বিশেষ প্রতিবেদন: শ্রীলংকায় গির্জা ও হোটেলে পরপর ৮টি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়৷ তাতে তিনশোর বেশি মৃত ও ৫০০ জনের বেশি জখম হয়েছেন৷ বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে যেসব যুবকরা এই হামলা চালিয়েছে তাদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। হামলাকারী একজন ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গিয়েছিল৷ কেন উচ্চ শিক্ষিত ও বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা জঙ্গি সংগঠনে নাম লেখাচ্ছে ? এই প্রশ্নটি বারে বারে উঠে আসছে বিভিন্ন নাশকতার পর৷ বিবিসি বাংলা এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে৷

গত রবিবার শ্রীলঙ্কায় হামলার রেশ ধরেই ফের উঠে আসছে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ২০১৬ সালের সেই ভয়াবহ গুলশন হামলার প্রসঙ্গ৷ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, হোল আর্টিজান ক্যাফের সেই হামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। দুটি হামলাতেই ইসলামিক স্টেট তাদের দায় নিয়েছে৷ দুটি হামলার ঘটনায় জড়িয়েছে উগ্র ইসলামিক চিন্তাধারা৷

কেন এমন পরিবারের সন্তানরা জঙ্গি হামলায় জড়াচ্ছে, তার উত্তর খুঁজেছে বিবিসি৷ আন্তর্জাতিক এই সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় যে আটজন আত্মঘাতী হামলাকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে দুই ভাই যারা কলম্বোর ধনী এক মসলা ব্যবসায়ীর সন্তান।

আন্তর্জাতিক জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে গবেষণা করেন সুইডেন প্রবাসী বাংলাদেশী সাংবাদিক তাসনিম খলিল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটি অবশ্যই উদ্বেগের কারণ যারা আইএস বা আল-কায়েদার মতো জিহাদি সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত হচ্ছে তাদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ তারা উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসছে।” তিনি বলেন- “জিহাদি হামলার ঘটনার সাথে যে শুধু জড়িত থাকে তাই না এই ফান্ডিং বা টাকা পয়সার জোগান দেওয়া সেটাও তারা অনেকসময় করে থাকে”।

বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শুধুমাত্র যে উচ্চবিত্ত তাই না, উচ্চ শিক্ষিতরাও জঙ্গিবাদ বা জিহাদি সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে। এই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশনে হোলি আর্টিজান ক্যাফে হামলার ঘটনাতেও এমন অর্থশালী পরিবারের সন্তানরা জড়িত৷ জঙ্গি তৎপরতা বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, সেখানেও আমরা দেখেছি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা আইসিস(আইএস)- এর সাথে মিলে হামলা করেছিল। একইভাবে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার একাধিক নাশকতায় জড়িতদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে তারা উচ্চ শিক্ষিত এবং বেশ অর্থশালী পরিবারের সন্তান৷

কেন বিত্তশালী পরিবারের সন্তানরা এই ধরণের বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে?

বিশেষজ্ঞ তাসনিম খলিল বলেন, “বেশ অনেক বছর ধরে আমাদের স্কলারদের মধ্যে একটা ধারণা ছিল সন্ত্রাসবাদের মূল কারণ সম্ভবত হচ্ছে দারিদ্র্য। কিন্তু ইদানীং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা যখন ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ছে তাদের ধর্মপরায়ণতা বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে ধর্মপরায়ণতা যখন তাদের (তরুণ এবং বয়স্ক উভয়ের মধ্যেই) মধ্যে বেড়ে যায়, এর একটা কারণ হল এই যে সন্ত্রাসবাদী দলগুলো আছে তাদের আইডিওলজি অনেক বেশি সহজে বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। এবং এটা মানুষকে আকৃষ্ট করে বিশেষ করে যারা উচ্চবিত্ত এবং উচ্চশিক্ষিত একধরনের তাদের প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা আসলে থাকে না।” অনেক সময় যুবক-তরুণরা মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে উগ্র ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে৷ এমনই জানিয়েছেন তিনি৷

“সম্পদের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে, সমাজে সম্পদশালী মানুষের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এই সম্পদশালী মানুষ ধর্মপরায়ণও হয়ে পড়ছে যে বিষয়টি সম্প্রতি ভারতের এক গবেষণায় উঠে এসেছে,” বলেছেন তিনি৷

বিবিসি জানতে চেয়েছিল এই ‘মগজ ধোলাই’ এর কবল থেকে তরুণদের কিভাবে রক্ষা করা যায়?

তাসনিম খলিল জানিয়েছেন, এটা একদিনে হয়না। “এটা শুরু হতে পারে নারীদের প্রতি একধরনের ঘৃণা থেকে, বা সমকামীদের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা থেকে, বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বনকারী যারা আছেন তাদরে প্রতি ঘৃণা থেকে এবং আমার ধর্ম সবচেয়ে ভালো এই ধরনের একটা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তা-ভাবনা থেকে।”

তিনি বলেছেন, একটা বহুত্ববাদী সমাজ বা মাল্টি কালচারাল সমাজ যদি প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে সামনে এই সমস্যা আরও বেড়ে যাবে।