদা কংগ্রেসের ভেতরে থাকা শরদ পাওয়ারের এনসিপি অবশ্য এই অচলাবস্থার মুহূর্তে প্রথমেই বলে দিয়েছিল যে, শিবসেনা যদি বিজেপির সঙ্গ পরিত্যাগ করে, তাহলে তাঁরা শিবসেনাকে সমর্থন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।

কংগ্রেস যে শিবসেনাকে আলাদা করে সমর্থন করবে না– একথা স্পষ্ট করে বলেনি। আবার শিবসেনাকে সমর্থন করবে এ কথাও তারা বলেনি। এইরকম একটি অবস্থায় এনসিপির কাছে সরকার তৈরির রাজ্যপাল কর্তৃক আহ্বানকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে একটা বড় ধরনের আগ্রহের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

একদা কংগ্রেস দলের প্রায় শীর্ষনেতার দায়িত্বে থাকা শরদ পাওয়ার রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্ব কংগ্রেস দলে মেনে নিতে না পারাতে এনসিপি নামক আলাদা দলটি তৈরি করেছিলেন সোনিয়া জন্মসূত্রে বিদেশিনী, এই পরিচয় ঘিরে যখন বিজেপির পক্ষ থেকে তীব্র সোনিয়ার প্রতি আক্রমণ হচ্ছে, সেইরকম সময় শারদ পাওয়ারও কার্যত বিজেপির সুরেই সোনিয়ার বিদেশিনী পরিচয় ঘিরে যে আক্রমণ শানিয়েছিলেন, তা কোনও অবস্থাতেই রাজনৈতিক ছিল না। তা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত।

শরদ পাওয়ারের লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসের সভাপতি পদ। সেই লক্ষ্যে স্থিত থাকবার জন্যই তিনি সনিয়ার বিরোধিতাতে প্রায় বিজেপির সুরে সুর মিলিয়ে ছিলেন। সেই শরদ পাওয়ারের দল যদি মহারাষ্ট্রের সরকার তৈরি করে, তাহলে কংগ্রেস দল কি সেই সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করবে? নাকি সেই সরকারে অংশগ্রহণ করবে? যদি বাইরে থেকে সমর্থন করে, তাহলে সেই সরকারের স্থায়িত্ব ঘিরে এখনই প্রশ্ন তোলা যায়। আর যদি সরকারে অংশগ্রহণ করে, তাহলে হয়তো বলা যায়, সরকার কিছুদিন স্থায়ী হলেও হতে পারে।

এনসিপি যদি মহারাষ্ট্রের সরকার গঠন করে, তাহলে কি ভূমিকা নেবে সদ্য এনডিএ, বিজেপির সঙ্গে নরম– গরম সম্পর্ক তৈরি করা শিবসেনা? উগ্র জাত্যাভিমানকে ভিত্তি করে রাজনীতির জগতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে শিবসেনার কাছে জাত্যাভিমানী বিজেপির সঙ্গ রক্ষা করে চলাটা এক ধরনের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা।

সেই বাধ্যবাধকতার বাইরে বেরিয়ে গিয়ে, ক্ষমতার লালিপপ উপভোগ করবার জন্য কত দিন শিবসেনাই বা নিজের অবস্থানে স্থিত থাকতে পারবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিজেপি, কংগ্রেস, শিবসেনা, এনসিপি– প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে কিন্তু মহারাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের স্বার্থ, বিদর্ভের হাজার হাজার কৃষক তাঁদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মঘাতী হচ্ছেন, তাঁদের স্বার্থ এই সব রাজনৈতিক দলের কাছে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব নেই।

তাদের কাছে একমাত্র স্বার্থের ব্যাপার হল মহারাষ্ট্রে কুর্শী দখল করা। এই প্রেক্ষিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল মহারাষ্ট্রে, সেই নির্বাচনে বিজেপি-শিবসেনা-কংগ্রেস-এনসিপির মতো ব্যক্তিস্বার্থবাহী দলগুলির ছদ্ম লড়াইকে মোকাবিলা করে বামপন্থীদের একটি আসনে জিতেছে। এই সময়ের জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বামপন্থীদের এই জয়টা কিন্তু আদৌ উপেক্ষা করার মতো কোনও বিষয় নয়।

বিভাজনের রাজনীতিকে একটা ভয়াবহ জায়গায় দাঁড় করিয়ে নির্বাচকমণ্ডলীকে যখন রুটি-রুজির প্রশ্নকে, বাসস্থানের প্রশ্নকে, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-নিরাপত্তার প্রশ্নকে ভুলিয়ে দিয়ে, ধর্ম-জাতপাতের ভিত্তিতে বিভক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, এইরকম একটি সময়সীমাতে সেই ভাজক রেখাকে অস্বীকার করে রুটি রুজির লড়াই য়ের কথা বলা, বামপন্থীদের একটি আসনের জিতিয়ে দেওয়াও কিন্তু মহারাষ্ট্রের তথা দক্ষিণ ভারতের এই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সেই অধ্যায়টিকে মাথায় রেখেই বলতে হয় যে, এনসিপি যদি সরকার গঠন করেও, কংগ্রেস সেই সরকারকে ভেতর থেকে বা বাইরে থেকে যদি সমর্থন দেয়, আবার তাদের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা শিবসেনা যদি সেই সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেয়, তবু সেই সরকারকে কতদিন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকতে দেবে, তা ঘিরে এখনই রীতিমতো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অতীতে কংগ্রেস কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকাকালীন, যেভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দল পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলিকে সংবিধানের ৩৫৬ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে উৎখাত করত, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বর্তমান বিজেপি সরকার কিন্তু তেমনটা করে না একটা তথাকথিত গণতন্ত্রের আবরণ গড়ে, আয়ারাম গয়ারাম পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে, বিধায়ক কেনা বেচার ভিতর দিয়ে, তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে। জনাদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, নিজেদের সরকার তৈরি করে।

কর্ণাটকের সাম্প্রতিক পালাবদল সেই খেলারই একটি অংশ। এই দিকে লক্ষ্য রেখে বলতে হয় যে, মহারাষ্ট্রের যদি বিধানসভা টিকিয়ে রেখে, রাষ্ট্রপতি শাসনকে সামরিক রুখে এনসিপি সরকার তৈরি সম্ভবপর হয়, তবুও আয়ার আমগড়াম পদ্ধতির ভেতর দিয়ে, সেই সরকারকে উৎখাত করে, যে কোনও মূল্যেই নিজেদের দলের সরকার তৈরির জন্য বিজেপি সব রকমের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।

সরকার তৈরি, পাল্টা সেই সরকারকে ভেঙে দিয়ে পাল্টা সরকার গড়া– এই চাপানউতোরে ঢাকা পড়ে যাবে সেখানকার সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের প্রশ্ন। ঢাকা পড়ে যাবে কৃষি ঋণ মুকুবের প্রশ্ন বোম্বে সংলগ্ন বিভিন্ন ছোট ছোট শিল্প ঘিরে যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কট ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে সমস্ত পরিযায়ী শ্রমিকেরা বোম্বে-সহ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন, তাঁদের উপরে মারাঠি অস্মিতাকে কেন্দ্র করে যে ধরনের ভয়াবহ ভাষাভিত্তিক, জাতিভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার হলাহল ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে– সেই সব প্রশ্নগুলিকে ভুলিয়ে দেওয়া হবে।