সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : করোনার জন্য বিশ্বজুড়ে বন্ধ করা হয়েছে ধর্মীয় স্থান। মন্দির , মসজিদ , গির্জা সবকিছুই বন্ধ রাখা হয়েছে বড় জন সমাগম এড়াতে। ভারতের সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির, পুরী জগন্নাথ মন্দির, দক্ষিণেশ্বরে মানুষের যাতায়াত কমেছে। এমন সময়ে গ্রামীণ হাওড়ার সচেতনতার ব্যাপক অভাব দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। যখন সংক্রমণের সম্ভাবনা এড়াতে ধর্মস্থান এড়ানোর কথা বলা হচ্ছে তখন সেখানে রমরমিয়ে চলছে মেলা পুজো পার্বণ।

হাওড়ার বাসিন্দা লেখক সৌরভ মুখোপাধ্যায় গ্রামীণ হাওড়ার সেই অসচেতনতার কথা স্পষ্ট করেছেন তার সোশ্যাল মাধ্যমে। ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রাখতে কতটা অসচেতন গ্রামীণ হাওড়ার মানুষ? লেখক জানাচ্ছেন , ‘মানুষজনকে যথাসম্ভব ঘরে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, পরস্পরের থেকে দূরত্ব রাখতে ও স্বাস্থ্যবিধি-সতর্কতা নিতে লাগাতার প্রচার চলছে কর্তৃপক্ষের তরফে। এমতাবস্থায় সবচেয়ে বড় বিপদ হল গণ-জমায়েত। যেখানে ঠেসাঠেসি ভিড়, অজানা অচেনা (সম্ভাব্য সংক্রামক/ রোগী) মানুষের সঙ্গে ঠেকাঠেকি ধাক্কা ঠেলাঠেলি, এমন জায়গায় রোগ বিপুলভাবে ছড়ানোর শতকরা একশোভাগ সম্ভাবনা। বিশেষত এই পর্বে, যেখান থেকে গণ-সংক্রমণের সূচনা হবার কথা। অথচ আমাদের এই ডোমজুড় মাকড়দহ আন্দুল মৌড়ী এইটুকু বৃত্তের মধ্যেই রমরমিয়ে চলছে মেলা ও স্থানীয় পুজোপার্বনের নানান জমায়েত।’ লেখকের অভিযোগ, ‘মৌড়ীতে শীতলাপুজোর ভক্তিপ্রাবল্যে নির্ভয়ে নরনারীশিশু গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাকড়দহে পঞ্চম দোলের মেলা কদিন ধরেই সগৌরবে চলছে, হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।’ তাঁর বাড়ির সামনে কাছারিবাড়ির প্রাঙ্গণে রক্ষাময়ী পুজোর উন্মাদনা চরমে, সকাল থেকেই সেখানে লোকজনকে ঠেলে রাস্তায় এগোতে হচ্ছে। সন্ধ্যায় বিপুল জনসমাগম। অসচেতনতার কথা টেনে তিনি বলেছেন , ‘এত শত লোকের মধ্যে কে কোথা থেকে এসেছে, কার বাড়িতে কোথা থেকে বিদেশাগত লোকজন আছে, কার কাশি সর্দি জ্বর চলছে, কে ইনকিউবেশন নিয়ে চলাফেরা করছে নির্ধারণ করার কোনও উপায় আছে? ধর্মীয় উন্মাদনায় নাগাড়ে চলছে ছোঁয়াছুঁয়ি ধাক্কাধাক্কি। প্রতিবাদ করতে গেলে, বা বোঝাতে গেলেও গণশত্রু হয়ে যেতে হবে।’

উদ্বিগ্ন সাহিত্যিক বলছেন , ‘ধর্মীয় অন্ধত্ব এই পরিস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু, এবং সংক্রামক রোগের সবচেয়ে বড় মিত্র এবং এটি করোনার চেয়েও জেঁকে বসে আছে। এক-আধজন সাধারণ মানুষ চেষ্টা করেও এই সর্বনাশা অনাচারের বিরুদ্ধে কোনো সচেতনতা গড়তে পারবেন না। নিজের পরিবারেই আমি সে-চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। বাড়ির বয়স্কা সদস্যা সারাদিন টিভি দেখছেন, জানেন যে একটি মারণরোগ ছড়িয়ে পড়ছে তবু স্থানীয় পুজোর ভিড়ে তিনি যাবেনই যাবেন। শুধু তাই নয়, বাতাসা ছড়িয়ে লুঠ দেবেন, তাঁর নাকি মানত আছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিয়ে নিবৃত্ত করতে গেলে অগ্রাহ্য করবেন এই অন্ধ বিশ্বাসে, যে, ঠাকুরের মহিমায় ত্রিসীমানায় কোনো রোগের ঘেঁষার ক্ষমতা নেই।’ তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা, বাকি সদস্যরা— যারা নিজেদের সতর্ক ঘেরাটোপে রাখছি, কীভাবে সুরক্ষিত থাকব যদি নিজের পরিবারের লোকই ভিড় থেকে যেচে বয়ে আনেন সংক্রমণ?’

এই প্রসঙ্গে মাকড়দহ ডোমজুরের বিডিও রাজা ভৌমিক বলেন , ‘আমরা সমস্ত পুজো বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। অনেক জায়গায় ইতিমধ্যেই মেলা, পুজোকে ঘিরে যেসব উৎসব অনুষ্ঠান হয় তা বাতিল করতে সক্ষম হয়েছি। এখনও কিছু জায়গায় বাকি রয়েছে। তা নিয়ে আমাদের মাইকিং চলছে। মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করছি।’ সাকরাইলের বিডিও সন্দীপ মিশ্রকে অবশ্য বহুবার যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।