সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : একজন গভীর ভাবে পৌত্তলিক প্রথার বিরোধী, অপরজন ঈশ্বর সাধনায় নিবেদিত প্রাণ, ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারীও বটে। দুজনের ভাবনার বিস্তর ফারাক। বিশ্বাসেও কোনও মিল নেই। তবু কি অদ্ভুত টানে মহেন্দ্রলাল সরকারকে আটকে রেখেছিলেন রামকৃষ্ণ দেব। ঠাকুর যে আর নেই তা তিনি এসেই প্রথম বুঝেছিলেন। ভক্তরা তখনও ভাবছে পরমহংস সমাধিস্থ হয়েছেন। কিন্তু না, তিনি চির সমাধিতে গিয়েছিলেন কেউ বুঝতে পারেনি।

ঘটনা কেমন? জানা যায়, কাশীপুরে থাকাকালীন শেষ দিকে মহেন্দ্রলালের অনুমতি নিয়েই রামকৃষ্ণদেবের চিকিৎসা করতেন বাগবাজারের কবিরাজ নবীনচন্দ্র পাল, কারণ তখন মহেন্দ্রলাল তাঁর কাছে নিয়মিত আসতে পারতেন না। শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর ব্যাপারে মহেন্দ্রলালের ডায়েরি থেকে জানা যায়, তিনি কাশীপুর উদ্যানবাটীতে এসে রামকৃষ্ণদেবকে দেখে ঘোষণা করেছিলেন, সেটা সমাধি নয়, আগের রাতে একটা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। নিজের ডায়েরিতে তিনি ইংরেজিতে লিখেছিলেন, ‘‘খাবার পর যেতে হয়েছিল প্রথম ডাফ স্ট্রিটের এক মহিলা রোগীকে দেখতে, তার পর পরমহংস দেবের কাছে, গিয়ে যাঁকে মৃত দেখলাম। তিনি গতরাত্রি একটায় মারা গিয়েছেন। দেখলাম – বাঁ পাশ ফিরে শুয়ে আছেন। পা দু’টি গুটানো, চোখ খোলা, মুখ খানিকটা খোলা। তাঁর ভক্তরা মনে করেছিলেন তিনি সমাধিস্থ, মৃত নন। আমি সেই ধারণা দূর করলাম। তাঁর একটা ফটো তুলতে বললাম এবং আমার চাঁদা হিসাবে দশ টাকা দিলাম।’’ তবে তিনি রামকৃষ্ণদেবের শ্মশানযাত্রী হননি।

শ্রীরামকৃষ্ণেকে ১৮৮৫ সালের কোনও এক সময় তাঁকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছিল মহেন্দ্রলালের শাঁখারিটোলার বাড়িতে। সেই অভিজ্ঞতার কথা দক্ষিণেশ্বরের রাখাল ডাক্তারকে বলেছিলেন রামকৃষ্ণদেব – ‘‘মহেন্দ্র সরকার দেখেছিল, কিন্তু জিভ এমন জোরে চেপেছিল যে ভারী যন্ত্রণা হয়েছিল, যেন গরুর জিভ চেপে ধরেছে।’’ পরে আবার অন্য জায়গায় বলেছিলেন, ‘‘খুব ভাল করে দেখবে বলে টিপেছিল।’’ রামকৃষ্ণদেব শ্যামপুকুরে থাকার সময়ে গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁকে মহেন্দ্রলালকে আবার দেখানোর বা হোমিয়োপ্যাথ চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের মধ্যে কোনও একজনকে দেখানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেখানে মহেন্দ্রলাল প্রথম এসেছিলেন ১৮৮৫ সালের ১২ই অক্টোবর। কেউ কেউ বলেন, প্রথম দিন তিনি ১৬ টাকা ফি নিয়েছিলেন, পরে আর টাকা নিতেন না।

দিনের পর দিন রামকৃষ্ণদেবের কাছে এসে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন, আলোচনায় যোগ দিতেন, হাসিঠাট্টা-তর্কবিতর্কও চলত। রামকৃষ্ণদেবকে তিনি বলতেন, ‘‘তোমার সত্যানুরাগের জন্যই তোমায় এত ভালো লাগে। তুমি যেটা সত্য বলিয়া বুঝ, তার একচুল এ দিক ও দিক করে চলতে পার না। অন্যস্থানে দেখি, তারা বলে এক, করে এক। এইটে আমি আদৌ সহ্য করতে পারি না।’’ মহেন্দ্রলাল ঈশ্বর মানতেন, কিন্তু অবতার, অলৌকিকত্ব, মূর্তিপুজোর ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বরাবর বলতেন, ‘‘বিশ্বাস অন্ধ এবং ধর্ম অযৌক্তিক। এদের স্থান হৃদয়ে, বুদ্ধির সঙ্গে এদের সম্পর্ক নেই।’’ আপাদমস্তক বিজ্ঞানের সাধক চিকিৎসক শ্রীরামকৃষ্ণকে তিনি কখনও প্রণাম করেননি বা বাড়তি শ্রদ্ধাভক্তি দেখাননি। বরং তাঁর সঙ্গে তিনি মিশেছিলেন বন্ধুর মতো। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধিদীপ্ত তর্কবিতর্ক-আলোচনা চলত, তাঁরা পরস্পরের যুক্তি খণ্ডনও করতেন। কিন্তু মানসিকতা ও ধ্যানধারণার বিপুল অমিল সত্ত্বেও রামকৃষ্ণ ও মহেন্দ্রলাল অমোঘ মোহময় বাঁধনে আবদ্ধ থেকেছিলেন শেষ পর্যন্ত। শ্যামপুকুর বাটীতে এক বার সকলের সামনেই মহেন্দ্রলাল মা কালীকে নিয়ে কটু কথা বলেছিলেন। সেটা শুনে সবাই হেসে ফেলেছিলেন। তিনিই আবার এক দিন রামকৃষ্ণকে বলেছিলেন, ‘‘যখন তুমি গাচ্ছিলে ‘দে মা পাগল করে, আর কাজ নেই জ্ঞানবিচারে’ তখন আর থাকতে পারি নাই। তার পর অনেক কষ্টে ভাব চাপলুম, ভাবলুম যে, ডিসপ্লে করা হবে না।’’ তাঁর বৈজ্ঞানিক সত্তা ও আধ্যাত্মিক সত্তার মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব নিরন্তর চলত। রামকৃষ্ণ সেটা বুঝতে পারতেন। চিকিৎসকের ভিতরকার ভাগবৎ সত্তা অনুভব করতেন, তাই হয়তো তিনি বলেছিলেন, ‘‘তুমি রোসবে।’’ নিজের ভক্তদের দিয়ে রামপ্রসাদের ও কমলাকান্তের বই আনিয়ে তার মধ্যে কয়েকটা গান বেছে নিয়ে বলতেন, ‘‘এই সব গান ডাক্তারের ভিতর ঢুকিয়ে দেবে।’’

তথ্যসূত্র : শ্রীরামকৃষ্ণের ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার, ড. জলধিকুমার সরকার।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।