সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: রেল কম ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম। না এখানে ট্রেন ধরতে গিয়ে আপনার পা পিছলে যাবে না, বরং থমকে যেতে পারেন। হাওড়া স্টেশন থেকে ফোরশোর রোডের দিকে ডান ফুটপাথ ধরে ঠিক দশ মিনিট হেঁটে গেলেই আপনার পা আটকে যাবে হাওড়া রেল মিউজিয়ামে এসে। প্রায় সাড়ে চার একর জমির উপর তৈরি হয়েছে এই রেল মিউজিয়ামটি। রেলের এই সংগ্রহশালা বহন করছে দেড়শ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস। হাওড়ার এই রেল মিউজিয়ামটির উদ্বোধন হয় ২০০৬ সালের ৭ এপ্রিল। তার পর এক দশক পেরিয়ে এখনও আগ্রহে ভাটা পড়েনি৷ ছুটির দিনগুলোয় বহু দর্শনার্থীই ভিড় করেন সেখানে৷

2

সংগ্রহশালার সামনেই ‘হল অব ফেম’। সেখানে রয়েছে ব্রড গেজের স্টিম লোকো, মিটার গেজের স্টিম লোকোমোটিভ ইঞ্জিন। তাছাড়াও রয়েছে কাঠের তৈরি ন্যারো গেজের ফার্স্ট ক্লাস কামরা। বছর কয়েক আগেও সেটি শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন থেকে পাহাড়ি পথে উঠত নামত। রয়েছে আরও বেশ কিছু পুরানো রেল মডেল।

4

‘‘হল অব ফেম’’কে পিছনে ফেলে এগলেই চোখে পড়বে বিশাল সবুজ মাঠ। যার শুরুতেই রয়েছে একটি লম্বা রেল ট্র্যাক। তার চারপাশে রয়েছে চারটি কিয়স্ক। একটির নাম ‘বিদ্যুৎ’, অপর তিনটি ‘দূরসঞ্চার’, ‘বিরাসত’ এবং ‘স্মৃতিয়াঁ’। ‘বিদ্যুৎ’ কিয়স্কে বলা হচ্ছে রেলে বিদ্যুৎ সংযোগের কথা। কীভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ আমাদের কাছে রেলযাত্রাকে সুখময় করে তুলেছে সে কথাই জানিয়েছে এই কিয়স্কটি। ‘দূরসঞ্চার’ কিয়স্ক শোনাচ্ছে রেলের সঙ্গে সিগন্যালের সম্পর্কের কাহিনি। “বিরাসত” কিয়স্কে রয়েছে রেলের কর্মচারীবৃন্দ অর্থাৎ রেলের গার্ড থেকে শুরু করে টিকিট চেকার, ড্রাইভারদের মডেল। শেষে রয়েছে ‘স্মৃতিয়াঁ’ কিয়স্ক। এখানে রয়েছে বিভিন্ন উপলক্ষে প্রকাশিত রেলের বহু বিরল স্ট্যাম্প। এই চারটি কিয়স্কের মাঝে রয়েছে ‘কৃতি স্তম্ভ’ যেখানে রেলের প্রথম দিকের আটটি জোনের ইতিহাস লেখা রয়েছে।

5

চারটি কিয়স্কের ডান পাশে রয়েছে রেলের বহু পুরানো ইঞ্জিন ও বগি। রাখা রয়েছে ১৯১৭-র ন্যারো গেজ স্টিম লোকোমোটিভ, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের একটি গোটা ট্রেন, ব্রড গেজের প্রথম ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ, ব্রড গেজের শান্টিং স্টিম লোকোমোটিভ। রয়েছে আরও কিছু পুরানো দিনের রেল ইঞ্জিন, কামরা– যা ধাপে ধাপে তুলে ধরে ভারতীয় রেলের গৌরব ও ঐতিহ্যকে।

3

এরই একেবারে বাঁ পাশে রয়েছে আসল মিউজিয়াম, যা হাওড়া স্টেশনের আদলে গড়া। ‘হল অফ হেরিটেজ’। এখানে রেল ও হাওড়া স্টেশনের বিভিন্ন সময়ের ছবি এবং মডেল রয়েছে। রয়েছে পূর্ব রেলওয়ের পুরস্কারে ভরা দুটি আলমারি।  সেখানেও ধরা পড়েছে ভারতীয় রেলযাত্রার ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

6

ভারতীয় রেলের কাহিনি যদি কলকাতা ও হাওড়াবাসীকে জানতে হয়, তাহলে তাঁদের আসতেই হবে হাওড়ার এই মিউজিয়ামে। সিপাহি বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের প্রয়োজনে ভারতে রেল তৈরি হলেও তা যে সেখানেই থেমে যায়নি তার প্রমাণ এই রেল মিউজিয়াম।

7

ভারতীয় রেল পৃথিবীর সব চাইতে বড় রেল নেটওয়ার্ক৷ আপাতত তা বুলেট ট্রেনের প্রতীক্ষায় রয়েছে। তবে তার পিছনের সাদা-কালো ইতিহাসটাও যে বড়ই রঙিন তা বোঝা যায় হাওড়ার এই রেল সংগ্রহশালায় পা দিলে।