সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন৷ কিন্তু তারও অনেক আগে তাঁকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী ফিরোজ গান্ধী৷ ১৯৫৯ সালে কেরলে কমিউনিস্ট সরকারকে ফেলে দিয়ে যেভাবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল তারই প্রেক্ষিতেই এমন কথা বলেছিলেন ফিরোজ৷ ওই পদক্ষেপকে অগণতান্ত্রিক বলেই মনে হয়েছিল জহরলাল নেহরুর জামাইয়ের৷

নেহরুর আমলেই আর্থিক কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন জামাই ফিরোজ

তখন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু হলেও ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি( এআইসিসি)-র সভাপতি৷ আর এমন পদক্ষেপ নিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দ্বিধান্বিত হলেও বরং একেবারে দৃঢ়চেতা ছিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী৷ একেবারে স্বাধীনতার সময় থেকে কেরলে কমিউনিস্ট এবং মুসলিম লিগের ভালই অস্তিত্ব ছিল৷ ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে কেরলের জনগণ কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়াকে ক্ষমতায় আনে৷ স্বাধীন ভারতে সেটাই ছিল কোনও রাজ্যের প্রথম কমিউনিস্ট শাসন৷ তবে সেবার কেরলে কোনও একক দল সংখ্যা গরিষ্ঠতা না পেলেও কমিউনিস্ট পার্টি সর্ববৃহৎ দল (৩৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল) হওয়ায় ডাকা হয়েছিল সরকার গড়তে ৷ এদিকে ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদের মুখ্যমন্ত্রীতে যে সরকার গড়ে ওঠে তা ক্ষমতা এসে একেবারে কমিউনিস্ট সুলভ আদর্শে কাজ শুরু করে দেয়৷ আগের সরকার ভূমি সংস্কারে প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতা এসে এই কমিউনিস্ট সরকার তা রূপায়ণে সক্রিয় হয়৷

ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি কেরলের নাম্বুদ্রিপাদ সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার আনতে ‘এডুকেশন বিল’ নিয়ে আসে৷ যার উদ্দেশ্য ছিল বেসরকারি পরিচালিত স্কুল কলেজগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা৷ আর তার জন্যই রুষ্ট হতে থাকে খ্রিস্টান চার্চ,মুসলিম লিগ, এবং নায়াররা- যাদের হাতে ছিল বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং তৎসংলগ্ন বহু জমি৷ ফলে এরাই মূলত ছিল রাজ্য সরকারের বিরোধিতায় প্রথম সারিতে৷ সেই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিল কমিউনিস্ট ধ্যানধারণা জনগণের জীবনযাত্রায় ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা৷ কারণ সেই সময় কিছু স্কুলে মহাত্মা গান্ধীর ছবি সরিয়ে দিয়ে মার্ক্স-লেনিন-স্টালিনের ছবি বসান শুরু হয়৷ ফলে ওই বিরোধিতার পরিধি বাড়ে এবং ক্রমশ তা ক্ষোভে রূপান্তরিত হতে থাকে৷ পাশাপাশি সেখানে তখন আওয়াজ ওঠে এই কমিউনিস্ট সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার৷

এদিকে পুরো ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুরও উদ্বেগ বাড়ে ৷ যদিও তিনি ওই মূহুর্তে একটা রাজ্যে ভোটে জেতা সরকার ফেলে দেওয়া উচিত মনে করেননি কারণ তা ছিল গণতন্ত্র বিরোধী ৷ ১৯৫৭ সালে নির্বাচনের পরে কেরলে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এলে একদিক দিয়ে খুশিই হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী৷ কারণ একদিকে বিশ্বের কাছে বার্তা দেওয়া গিয়েছিল ভারতে প্রকৃত গণতন্ত্র রয়েছে তাই বিরোধী হলেও কমিউনিস্টরা একটা রাজ্য শাসন করতে পারছে ৷ অন্যদিকে এর মাধ্যমে বিশ্বের কমিউনিস্ট দেশগুলির কাছে বার্তা পাঠান গিয়েছিল এদেশ তাদের বন্ধু বলে৷

কিন্তু কেরলে সরকার ফেলার ব্যাপারে তাঁর বাবার মতো গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকছে না বলে কোনও রকম দ্বিধা ছিল না এআইসিসি সভাপতি প্রিয়দর্শিনার৷ ফলে তিনি তৎকালীন কেরল সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠায় তা ফেলার সুযোগ কাজে লাগাতে উদ্ধত হন৷ তিনি তখন কেরলে সাম্প্রদায়িক হিন্দু ও মুসলিম লিগের ক্ষোভকে আরও ইন্ধন জোগাতে তাঁর অনুগত রাজ্য কংগ্রেসের নেতাদের কাজে লাগান সরকার বিরোধিতায় ৷ সেই ক্ষোভ এমনই আকার নেয় যে পুলিসের গুলি চলে এবং মানুষের মৃত্যু হয়৷ রক্ত ঝরায় স্বভাবতই কমিউনিস্ট রাজ্য সরকারের দিকে আঙুল ওঠে৷

ওই পরিস্থিতিতে সরকার ফেলা নিয়ে নেহরুর দ্বিধা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ইন্দিরা৷ যার জন্য তিনি ওই সময় তাঁর বাবাকে ‘দুর্বল’ এবং ‘সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন’ বলে মনে করতেন৷ পাশাপাশি সেই সময় কমিউনিস্ট বিরোধী বলে পরিচিত মন্ত্রীরাও সেই সময় কেরলের কমিউনিস্ট সরকারকে সমর্থন করা দেখে অবাক হয়েছিলেন ইন্দিরা৷ তবে নেহরু তাঁর কন্যার প্রতি দুর্বল হওয়ায় অবশেষে সেটাই মেনে নিয়েছিলেন৷

অবশেষে ১৯৫৯ সালের ৩১ জুলাই সংবিধানের এই বিতর্কিত ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে কেরলে কমিউনিস্ট সরকার ফেলে দেওয়া হয়েছিল৷ তবে এমন সিদ্ধান্তে স্বামী ফিরোজ যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন ‘এশিয়ার মুক্তি সূর্য’৷ এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাওয়ার আগেই তিনমূর্তি ভবনে প্রাতরাশের টেবিলে রীতিমতো উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছিল ইন্দিরা-ফিরোজের মধ্যে৷ সেদিন অগণতান্ত্রিক ভাবে সরকার ফেলার জন্য ফিরোজ ইন্দিরাকে ফ্যাসিস্ট বলেছিলেন৷ সেটা শুনে ক্ষুব্ধ ইন্দিরা রেগে টেবিল থেকে উঠে ঘরের বাইরে চলে যান৷ মেয়ে -জামাইয়ের মধ্যে এমন ঝগড়া দেখে বড় অসহায় বোধ করেছিলেন সেদিন নেহরু৷

কেরলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়ার সে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন ঠিকই ফিরোজ গান্ধী তবুও তার পরেও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য তিনি তাঁর সংগ্রাম চালিয়ে যান৷ যদিও কেরলে যাতে কোনও ভাবেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় না আসতে পারে তাই ইন্দিরার সভাপতিত্বে থাকা কংগ্রেস তখন মুসলিম লিগ সহ অন্যান্য বিতর্কিত দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বাঁধে৷ যা দেখে একজন কংগ্রেস প্রতিনিধি হিসেবে ফিরোজ কংগ্রেসের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন৷ আশংকা প্রকাশ করেন, ক্রমশ ধর্ম জাতি কংগ্রেসের আদর্শ কলুষিত করবে, দলটি হারাবে তাঁর গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা৷

তবে সেই যে শুরু হয়েছিল ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ তা পরবর্তীকালে বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে ৷ ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৬-৭৭ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এর প্রয়োগ করেছেন ২৯ বার৷ অন্যদিকে তারপর জনতা সরকার ক্ষমতায় এসে তিন বছরেরও কম সময়ে তা প্রয়োগ করেছে নয় বার৷ ১৯৮০ সালে ফের ক্ষমতা ফিরে ইন্দিরা এই ধারা প্রয়োগ করেন আটবার৷ তারপরেও বার বার জাতীয় অথবা আঞ্চলিক স্তর থেকে আওয়াজ উঠেছে ভোটে জেতা সরকার ফেলার৷ যেহেতু এদেশে মানুষ ফিরোজের উত্তরাধিকারী না হয়ে তাঁর স্ত্রী ইন্দিরার উত্তরাধিকারী হতেই বেশি আগ্রহী৷

তথ্য ঋণ – ইন্টারনেট এবং “Feroze the forgotten Gandhi” By Bertil Falk