সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া : ওঁরা আঁকড়ে ধরে রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো শিল্পকে। এক সময় পটের গল্প বলত রামায়ণ মহাভারতের গল্প। আজকের পট বলে নারী নির্যাতনের গল্প। সঙ্গে প্রকৃতি রক্ষার কথাও বলে। কিন্তু বিজয় চিত্রকর ফুলজান চিত্রকরদের শিল্পে আজ বেশি ফুটে উঠছে নারী নির্যাতনের গল্প।

সম্প্রতি হাওড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে পটের আঁকা গান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিজয় চিত্রকর। জানালেন, ‘পট সব সময়েই সমাজের কথা বলে। নারী নির্যাতন এই মুহূর্তে বড় সমস্যা। দেখছেন তো দিল্লিতে সেই নির্ভয়া কাণ্ডের দোষীদের এখনও সাজা হল না। আমাদের আঁকা গানে তাই এখন দেশের হাজারও নির্ভয়াদের কথা ফুটে ওঠে।’ একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবেশ রক্ষার কথাও বলছি পটের মাধ্যমে। সবুজের প্রয়োজনীয়তাও বোঝাচ্ছি পটের মাধ্যমে। কারণ সবুজ ধ্বংসও তো এই মুহূর্তে সারা বিশ্বসমাজের অন্যতম বড় সমস্যা। তাই এই কথাও আঁকার মাধ্যমে বলছি।’

ফুলজান চিত্রকর বলেন, ‘এই ছবির রং সম্পূর্ণ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত। কাপড়ের ওপর কাদা ও গোবর মিশ্রিত একধরনের আস্তরণ দিয়ে তা শুকিয়ে সেই কাপড়ের ওপর ছবি আঁকা হয়। কখনও কখনও আবার কাপড়ের ওপর কাগজ সেঁটে তার ওপর চুন বা খড়ি মাটির প্রলেপ দিয়ে পটের জমিন তৈরি করা হয়। পটচিত্রে সাধারণত কালো, লাল, হলুদ, সবুজ খয়েরি ও নীল রঙের ব্যবহার দেখা যায়। সোনালি ও রুপালি রঙের ব্যবহারও মাঝে মাঝে লক্ষ্য করা যায়। রঙ তৈরির জন্য পটুয়ারা বনজ বা খনিজ পদার্থ ব্যবহার করতেন। চাল কালো করে ভেজে কালো রঙ, সিঁদুর বা পাকা তেলাকুচা ফল থেকে লাল, হরিতাল বা কাঁচা হলুদ আর ঘুষুংমাটি মিশিয়ে হলুদ, খড়িমাটি দিয়ে সাদা, ময়ুরকণ্ঠী গুঁড়ো দিয়ে নীল রঙ বানানো হয়। শুকিয়ে যাবার পর রঙ যেন টেকসই হয়, সেই জন্য তেঁতুল বীজ গরম জলে ভেজানো আঠা অথবা বাবলা বা নিম গাছের আঠা কিংবা খয়েরের আঠা , শিরীষের আঠা বার্নিশের মতো ব্যবহার করা হয়।’

তবে এখন পটকে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে টি শার্ট, পাঞ্জাবিতে। ফুলজান জানালেন, ‘বাণিজ্যিকরণ করতেই হতো, তাই জামাকাপড়ে আসছে পটের গল্প। আসল পটও রয়েছে, যা বিদেশের মানুষরা দোভাষীর মাধ্যমে বিদেশে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্যই এতে মিডলম্যানদের অনেক বেশি লাভ থাকে। তবে আমাদেরও কিছু লাভ হয়ে থাকে বিদেশে যাওয়ার জন্য। আর বিদেশে যাচ্ছে আমাদের কাজ এটাও কম কথা নয়তো। সোজাসুজি লাভ হয় রাজ্য সরকারের মেলাগুলিতে। ওখানে মাঝখানে কেউ থাকে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই সোজাসুজি লভ্যাংশ আসে।’

বিজয়বাবু বলেন, ‘তবে লড়াইটা আমরা করে যাচ্ছি এই শিল্পটাকে বাঁচাতে। কে আর এত কষ্ট করতে চায়। আমরা এই লড়াইতেই থাকতে ভালোবাসি। আসলে এই শিল্পটা আমাদের রক্তে। এটাকে তো রাখতেই হবে।’

প্রসঙ্গত, পট শব্দটি সংস্কৃত পট্ট বা পালি পট্টিকা থেকে এসেছে, যার অর্থ কাপড়। যারা এই পটে ছবি আঁকেন তাদেরই বলা হয় পটুয়া।

পটের ছবিগুলো সাধারণত দ্বিমাত্রিক। ছন্দায়িত রেখা ও রঙ গাঢ় উজ্জ্বল। সরলতা, বাস্তবতা, গতিময়তা, দৃঢ়তা, বলিষ্ঠতা পটচিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ছবির মুখ সাধারণত পাশ থেকে আঁকা। লম্বা চোখ, দেখতে পাতার মতো, তীক্ষ্ণ নাক ও চিবুক, ভারি পোশাক এ-সব ছবির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। পটুয়ারা কেবল চিত্রশিল্পীই নয়, তাঁরা একাধারে কবি, গীতিকার ও সুরকারও।

সাধারণত দু’ধরনের পটচিত্র দেখা যায়। একটি ‘জড়ানো পট’। এই চিত্রের কাপড় আট থেকে পঁচিশ হাত লম্বা এবং দু’ থেকে আড়াই হাত চওড়া হয়ে থাকে। একটি কাঠের দণ্ডে পট পেঁচিয়ে বা জড়িয়ে রাখা হত বলে এ-ধরনের পটকে ‘জড়ানো পট’ বলা হত। এতে ধারাবাহিকভাবে ছবি আঁকা থাকে। পটুয়ারা জড়ানো পট খুলে গানের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ছবির বর্ণনা করেন। অপরটি আয়তকার ‘চৌকশ পট’। এগুলি আকারে ছোট একটি ফুলস্কেপ কাগজের চেয়ে সামান্য বড় হয়। এতে একটি মাত্র ছবি আঁকা যায়।