সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় :কয়েক বছর আগে পুজোর সময় বেজেছে উঠে ছিল “বসন্ত এসে গ্যাছে…” গানটি ৷ সৌজন্য অবশ্যই  চতুষ্কোণ’ ছবিটি৷  এখন মার্চের শেষের দিক গত কয়েকদিন ধরেও বেশ গরম বেড়েছে সেটা অনুভব করা যাচ্ছে। তবে আবহাওয়া গরমের পাশাপাশি গোটা বাংলা উত্তপ্ত এখন ভোটযুদ্ধে। তার উপর এবারে ভোট ময়দানে জনপ্রিয় স্লোগান তথা গান হল- খেলা হবে। সেই খেলা হবের পরিবেশেই এবারে দোল উৎসব। আর কয়েকদিন বাদেই সকলে মেতে উঠবে দোল তথা হোলি উৎসবে। একদিকে যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পাড়ায় পাড়ায় ভোট প্রচারে নেমে পড়েছে তেমনই আবার বিভিন্ন জায়গায় রঙ পিচকারি ইত্য়াদি দোল খেলার পসরা সাজিয়ে বিক্রি বাটা শুরু হয়ে গিয়েছে । ফলে সব মিলিয়ে বসন্ত এসেছে বলা যেতেই পারে।

কাদের দোল, কিসের হোলি, দুইয়ের মধ্য যোগ কোথায় – প্রশ্নগুলি পাক খায় মাথাতেই৷ হোলি অপভ্রংশটি এসেছে হোরি (তৎসম) বা দোল থেকে। হোলি থেকে হোলক, হোলক মানে হোলিকা, যার অর্থ ডাইনী। এর সঙ্গে অশুভকে ধ্বংস ও নতুনকে স্বাগত জানানোর বিষয়টি জড়িত রয়েছে। উপ-মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন- ভারতের উড়িষ্যায় দোলোৎসব, উত্তর ও মধ্যভারতে হোলি বা হোরি, গোয়া ও কঙ্কণ অঞ্চলে শিমাগা, দক্ষিণ ভারতে কামায়ন। কথিত আছে মধ্যযুগের কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দের প্রভাবেই হোলি ও দোল যাত্রা একাত্ম হয়ে গিয়েছে। দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। বঙ্গে দোল উৎসব নামে পরিচিত হলেও বাংলার বাইরে পালিত হোলি উৎসবটির সঙ্গে দোলযাত্রা একটা সম্পর্ক রয়েছে।

হিন্দু ধর্ম অনুসারে চারটি যুগ-সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ এবং কলিযুগ। বর্তমানে চলছে কলিযুগ। এর আগের দ্বাপরযুগ থেকে শ্রীকৃষ্ণের দোলযাত্রা বা দোল উৎসব চলে আসছে। বলা হয়, শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে ফাল্গুনী পূর্ণিমায়।  আবার, ১৪৮৬ সালের এই পূর্ণিমা তিথিতেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জন্মগ্রহণ করেন বলে একে গৌর-পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করেন বৈষ্ণবেরা। তবে এর মূল তাৎপর্য হলো রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের উপাখ্যান। ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথির এ দিনে বৃন্দাবনের নন্দন কাননে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে তার সখী রাধা ও তেত্রিশ হাজার গোপীর সঙ্গে রঙ ছোড়াছুড়ির খেলায় মেতে ছিলেন। এর স্মরণে দোলের দিন সকালে ভগবানকৃষ্ণ ও রাধার বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নান করিয়ে দোলায় চড়িয়ে কীর্তন গানসহকারে শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর কৃষ্ণভক্তরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পর রঙ খেলেন। এ সব দিক থেকে দোল উৎসবকে দুইভাবে দেখা যায়- হিন্দুধর্মের পৌরাণিক উপাখ্যান এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব।তবে কখনও কখনও তা একটু পিছিয়ে গিয়ে চৈত্র মাসেও হতে দেখা যায় যেমন এবারেই দোল পূর্ণিমা পড়েছে চৈত্র মাসে৷ দোলের আগের দিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে উৎসবের অঙ্গ হিসেবে কেউ কেউ তাতেও মেতে ওঠেন৷ যা হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া নামে পরিচিত। সাধারণ উত্তর ভারতে হোলি উৎসবটি বাংলার দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়। তবে কোনও কোনও বছর হোলি এবং দোল একই দিনে পড়তেও দেখা গিয়েছে৷

এদিকে স্কন্দপুরাণ অনুসারে ফাল্গুনমাহাত্ম্য গ্রন্থাংশে হোলিকা ও প্রহ্লাদের উপাখ্যান কথা শোনা যায়। হোলিকা ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপুর ভগিনী। ব্রহ্মার বরে হিরণ্যকশিপু দেব ও মানব বিজয়ী হয়ে দেবতাদের অবজ্ঞা করতে শুরু করেন। এদিকে তাঁরই পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। প্রহ্লাদ বিষ্ণুকে নিজের পিতার উপরে স্থান দেওয়ায় রেগে গিয়ে হিরণ্যকশিপু তাঁর নিজের পুত্রকে পুড়িয়ে মারার আদেশ দেন। দাদার আজ্ঞায় হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুণে প্রবেশ করেছিলেন কারণ তার বর ছিল আগুণে প্রবেশ করলেও তিনি অক্ষত থাকবেন। কিন্তু সেই বরের ক্ষেত্রে শর্ত ছিল হোলিকাকে একা আগুণে প্রবেশ করতে হবে৷ সেই শর্ত ভুলে সে যখন প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুণে ঝাঁপ দিলে বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অক্ষত থাকলেও আগুনে পুড়ে হোলিকারই মৃত্যু হয়। সেই হোলিকার এই অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কাহিনিকে ভিত্তি করে দোলের আগের দিনে হোলিকাদহন বা চাঁচর উৎসবের আয়োজন করা হয়। যা আবার দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনের প্রতীক স্বরূপ হিসেবে দেখা হয়৷ এদিকে আবার রাধা-কৃষ্ণকে ঘিরে অন্য এক কাহিনিও প্রচলিত-শ্রীকৃষ্ণ এক দিন বৃন্দাবনে রাধা এবং তার সখীদের সঙ্গে খেলা করছিলেন। সে সময় হঠাৎ রাধা এক বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয়ে লজ্জিত হন। শ্রীকৃষ্ণ রাধার লজ্জা ঢাকতে এবং বিষয়টি তার সখীদের কাছ থেকে গোপন রাখতে; রাধা তার সখীদের সঙ্গে আবির খেলা শুরু করেন। তাদের সবাইকে আবির দিয়ে রাঙিয়ে দেন। এ আবির খেলার স্মরণে হোলি উৎসব পালন করা হয়ে থাকে বলে প্রচলিত আছে। এ ছাড়া বলা হয়ে থাকে, কৃষ্ণ নিজের কৃষ্ণ রঙ ঢাকতে বিভিন্ন ধরনের রঙ মাখিয়ে রাধার সামনে হাজির হন। সেই থেকে এ উৎসবের শুরু। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে দোল উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। যেমন- কোথাও কোথাও ফাল্গুন শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে দোল উদযাপন উপলক্ষে ‘বুড়িরঘর’ বা ন্যাড়া’ পোড়ানো হয়। সাধারণত বিষ্ণু বা কৃষ্ণ মন্দির কিংবা ধামে খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এ বিশেষ বহ্নি-উৎসবের আয়োজন করা হয়৷

 

শোনা যায় একটা সময়ে, কলকাতার পুরনো বনেদি বাড়িগুলিতে দোলের উৎসব ছিল দুর্গাপুজোর মতই জাঁকজমকপূর্ণ। মূলত পরিবারের গৃহদেবতাকে কেন্দ্র করে দোলের উৎসব আবর্তিত হলেও, সামাজিক মেলামেশার সূত্র ধরে নিজেদের বৈভব দেখানো ছিল বনেদি বাড়ির দোলের অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে দোল উপলক্ষ্যে কলকাতার বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে প্রচুর লোক সমাগম হত। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের আপ্যায়নের জন্য প্রচুর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকত, বাড়িতে বসানো হত ভিয়েন। খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি গানবাজনার আসর বসত প্রায় সব পুরনো বাড়িতেই। সেই পরম্পরা বজায় রাখতে এখনও বেশ কয়েকটি বনেদি বাড়ি এই দিনে গান বাজনা খানা পিনার মাধ্যমে একেবারে রঙিন হয়ে ওঠে অনেকেই৷

তবে হোলির দিনে ভিজে রঙিন হওয়ার বাসনাটা নতুন কিছু নয় ৷ বিশেষত থিম পার্কের  যুগে তেমন কিছু ব্যবস্থা ইদানিং বিভিন্ন জায়গাতেই দেখা যায়৷ যা অবশ্যই এই চৈত্রের সূর্যের প্রখর তাপ থেকে মুক্তি দেয় অনেককে ৷ হোলির দিনে ‘রেন ড্যান্স’-এর ফ্লোরে মনের আনন্দে সঙ্গীদের সঙ্গে ভেজার আনন্দই আলাদা তা বলার অপেক্ষা রাখে না ৷ এদিকে আবার চরম গরমে বহু জায়গায় সেই আনন্দের সেগুড়়ে বালি হয়ে যেতে পারে কারণ গরম বাড়ায় অনেক সময় নির্দেশ আসতে পারে এই ভাবে জলের অপচয় বন্ধ রাখার । তাছাড়া এই উৎসবের আগে আবার করোনা মাথা চাড়া দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে । ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এভাবে হোলি অথবা দোল উৎসবে মাতলে সেটা কতটা ঝুঁকির হয়ে যাবে সেটাও ভাবতে হবে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.