ফাইল ছবি৷

শেখর দুবে, কলকাতা: স্কুলবাড়ি রয়েছে, ছাত্র সংখ্যাও ভালো , প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো সময় মেনে পড়ানো, বর্হিমূল্যায়ণ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মিড ডে মিল রয়েছে সবই, নেই শুধু বেতনের পরিকাঠামো৷ ১৯৯৮-৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হওয়া শিশুশিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক শিক্ষিকাদের বেতন আজও ৫৯৫৪ টাকা৷ এমএসকে অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র হলে বেতনটা ৯০০০ কিছু বেশি৷

প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে পড়ানোর কোনও ফারাক না থাকলেও রাজ্য সরকারের শিশুশিক্ষা মিশনের অন্তর্গত স্কুলগুলিতে যারা প্রায় ২০ বছর ধরে পড়িয়ে আসছেন তাদের জোটেনি শিক্ষকের তকমাটুকুও, সরকারি খাতায় ওঁরা সহায়ক , সহায়িকা৷ সম্প্রতি প্রাইমারি শিক্ষার নিয়ম মেনেই ডিইলইড(D.El.ED, ডিপ্লোমা ইন এলিমেন্টরি এডুকেশন) এর কোর্ষও করানো হয়েছে শিশুশিক্ষা মিশনের অন্তর্গত সহায়ক সহায়িকাদের৷ কিন্তু ভাতা সেই মান্ধাতার আমলেই পড়ে রয়েছে৷

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিভিক পুলিশ, হোমগার্ড, প্যারাটিচার, আশা কর্মী নিয়োগ করেছে৷ কয়েক বছরেই এই সব চাকরীতে থাকা কর্মীদের বেতন বেড়েছে অনেকটাই৷ ২০১৩ সালে কোন রকম লিখিত পরীক্ষা ছাডা়ই সিভিক ভলেন্টিয়ারর্স নিয়োগ করেছিল রাজ্য সরকার৷ তখন তাদের ভাতা বাবদ দেওয়া হত তিন হাজারের কিছু কম টাকা৷ শেষ পাঁচবছরে ধাপে ধাপে বেড়ে তা আটহাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে৷ কিন্তু ২০ বছর চাকরী করার পরও শিশুশিক্ষার সহায়ক-সহায়িকাদের ভাতা ৫৯৫৪টাকা৷

এমনটা কেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের কাছে দুয়োরাণী হয়ে রয়েছে কেন শিশুশিক্ষা মিশনের স্কুলগুলি কিংবা তার সহায়ক সহায়িকারা? সরকারি ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৬ হাজার ৯৮টি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে৷ যেখানে পড়ান প্রায় একলক্ষের কাছাকাছি সহায়ক সহায়িকারা৷ অর্থাৎ রাজ্যের এক বড় অংশের মানুষের রুজি রুটি জড়িয়ে রয়েছে এই শিশুশিক্ষা মিশনের স্কুলগুলির সঙ্গে৷ কিন্তু তারপরও কেন রাজ্যসরকারের অবহেলার পাত্র শিশুশিক্ষা মিশনের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলি? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশুশিক্ষা সহায়িকা তথা ইউনিয়নের নেত্রীর বক্তব্য, দিদি মনে করেন বাম আমলে তৈরি এই শিশুশিক্ষা মিশনের কর্মীরা সিপিএমের ভোটার, তাই আমরা সৎ ছেলে হয়েই রয়েছি৷

এই মুহূর্তে শিশুশিক্ষার সহায়ক সহায়িকাদের অধিরকার নিয়ে লড়াই করা মঞ্চটি কিন্তু তৃণমূলের দখলেই৷ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যে সহায়িকা বেতন পরিকাঠামো নিয়ে আক্ষেপ করছিলেন তিনিও তৃণমূল করেন বলে জানান৷ তার বক্তব্য, আমরা সবাই তৃণমূল করি, কিন্তু বাম আমলে তৈরি হওয়াতেই আমাদের যত জ্বালা৷ শিক্ষামন্ত্রী, পঞ্চায়েত মন্ত্রী থেকে প্রয়োজনীয় সমস্ত দফতরের কড়া নেড়ে আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখে আমরা ক্লান্ত৷ প্রতিশ্রুতি মিললেও একটাকাও বেতন বাড়েনি আমাদের৷

সূত্রের খবর সিপিএমের সময় প্রতি তিনবছরে একটি নির্দিষ্ট হারে(৫ শতাংশ হারে) ভাতা বাড়াত শিশুশিক্ষার সহায়ক সহায়িকাদের৷ ১৯৯৯ সালের ৮০০ টাকা ভাতা ধাপে ধাপে বেড়ে ২০১০-এ ৫৮০০ টাকা পৌঁছেছিল বাম আমলেই৷ তারপর মমতা সরকারের ৯বছরে ভাতা তেমন বাড়েনি৷ এখন ৫৯৫৪ টাকা ভাতা পান শিশুশিক্ষার সহায়ক সহায়িকারা৷

পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামীন এলাকায় যেখানে প্রাইমারী স্কুল নেই সেখানে শিশুশিক্ষায় একমাত্র সম্বল গ্রামের কচিকাচাদের জন্য৷ তবে প্রাইমারি শিক্ষকদের সঙ্গে প্ররিশ্রম একই হলেও বেতনের পার্থক্য অনেকটাই৷ শেষ প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা (টেট) পাশ করে যে সব শিক্ষক শিক্ষিকারা প্রাথমিক স্কুলে যোগ দিয়েছেন তাদের শুরয়াতি বেতন প্রায় ১৮হাজার টাকা৷ ২০ বছর যারা চাকরি করছেন তাদের বেতন ৩০হাজার ছাড়িয়েছে৷ কিন্তু প্রায় একই প্ররিশ্রম এবং যোগ্যতা নিয়েও অনেকটাই কম ভাতা পান শিশুশিক্ষা মিশনের অন্তর্গত সহায়ক সহায়িকারা৷ এমনটাই মত ওয়াকিবহাল মহলের৷

পুরো বিষয়টি নিয়ে বিধানসভায় বাম পরিষদীয় দল নেতা সুজন চক্রবর্তীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘‘এটাতো পরিস্কার যে তৃণমূল দলতন্ত্রের সরকার৷ শুধু শিশুশিক্ষা কেন যা হয়েছে সব বাম আমলেই হয়েছে৷ সাধারণ মানুষকে ভিক্ষা বৃত্তিতে অভ্যস্ত করাতে চাইছে এই সরকার৷ উনি যা ছুঁড়ে দেবেন তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে৷ শিশুশিক্ষায় যারা পড়ান তাদের যথাযথ বেতন পাওয়ার অধিকার রয়েছে৷’’