ছবি: শশী ঘোষ

শশী ঘোষ, ক্যানিং: প্রশ্ন যদি করা হয়, এই মুহূর্তে দেশের সব থেকে বিতর্কিত শব্দ কোনটি? তবে এক বাক্যে উত্তর হবে-‘গরু’। এই চতুষ্পদী শান্ত প্রাণীটি অশান্ত হয়ে উঠলে গোটা দেশে কি হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘গরু’ শব্দটা এখন যেন একটা বোমার সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রেন বা বাসে, অফিসে কিংবা পাড়ার চায়ের দোকানে এই শব্দটা উচ্চারণ হওয়া মাত্র আতঙ্কের শুরু। এই বুঝি ধাইকিড়ি-কিড়ি বলে তেড়ে এলো গো-রক্ষক এবং গো-ভক্ষকের দল। ধর্ম নিয়ে যখন দুই গোষ্ঠীর ঠোকাঠুকিতে উত্তাল রাজ্যের কয়েকটি জেলা, তখন দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলাতেই লড়াই এর সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি ধরা পড়ল। আগুন নিয়ে নয়, এ লড়াই আনন্দের, এ লড়াই মজার, এই লড়াই বন্ধুত্বের৷

দমকলে খবর দেয় মকসুদ, শৌভিককে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন আমিরুল

দক্ষিণ ২৪ পরগণার ক্যানিং এর হেরোভাঙ্গা গ্রাম। এই গ্রামের টাটপাড়া এলাকার লড়াই অবশ্য শুরু হয়ে হয়েছিল দীর্ঘ ২৬ বছর আগে। টানটান উত্তেজনা নিয়ে সকাল থেকে তৈরি থাকে সব মানুষ। যদিও এই লড়াই মানুষের সঙ্গে মানুষের নয়। এ লড়াই ‘গরুর’ সঙ্গে ‘গরুর’ লড়াই। যার নাম ‘মইছাড়া’। রাজ্য রাজনীতি থেকে শুরু করে গোটা দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই শান্তপ্রিয় প্রাণীটিকে নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে নোংরা রাজনীতি করতে ব্যাস্ত। ঠিক তখন, হেরোভাঙ্গা গ্রামের টাটপাড়াতে হিন্দু-মুসলিম একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গরুর দৌড়ের আয়োজন করে। উদ্দেশ্য একটাই, জমির ফসল যাতে ভালো হয়, জমি যেন আরও উর্বর হয়। ক্ষেত যেন শস্য শ্যামলা হয়ে ওঠে। সব মানুষ দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে পড়ে সুখে শান্তিতে থাকতে পারে।

তাই প্রত্যেক বছর বর্ষার সময় এই ‘মইছাড়া’ উৎসবের আয়োজন করা হয় ক্যানিং এর টাটপাড়ায়। কি এই ‘মইছাড়া’? মইছাড়া মানে গরুর দৌড়। ১৩৯৮ বঙ্গাব্দে টাটপাড়ার কয়েকজন মানুষ প্রথমে এই খেলার আয়োজন করেছিল। এই খেলায় হিন্দু-মুসলিম একে অপরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলতে নামে। রহিমকে জেতানোর জন্যে এখানে রাম চিৎকার করে। শঙ্করের গরুর জন্য চিৎকার করে হাসান৷ সারা বছর ধরে গরুকে খাইয়ে পড়িয়ে শক্ত সামর্থ্য করে তোলা হয় যাতে জেতার সুখ উপভোগ করা যায়। বর্ষা এলেই ধান চাষের আগে ক্ষেতের মাঝখানে গরুর রেস শুরু হয়। দেখা হয় কার গরুর কত জোর এবং কত জোরে সে দৌড়াতে পারে। খুব সুন্দর এক দৃশ্য৷ একদিকে কেউ আল্লাহর নামাজ পরে গরু নিয়ে মাঠে নামে অন্যদিকে কেউ মাঠে নামে দুহাত তুলে আকাশের দিকে সূর্য নমস্কার করে। গরুর দৌড় দিয়েই চাষ এর মাঠে হাল চালানোর শুরু৷ ঠিক যেন দূর্গাপূজোর আগে খুঁটিপূজো৷

ছবি: শশী ঘোষ

প্রথমে এই গরুর দৌড় এলাকারই গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন বছর ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে এই খেলায় মানুষজনও বেড়েছে। আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষজন এই খেলায় অংশ নিতে আসে। প্রথম রেসেই দৌড়ায় সফিকুল ইসলাম এবং গোপাল দেবনাথ এর গরু৷ সফিকুলের কাঁধ চাপরাতে চাপরাতে গোপাল বলেন, ‘গতবার প্রথম রাউন্ডে হেরে বাড়ী চলে গিয়েছিলাম কিন্তু এবার একবছর ধরে খেলার প্রস্তুতি নিয়েছি, কিছুতেই জায়গা ছাড়বো না’৷ গোপালবাবুর কথা শেষ না হতেই সফিকুল মুচকি হেসে বলেন, ‘মাঠেই দেখা যাবে’৷এর থেকে সুন্দর ছবি আর কোথাও দেখা যায় না।
আগে খেলার প্রথম পুরস্কার হিসেবে বিজেতাকে গরু দেওয়া হত। এখন এই পুরষ্কারের ধরণ বদলেছে। প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ‘হিরো সাইকেল এবং আলমারি’। আর তা জেতার জন্যে মানুষ থুড়ি ‘গরু’ জান লড়িয়ে দেয়। মইছাড়া উৎসবের সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মোল্লা জানান, ‘আমাদের এই তিনদিনের উৎসবে, ক্যানিং এর বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজন অংশগ্রহণ করতে আসে। আগে এই গরুর দৌড়ের কথা খুব কম মানুষ জানতো। কিন্তু এখন এই খেলা দেখার জন্যে রাজ্যের পাশাপাশি ভিন রাজ্য থেকেও অনেক মানুষ আসে।’

এই মইছাড়া উৎসব কোনও গরুর দৌড় নয় এ যেন এক মিলন উৎসব। এখানে জাতি-ধর্ম মিলে মিশে সব একাকার।’
রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতারা বরাবর নিজেদের স্বার্থলাভের চেষ্টায় থাকে। কিন্তু টাটপারায় কোথাও কোন রাজনীতির রঙ নেই, কোথাও কোন হিংসা নেই। ধর্ম- রঙ- মত, সব কিছুর উর্ধ্বে এখানে সবাই মানুষ। একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কি করে থাকতে হয় সেটা এখানকার সব ধর্মের মানুষই জানে। অন্য এক ‘গরুর লড়াই’ নিয়ে টাটপাড়ার ‘মইছাড়া’ এখন রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জ্বলন্ত উদাহরণ৷