সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া: রামের সাধের পুকুর বুজিয়ে নাকি বানানো হচ্ছে ইমারত। এমনই অভিযোগ হাওড়ার তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান বিধায়কের বিরুদ্ধে। হাওড়ার ঐতিহাসিক রামরাজাতলা মন্দিরের ঠিক পিছন দিকে একসময় পুকুর ছিল। সেই পুকুরকেই বুজিয়ে ফেলে বেআইনি প্রোমোটিংয়ের অভিযোগ উঠেছে।

হাওড়ার রামরাজাতলায় ২৫০বছরেও বেশি সময় ধরে রাম ঠাকুরের পুজো হয়ে আসছে। সেই রাম মন্দিরের ‘রামরাজা মন্দির উন্নয়ন পরিষদ’-এর সভাপতি বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক জটু লাহিড়ী। অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধেই। তিনি নাকি ওই ঐতিহাসিক পুকুর বুজিয়ে দিয়ে বে-আইনি নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন।

kolkata24x7 ঘটনার খোঁজ করতে গিয়েছিল। পুকুরের কথা জিজ্ঞাসা করতেই মন্দির চত্বরে খেলনার পসরা সাজিয়ে বসা এক মহিলা ব্যবসায়ী বললেন, “পুকুর? সে তো অনেক আগেই বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। সে আর আছে নাকি!”

মন্দির চত্বর থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে ডান হাতে বাঁক নিয়ে দেখা গেল প্রচুর নতুন দোকান হচ্ছে। জানা গেল প্রশাসনের তরফে নতুন ভাবে এই দোকানঘরগুলি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। কিছুদিনের জন্য ব্যবসায়ীদের পাশের ছোট জায়গায় ব্যবসা চালাতে বলা হয়েছে। তা নিয়েও সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রশাসন শীঘ্র কাজ শেষ করা এবং তার আগে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় সেই ক্ষোভ এখন স্তিমিত। ওই নির্মীয়মাণ দোকানঘরের ভিতর দিয়ে গেলেই দেখা গেল জলা জমিটি। পানায় ভরতি। মাঝখান থেকে দেখা অনেকগুলি পিলার তৈরির জন্য ইট গাঁথা হয়েছে। লোহার রড বেড়িয়ে রয়েছে গাঁথনি থেকে।

প্রশ্ন হল হঠাৎ রাম মন্দিরের এই পানা পুকুর নিয়ে এত অভিযোগ উঠছে কেন ? কেনই বা স্থানীয়দের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে ওই পুকুরকে নিয়ে? জানা গেল ওই পুকুরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সেই কাহিনী মন্দিরের দেওয়ালেও খদাই করে কিছুটা লেখা রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী , ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে সারদা দেবীর পদধূলি পড়েছিল হাওড়ার রামরাজাতলায়।ঐ বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে মা সারদার পানিবসন্ত হয়েছিল।সেরে ওঠার পরে গোলাপ মা এবং যোগীন মা’র সঙ্গে হাওড়ার রামকৃষ্ণপুরে নবগোপাল বাবুর বাসায় আসেন। শোনা যায়, রামমন্দির সংলগ্ন পুকুরে স্নান করে তিনি রামমন্দিরে পুজো দিয়েছিলেন।

এমনই এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানই ইট, বালি, লোহার আড়ালে চলে যাওয়াতেই কিছুটা ক্ষোভের সঞ্চার রয়েছে। তবে এতে আবার ইন্ধন যোগাচ্ছে রাজ্য জুড়ে মাথাচারা দেওয়া বিজেপি’র সমর্থন। তৃণমূল সমর্থকদের অভিযোগ, পুকুর অনেক দিন আগেই বুজে গিয়েছিল। পুকুরের আর কিছু ছিল না। যে নির্মাণ দেখা যাচ্ছে সেটির জন্য ভীত তৈরির সময়তে মাটি কোপাতে গিয়ে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল মজুরদের।

বসে যাওয়া মাটিতে নোংরার স্তূপ জমে, জল পড়ে তা প্রচণ্ড শক্ত হয়ে গিয়েছিল বলে জানাচ্ছে তারা। অভিযোগ এসবই গেরুয়া শিবিরের উস্কানি। যার ফলে এসব প্রশ্ন উঠছে। এই প্রসঙ্গে জটু লাহিড়ী বলেন , “আমার ৮৪ বছর বয়স। ছোটবেলায় রামপুজোর সময়ে ওখানে যাত্রা দেখতে যেতাম। আমার জ্ঞানত কোনওদিন পুকুর বলে যেটাকে বলা হচ্ছে সেটাকে সুস্থ দেখিনি। বহু দিনই ওটা শুকিয়ে গিয়েছিল। ওটার আর কিছু ছিল না।”

ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে চাননি। এদিকে এই প্রসঙ্গে হাওড়া বিজেপির যুব মোর্চার সম্পাদক ওম প্রকাশ সিনহা বলেন , “দেশের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা মা মাটি মানুষের সরকার প্রথম থেকেই করছে। এটাও তেমনই হচ্ছে। বিধায়কের এলাকার ব্যাপক প্রভাবশালী।”

প্রসঙ্গত , পুরসভার খাতায় কলমে ওই এলাকা এখনও পুকুর। পুকুর বুজিয়ে নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ জারি করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল হাওড়া পৌরসভা। স্থগিতাদেশ পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়, ২৮নং রামচরণ শেঠ রোডের ঐ নির্দিষ্ট জলাশয়টিকে নোটিশ পাওয়ার ২১ দিনের মধ্যে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে।না হলে ১৭এ পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ঐ ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে সব অবশ্য কিছু হয়নি।