শশী ঘোষ, বারাসত: শুরুটা করেছিল কয়েকজন মিলে। এরপর আস্তে আস্তে  এত বড় আকার ধারণ করবে তা বোধহয় এরা নিজেরাও বুঝতে পারেনি। সবাই যে এক কথায় এভাবে এগিয়ে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে তা ভাবলেই কেমন অবাক লাগে। কিছুদিন আগে এক শিক্ষক জানতে পারেন তাঁর এক ছাত্রের ক্যানসার হয়েছে। তাকে বাঁচানোর জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তা জোগাড় করার সামর্থ্য তার পরিবারের নেই। এরপর থেকে শুরু হয় লড়াই। এক এক করে পাশে এসে দাঁড়াতে শুরু করেন অনেকেই। লড়াইটা শুরুতে খুব একটা সহজ ছিল না। কিন্তু যত দিন গিয়েছে বাধা কাটিয়ে অনেকটা পথ অতিক্রম করতে পেরেছেন তিনি।

বিভিন্ন কুখ্যাত ঘটনার জন্য গত কয়েকবছর ধরে বারাসত বারবার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। আর সেই বারাসতেই একদল মানুষ এসব থেকে অনেক দূরে লড়াই করে যাচ্ছে ক্যানসার আক্রান্তের জন্য। গোল্ডেন হরাইজন কোচিং সেন্টারের শিক্ষক শম্ভু নাথ দাস ঘটনাটার কথা জানতে পারেন বেশ কয়েকমাস আগে। জানতে পারেন তাঁর ছাত্র দ্বীপের ক্যনসার। তার চিকিৎসার খরচ চলাতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব, তার পরিবারের পক্ষে। বছর ১৪-র কিশোরের শরীরে এমন মারণরোগ বাসা বেঁধেছে, এই খবর স্থির থাকতে দিচ্ছিল না শম্ভু নাথ বাবুকে।

এ সময় এগিয়ে আসেন তিনি। বলেন, ‘অর্থের জন্য দ্বীপের চিকিৎসা থেমে থাকবে তা তিনি কোনদিন হতে দেবেন না। গোটা দেশ যখন ক্যনসারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারছে তখন দ্বীপও পারবে, আমারা ওর সঙ্গে আছি।’ কে এই শম্ভু নাথ বাবু? কোনও রাজনৈতিক কর্মী নাকি নেতা গোছের মানুষ? নাকি অনেক টাকার মালিক? আসলে তিনি এর মধ্যে কোনটাই নয়। শম্ভুনাথ বাবু হলেন একজন  ছাপোষা মধ্যবিত্ত শিক্ষক যার রুজি রোজগার বলতে শুধু শিক্ষকতা করা। আপদে বিপদে সব সময় এগিয়ে এসে তিনি যতটুক পেরেছেন সবাই কে সাহায্য করেছেন।

দ্বীপের ক্ষেত্রেও তাই কোনরকম হেরফের হয়নি। অর্থের পরিমাণ অনেকটা জেনেও দ্বীপকে বাঁচানোর লড়াইতে পিছিয়ে যাননি তিনি। শুরু করেন লড়াই। শম্ভু নাথ বাবু নিজের কোচিং এর ছাত্রছাত্রী দের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে অর্থ জোগাড় করার কাজ শুরু করেন। শুরুতে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। অনেকের কাছে হয়েছেন উপহাসের পাত্র আবার কখনও শুনতে হয়েছে বিভিন্ন তির্যক মন্তব্য। তবুও ভেঙে পড়েননি।

শম্ভুনাথ বাবু বলেন ” দ্বীপের ক্যানসারের কথা যখন জানতে পারি তখন খুব খারাপ লাগছিলো। এরকম এক কিশোর যার জীবন সবে মাত্র শুরু করেছে। তার আগে এভাবে থেমে যাবে অর্থের জন্য? মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার সব ছাত্রছাত্রীদের এ কথা জানাই, তারপর তারা এক কথা রাজি হয়ে যায় সাহায্যের জন্য। সবাই মিলে স্কুল কলেজগুলোতে যাওয়া শুরু করি সাহায্যের জন্য। আমরা গত দু’মাসে ২ লক্ষ টাকা জোগাড় করতে পেরেছি।’ গত ১৫ অগাস্ট দ্বীপের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সেই টাকা। এগিয়ে এসেছে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, কলকাতা ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা। সহযোগিতা করছে ‘দ্বেষ-দ্রোহী’ নামে কলেজ ছাত্রদের এক সংগঠন।”

এভাবেই গোল্ডেন হরাইজেন এবং দ্বেষ-দ্রোহী সংস্থা দ্বীপের জন্যে কাজ করছে। বারাসাতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে গান করে মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলতে শুরু করে দিয়েছি ইতিমধ্যে। শুরুর দিকে এমন অনেকে ছিল যারা মুখ ফিরেয়ে নিয়েছিল আজ তারাই দ্বীপের জন্যে রাস্তায় নেমেছে। ক্যানসারের বিরুদ্ধে এই লড়াই এখন আর বারাসতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই তা ছড়িয়ে সব স্কুল কলেজ গুলোতে। দ্বীপের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা জানান, আমরা কোনদিন ভাবতে পারিনি এত মানুষকে আমাদের পাশে পাবো এই সব কিছু সম্ভব হয়েছে শম্ভুনাথ বাবুর জন্য, তিনি যদি না থাকতেন তবে এসব কোনও কিছু সম্ভব হত না। ভালোলাগাও যেমন রয়েছে তেমন একটা ক্ষোভও রয়েছে তার পরিবারের। দ্বীপের স্কুলের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ, বারবার আবেদন করেও কোনরকম সাহায্য পাননি তাঁরা। অবশ্য এ ব্যাপার নিয়ে তারা মাথা ঘামতে চান না। তাদের এখন মূল চিন্তা দ্বীপকে ভাল করে তোলা। এই চিন্তা যে শুধুমাত্র দ্বীপের পরিবারের তা নয় এখন গোটা বারাসাতের মানুষ চাইছে দ্বীপ তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুক। এখন তাই একটাই স্লোগান হয়তো সবার মনের মধ্যে মধ্যে চলছে ‘দ্বীপ আমরা তোমার পাশে আছি, তুমি জিততে পারবে।’