স্টাফ রিপোর্টার, পাঁশকুড়া: নেই সেই রাজত্ব ৷ ফলে নেই রাজাও ৷ রাজবাড়ি থাকলেও কালের অমোঘ নিয়মে দেওয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তরা ৷ পড়েছে শ্যাওলার আস্তরণ ৷ তবুও অস্তমিত রাজমহিমার রেশ হিসেবে রয়ে গিয়েছে ৪৪৬ বছরের পুরোন দুর্গাপুজো ৷ আর তাকেই সম্বল করে মহালয়া এলেই রঙিন হয়ে ওঠে পাঁশকুড়ার কাশীজোড়া রাজবাড়ি।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই পুজো? সেই ইতিহাস জানতে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় ৫০০ বছর ৷ ষোড়শ শতাব্দীতে দিল্লিতে তখন মুঘল সম্রাট আকবরের শাসন ৷ সেই সময় পঞ্জাবের সিরহিন্দ থেকে ভাগ্য অন্বেষণে বেরিয়ে ছিলেন কর্মহীন এক ক্ষত্রিয় যুবক। নাম গঙ্গানারায়ণ রায় । পায়ে হেঁটে গেছিলেন পুরীতে । সুঠাম চেহারা দেখে গঙ্গানারায়ণকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করেন তৎকালীন পুরীর রাজা কালাপাহাড় ৷ তাঁর চোখ গঙ্গানারায়ণকে চিনতে ভুল করেনি ৷ অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের কর্মদক্ষতার পরিচয় দেন গঙ্গানারায়ণ ৷

তাঁকে সেনাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত করেন পুরীর রাজা । এরপর মোঘলদের সঙ্গে যুদ্ধ হয় কালাপাহাড়ের। পরাজিত হয় শক্তিশালী মোঘলরা ৷ সেনাধক্ষ্যের পারদর্শিতায় মুগ্ধ হন পুরীর রাজা ৷ পুরস্কার স্বরূপ গঙ্গানারায়ণকে কাশীজোড়া পরগনার (পাঁশকুড়া ব্লকের রঘুনাথবাড়ির) রাজত্বের ভার দেন তিনি ৷

দায়িত্ব পেয়ে কাশীজোড়ার উদ্দ্য়েশে রওনা দেন গঙ্গানারায়ণ৷ কথিত আছে, সেই সময় স্বপ্নে দেবী দুর্গাকে দেখতে পান তিনি ৷ রাজত্ব শুরুর আগে প্রজাদের মঙ্গল কামনায় রাজবাড়িতে দেবী দুর্গাকে প্রতিষ্ঠার স্বপ্নাদেশ পান গঙ্গানারায়ণ ৷ এরপর রাজবাড়িতে এসে দুর্গাপুজো শুরু করেন তিনি ৷ মহালয়া থেকে শুরু হয় সেই পুজো ৷ চলে দশমী পর্যন্ত ৷

তবে পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, দেবী দুর্গার হাতে কোনও প্রতীকী অস্ত্র থাকে না ৷ বরং যুদ্ধক্ষেত্রে গঙ্গানারায়ণের ব্যবহৃত অস্ত্রই শোভিত হয় দেবী দুর্গার হাতে ৷ পরম্পরা মেনে আজও চলে আসছে সেই রীতিই ৷ রাজ আমলে যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র আজও দেবী দুর্গার হাতে শোভা পায় ৷

রাজ পরিবারের সদস্য দীপক নারায়ণ রায় জানান, মহালয়ার দিন থেকেই ঘট পেতে শুরু হয় পুজো ৷ প্রতিদিন পুজো শুরু আগেই পূজিত হন রাজবাড়ির কুলদেবতা রাধাকৃষ্ণ ও রঘুনাথ জিউ । তারপর দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয় ৷ তবে কুলদেবতা রাধাকৃষ্ণ হওয়ায় পুজোতে বলিপ্রথা পুরোপুরি নিষিদ্ধ ।

আরও একটি বিশেষত্ব রয়েছে এই পুজোর ৷ রাজবাড়ির অপর এক সদস্য অমিতা রায় জানান, সন্ধি পুজোর পর শুধুমাত্র রাজবাড়ির বউরাই দেবী দুর্গাকে ভোগ নিবেদন করেন ৷ কোনও পুরুষ এমন কী কোনও ব্রাহ্মণও সেই কাজে হাত লাগাতে পারেন না। প্রথম থেকেই চলে আসা এই রীতি আজও অপরিবর্তিত রয়ে গিয়েছে৷  প্রতি বছর সন্ধি পুজোর পর নিষ্ঠার সঙ্গে দেবী দুর্গাকে ভোগ নিবেদন রাজবাড়ির বউরা ৷ রাজবাড়ির কোনও মেয়ের বিয়ের পর তিনিও দেবীকে ভোগ দিতে পারেন না।

দেবীর ভোগের মধ্যেও রয়েছে বিশেষত্ব ৷ প্রথামতো ভোগ হিসেবে দেবী দুর্গাকে পোড়া মাছ, পোড়া রুটি, অন্ন ও লাল নোটে শাকের ডাঁটা ও বড়া দিয়ে তেঁতুলের টক দেওয়া হয় ৷

অমিতার কথায়, “স্বপ্নাদেশের সময় গঙ্গানারায়ণ বলেন, আমি যে তোমাকে প্রতিষ্ঠা করব, খাওয়াব কী ? আমি তো নিজেই খেতে পাব না ৷ সবে তো নতুন জায়গা পেলাম ৷ তখন দেবী বলেন, কিছু দিতে হবে না ৷ অষ্টমীর সন্ধির পর যে পুজো হবে তারপর শুধু অন্ন দেবে ৷ যদি না তেল-ঘি পাও, মাছ পুড়িয়ে দেবে ৷ আর বেসনের বড়া করে লাল নটে ডাঁটার টক দিলেই হবে৷ তাতেই আমি সন্তুষ্ট হব ৷”

পরে অবশ্য় পুজোর ভোগে আরও বৈচিত্র্য় আসে ৷ এখন ভোগে দেবী দুর্গাকে পঞ্জব্যঞ্জন, তরকারি, পাঁচ-দশ রকম ভাজা, শুক্তো, ফ্রায়েড রাইস, ছোলার ডাল, মুগের ডাল নিবেদন করা হয়। ধীরে ধীরে পুজোর জাঁকজমক ও জৌলুস কিছুটা কমলেও এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা করেন রাজপরিবারের সদস্যরা ৷ পুজো দেখতে আজও আশেপাশের এলাকা থেকে ভিড় জমান বাসিন্দারা ৷ পুজোর ভোগ দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় পরিবারের সদস্যদের।

দশমীর দিন দেবী দুর্গাকে নিরস্ত্র করে রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠা পুকুরে নিরঞ্জন দেওয়া হয়। একাদশীর দিন পুকুর থেকে প্রতিমার মেড় তুলে আনা হয়। এরপর মন্দিরে সেই মেড় ও রাজার অস্ত্র সারা বছর ধরে পুজো করা হয়।

জেলবন্দি তথাকথিত অপরাধীদের আলোর জগতে ফিরিয়ে এনে নজির স্থাপন করেছেন। মুখোমুখি নৃত্যশিল্পী অলোকানন্দা রায়।