সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ২১ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের এবার ২৬ বছর হচ্ছে৷ একেবারে সাজ সাজ রব রাজ্যজুড়ে শহিদ দিবসের প্রস্তুতিতে৷ যদিও আজও অস্পষ্ট সেদিনের গুলি চালনায় প্রকৃত দোষী কারা৷ রাজ্যে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ক্ষমতায় আসার পর তিনি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ২১ জুলাইয়ের ঘটনার তদন্তে বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করেছিলেন৷ বছর তিনেক ধরে তদন্ত চালিয়ে ৫৯ জনের সাক্ষ্য নিয়ে সেদিনের হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা পড়লেও উত্তর মেলেনি কার নির্দেশে গুলি চলেছিল৷ ফলে প্রকৃত দোষীদের সাজা দেওয়ার তেমন কোনও প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত মেলেনি৷ অবশ্য সেটা হবেই বা কী করে এখন তো দিদিমনিকে সবার সঙ্গে রং মেলাতে হয়, তাই সিপিএমের হার্মাদরা সবুজ জামা গায়ে দিলে তারাও ‘ওয়েলকাম’ ৷

আরও পড়ুন:  জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অর্থ ঢালছে জামাত ইসলামি ‘নিয়ন্ত্রিত’একাধিক NGO

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে নেমেছিলেন যুব কংগ্রেস কর্মীরা৷ আর তখন তাদের উপরে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। সেই ঘটনায় মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ। তারপর থেকে প্রতিবছর সেই হত্যাকাণ্ডের দিনটি শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে থাকেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর কয়েক বছর পর মমতা কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে তাঁর দলই এই শহিদ দিবস মূলত পালন করে থাকে৷ অনেক সময় রাজ্য কংগ্রেসের নেতারা ২১ জুলাইকে তাদেরও শহিদ দিবস বলে দাবি করে তা পালন করার কথা বললেও তাতে তেমন সাড়া মেলে না৷ তাই যে যাই বলুক ২১ জুলাই পালনের একচ্ছত্র অধিকার যে মমতার তা নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকার কারণ নেই৷ যেহেতু সেদিনের মহাকরণ অভিযানের নেতৃত্ব তিনিই দিয়েছিলেন৷ কিন্তু তাঁর উদ্যোগে গড়া তদন্ত কমিশন রিপোর্টে কী বলতে চাইল তা তো বুঝতেই পারল না মানুষ ৷

আরও পড়ুন: একুশে জুলাই মামলা গতি হারাচ্ছে কেন, ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা

কমিশনের রিপোর্টে গুলিচালনাকে ‘অবৈধ, অনৈতিক, অসাংবিধানিক’ বলা হয়েছে । তবে কে ওই ‘অবৈধ, অনৈতিক, অসাংবিধানিক’ কাজের জন্য দায়ী, তা নিয়ে নির্দিষ্ট করে কোনও কিছুই বলা হয়নি। তবে কমিশনের মতে, তৎকালীন মহাকরণ ও লালবাজারের কর্তারা ঘটনার দায় অস্বীকার করতে পারেন না। ফলে সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তের ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে প্রশ্ন উঠেই যাচ্ছে ৷ কারণ এই আমলাটি বাম জমানায় জ্যোতি বসু-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্নেহধন্য হওয়ায় পরে রাজ্যের মুখ্যসচিবও হয়েছিলেন৷  তবে এই মণীশবাবুই আবার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য হয়ে উঠেছেন৷ এদিকে ওই তদন্ত রিপোর্টে বর্তমান সরকারের অস্বস্তি বেড়েছে ৷ আর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে – তবে মণীশকে আড়াল করতেই শেষমেশ অজানা রয়ে গেল সেদিনের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দোষী? স্বাভাবিক ভাবেই হতাশ হয়ে কোনও কোনও মহলের কটাক্ষ – আগেকার সরকার মানুষ খুন করেছিল আর এই সরকার সেই খুনীদের পুরস্কৃত করছে৷

আরও পড়ুন: একুশে জুলাই মঞ্চেই যুবরাজের অভিষেক!

এ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বার বারই মমতা দেখাচ্ছেন মণীশের প্রতি৷ আগের পর্যায় মন্ত্রী থাকার পর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের প্রাক্তন এই আমলাটি তৃণমূলের টিকিটে ভোটে দাঁড়ালেও হেরেছেন৷ এবারের ভোটে যেখানে বিরোধীরা গো-হারান হারছেন সেখানেই নিজে হেরে ব্যতিক্রমী নজির গড়েছেন এই মণীশবাবুটি৷ চরম দাম্ভিক এই প্রাক্তন আমলাকে যে তাঁর বিধানসভা এলাকার প্রকৃত তৃণমূল সমর্থকরা পছন্দ করেন না তা সাম্প্রতিক ভোটের ফলাফল বুঝিয়ে দিয়েছে ৷ তবুও এই মণীশ গুপ্তকেই মুখ্যমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ ও অপ্রচলিত বিদ্যুৎ দপ্তরের উপদেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর এই পদটি ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমমর্যাদার।  পরবর্তীকালে তাকে অবশ্য রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছে। অর্থাৎ হেরেও তিনি পুরস্কৃত৷ যা দেখে একটা প্রশ্ন উঠছে- এ ভাবে মণীশদের মতো লোকেরা পুরস্কৃত হলে ২১ জুলাইয়ের শহিদরা শান্তি পাবে তো?

আরও পড়ুন: অভিষেক-‘কাঁটা’য় ২১ জুলাইয়ের উন্মাদনা হারিয়েছেন ঘাসফুলের বহু নেতা-কর্মী

আসলে মণীশ গুপ্ত বলে তো নয় লালু আলমের মতো লোকেদেরও ঠাঁই দিয়েছেন মমতা৷ কলকাতার রাস্তায় বিরোধীদের উপর সিপিএম তথা বাম আক্রমণের কথা উঠলেই ২১ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের মতোই আলোচিত আর একটি ঘটনা হল হাজরা মোড়ে লালু আলমকে দিয়ে মমতার উপর প্রাণঘাতী আক্রমণের ঘটনা৷ আজ থেকে সিকি শতাব্দী আগে বাসের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১৯৯০ সালের ১৬ অগস্ট বনধ ডাকে কংগ্রেস৷

আরও পড়ুন: বাঁকুড়া: একুশের সভা ভরাতে বাস উধাও হওয়ায় হয়রান যাত্রীরা

সেদিন হাজরা মোড়ে তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছিল সেই সময়কার দাপুটে সিপিএম নেতা বাদশা আলমের ভাই তথা লালপার্টির মারকুটে ক্যাডার লালু আলম৷ সেদিন তার লাঠির আঘাত সরাসরি পড়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায়৷ সেদিনকার যুব কংগ্রেস নেত্রীর মাথায় একুশটির মতো সেলাই পড়েছিল৷ রাজ্যে পালাবদলের পর সেই লালু আলম শিবির বদল করে এখন মমতা অনুগামী৷ শুধু আমলা ক্যাডার কেন বুদ্ধিজীবীরাও এখন শিবির বদল করছেন৷ আগে যারা বুদ্ধ অনুগামী বলে পরিচিত ছিলেন, নন্দীগ্রামের ঘটনার পরে যারা তৎকালীন রাজ্যসরকারের হয়ে সওয়াল করতেন তাঁদের কেউ কেউ তো এখন দিদির চেয়ারে জল পড়লে তা মুছে পরিষ্কার করতেও সিদ্ধহস্ত ৷

আরও পড়ুন: ২১ জুলাইের রহস্যের জট কাটাতে আসছে ‘মেঘনাদ’

রাজনীতির আঙিনায় ভেসে থাকার জন্য কিংবা বা স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য তৃণমূলের দরজায় অনেকেই কড়া নাড়তে গিয়ে দেখছে দরজা তো হাট করে খোলাই রয়েছে৷ রাজনীতিতে কেউ অচ্ছুৎ নয় তাই সকলকেই জায়গা দিতে হবে৷তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি বাড়বে বড় থেকে আরও বড় হবে৷ বিরোধী বলে কিছুই থাকবে না ৷ সকলেই দলে ঠাঁই পাবে, সকলেই তৃণমূল হয়ে যাবে ৷ তবু এমন জয় করেও ভয় কাটবে না৷ নব্য বনাম পুরানো তৃণমূলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আরও বেশি করে মাথা চাড়া দেবে৷ ইতিমধ্যেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের তো ইঙ্গিত মিলেছে ৷ তবুও কি সচেতন হওয়া যাবে না? তা না হলে ২১ জুলাই পালনে সার্থকতা কোথায়?

আরও পড়ুন: শঙ্কুদেব পন্ডার ছবি ‘কমরেড’-এর মুক্তির দিন ২১ জুলাই কেন?