সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , কলকাতা: আলো মানে চন্দননগর। কলকাতার দুর্গা পুজোতেও আলোকসজ্জায় এখন দেখা যায় চন্দননগরকে। কিন্তু এই আলোর সুখ্যাতির পিছনের কাহিনীটা আর ক’জন মনে রাখে। অতীত চলে যায় অতীতের পাতায়।

বর্তমান তার দিকে ঘুরেও তাকায় না। কিন্তু এই দ্রুত গতির সমাজেও এখনও নস্ট্যালজিয়ার দাম রয়েছে। এখনও পাড়ার পুজোয় হলুদ ডুমের আলো দেখলে অনেকেরই মনে পড়ে ছোটবেলার কথা।

আরও পড়ুন: মৃত বিমানসেবিকার ভিসেরা রিপোর্টে মিলল অ্যালকোহল

আজ চন্দননগরকে ঘিরেছে এলইডি আলো। রয়েছে নানারকমের চাইনিজ আলো। আলোর মডেল তো রয়েইছে। কিন্তু যেদিন চন্দননগরের পাড়াগুলোয় আলো জ্বলত না! মণ্ডপের মধ্যে তখন বাতি দিয়ে পুজো হচ্ছে। তার মধ্যেই হইচই, ঢাকের বাদ্যি। এই দিনটাও কিন্তু ছিল আনন্দের।

তারপড়ে যা এল তা ইতিহাস। একসময়ের ফ্রেঞ্চ কলোনিতে নবজাগরণ। আসলে চন্দননগরের ভারতের স্বাধীনতারও তিন বছর পড়ে স্বাধীনতা পেয়েছিল ফ্রান্সের হাত থেকে। সেই পরাধীনতার যুগে পুজোয় ফিলামেন্টের লাইটের মাধুর্যই আলাদা।

আরও পড়ুন: বিজেপির মতে, ‘রথের ব্যাপারে মমতার থেকে সিপিএম ভালো’

১৯২৪-২৫ সাল, চন্দননগরের রাস্তায় রাস্তায় তখন গোল-পাকানো তারের বান্ডিল আর ছোট ছোট লোহার পোস্ট। বিজলি বাতির কর্মযজ্ঞ চলছে। কলকাতার রাস্তায় প্রথম আলো জ্বলেছে ১৯০১ সালে হ্যারিসান রোডে। এই বালব জালানো শুরু করেছিলেন এক বাঙালী কোম্পানী ‘দে, শীল অ্যান্ড কোং।

কলকাতা থেকে ২৩ বছর লেগে গিয়েছিল চন্দননগরে ইলেক্ট্রিক আসতে। শহরে সন্ধ্যে হলেই সার দিয়ে জ্বলতে শুরু করল হলুদ ডুম। আলো জ্বলছে বাড়িতেও। মানুষের ব্যবহৃত শব্দকোষে ঢুকে পড়ল ‘পাওয়ারের আলো’, ‘ওয়াট’ ‘কারেন্ট’ ইত্যাদি। মন্ডপে আলো জ্বালানোর শুরু তখন থেকেই।

আরও পড়ুন: সল্টলেকে অটো উলটে জখম চার

ত্রিশ – চল্লিশের দশকের মাঝের সময়। বাতি থেকে বিজলি বাতি। হলুদ আলোয় ঝলমলে জগদ্ধাত্রী মায়ের মুখ। আলোর ঝরনার সূচনা তখন থেকেই। একটা লম্বা তারে অনেকগুলো ডুম লাগানো শুরু হল রাস্তার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। আলোর মালা পড়ে শুরু চন্দননগর শহরের আলোক যাত্রা এবং খ্যাতি। এটাও বিস্ময়কর কারন, তখন সবে আলো এসেছে, সবাই জানে তারের ডগায় শুধু আলো জ্বলে। তার মাঝেও যে জ্বলে সেটাই বিস্ময় ছিল সেই সময়ে।

আলোর মালা বাঁধল নন্দী বাড়ি। সেই মালার অনুকরণেই আলোক মালা ছড়িয়ে পড়ল শহরের মন্ডপে মন্ডপে। চন্দননগরের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু পাড়া বাগবাজার। এই অঞ্চলে সেইসময় একদল উড়িষ্যাবাসী বসবাস করতো। বাগবাজারের কালিতলা মোড় থেকে দক্ষিনে কিছুটা এগিয়ে বাঁহাতে ছিল তাদের বাস। হালুইকর তারা।

আরও পড়ুন: সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা, কান কাটা গেল সদ্যোজাতের

তাই আজও বলা হয় বাগবাজার উড়েপাড়া। তাদের মূলতঃ এখানে এনেছিলেন ইন্দ্রনারায়ন চৌধূরী পালকীর বাহক হিসাবে। সে আরেক গল্প। এখানকারই সরকার বাড়ির ছেলে দেবেন সরকার প্রথম বাঁশের বাঁকারিতে বেঁধে ফেললে ঐ আলোর মালা এবং তা বেঁকিয়ে অরধবৃত্ত ও বৃত্ত। হৈ হৈ পড়ে গেল শহর জুড়ে। শুরু আলোর খেলা।

পঞ্চাশের দশকে দেখা গেল আলোয় ভাসছে চন্দননগর। এবং এক্ষেত্রে লালবাগানের কুন্ডুরা ছিলেন অগ্রগন্য। কুন্ডু’র বাড়ির ছেলেরা নানারকম আলোর কসরৎ শুরু করেছিল সেই সময়ে। বাড়ির ছাদ থেকে আলোর মালা ঝুলিয়ে দেওয়া হল রাস্তা পর্যন্ত।

আরও পড়ুন: কাশ্মীর নিয়ে ঠিক কথাই বলেছেন আফ্রিদি: রাজনাথ সিং

আলো দেখতে, এমন উত্সাহ ছড়িয়ে পড়েছিল যে, সর্বজনীন পুজোয় বাড়ির মালিকরাই ইলেকট্রিকের খরচা দিয়ে দিতেন। তখন লালবাগানের ভড়েরা ইলেক্ট্রিসিটি কিনে নিয়েছে। প্রাইভেট মালিকের এই ইলেক্ট্রিসিটিকে লোকজন বলতো ‘ভড় কোম্পানি’র আলো।

আরও পড়ুন: সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা, কান কাটা গেল সদ্যোজাতের

সেই ভড় কোম্পানি জগদ্ধাত্রী পূজার ক’দিন ইলেক্ট্রিকের সাপ্লাই বেশী করার জন্য আলাদা করে মজুত রাখতো। মজার ব্যাপার হলো বারোয়ারিগুলির কাছ থেকে তারজন্য অধিক মাশুল চাইতেন না তাঁরা। চন্দননগরের আদি বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে এখনও ঘুরে বেড়ায় সেই লাইট আসার ইতিহাস। যা আজ গর্বের।

তথ্য – বাগবাজার সর্বজনীন জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটি