লখনউ : একটা মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে। ফের উস্কে দিয়েছে সাত বছর আগে ঘটে যাওয়া নির্ভয়া গণধর্ষণ কান্ডের স্মৃতি।

কারণ মঙ্গলবার থেকেই শিরোনামে রয়েছে উত্তরপ্রদেশের হাথরস। গণধর্ষণের পর নির্যাতিতার কঠিন লড়াই। জীবন যুদ্ধে হার। অবশেষে অভিযোগ ওঠে গায়ের জোরে আচমকা পুলিশ এসে নিয়ে যায় সেই মেয়ের মৃতদেহ মঙ্গলবার মাঝরাতেই সৎকার করে দেওয়া হয় ক্ষতবিক্ষত দেহটিকে।

ফের যোগী রাজ্যের দলিত তরুণীর উপর নৃশংস অত্যাচারের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা দেশ। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। নির্যাতিত মৃতা তরুণীর হয়ে ন্যায় বিচারের দাবি জানিয়েছেন বলিউড থেকে শুরু করে দেশের সব রাজনৈতিক মহল। নির্যাতিতার পরিবার যাতে দ্রুত বিচার পাই এবং অপরাধীরা যাতে কঠোরতম শাস্তি পাই তার দাবি জানিয়েছেন নির্ভয়ার মা আশা দেবীও৷

১৪ সেপ্টেম্বর ঠিক কী ঘটেছিল ওই তরুণী সঙ্গে?

নির্যাতিতা তরুণীর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে মা এবং ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে ঘাস কাটছিলেন ওই তরুণী। কিছুক্ষন পর হাতে ঘাসের বান্ডিল নিয়ে ভাই বাড়ি ফিরে এলেও তখনও মাঠে কাজ করছিলেন মা-মেয়ে।

জানা গিয়েছে, ঘাস কাটতে কাটতে মায়ের থেকে কিছুটা দূরে চলে যায় ওই তরুণী। কিছু সময় পর মাঠে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে তাঁর খোঁজ শুরু করেন ওই তরুণীর মা এবং পরিবারের লোকেরা। এরপর কিছুটা দূরে দোপাট্টা জড়ানো অবস্থায় বাজরা খেতের মধ্যে মেয়ের ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখতে পান পরিবারের লোকেরা। ওই তরুণীর পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছে যে, মোট চার থেকে পাঁচ জন উচ্চবর্ণের যুবক তাঁদের মেয়েকে টেনে হিঁচড়ে বাজরা খেতের মধ্যে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করে। নির্যাতনের পরিমাণ এতটাই বেশী ছিল যে, ওই তরুণীর ঘাড়ের হাড় এবং শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়েছিলো। পুরো পঙ্গু অবস্থায় খেতের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো সে।

ঘটনায় উওরপ্রদেশ পুলিশের ভূমিকা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল?

হাথরাসের গণধর্ষণ কান্ডে প্রথম থেকেই পুলিশের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলেছেন নির্যাতিতার পরিবার। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাঁদের মেয়ের উপর যেভাবে নৃশংস অত্যাচার করা হয়েছে তাতে তাঁর শরীরের অনেকগুলি হাড় ভেঙে গিয়েছিল। শ্বাসকষ্টের সমস্যা হওয়ায় হাসপাতালে তাঁর অক্সিজেন সাপোর্টেরও প্রয়োজন ছিলো। কিন্ত তরুণীর ক্রমশ স্বাস্থ্যের অবনতি হলেও ঘটনার চার-পাঁচ দিন পরে পুলিশ চাপে পড়ে তদন্ত শুরু করে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এই ধরনের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে৷ পুলিশের পক্ষ থেকে সাফাই দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা বিষয়টি নিয়ে প্রথম থেকেই যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন। এমনকি এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে পুলিশ সন্দীপ রামু, লবকুশ ও রবি নামের তিন জনকে গ্রেফতার করেছে৷

প্রথমে ধর্ষণের মামলা নিতে অস্বীকার করেছিল পুলিশ

ঘটনায় হাথরাসের এসপি বীরকান্ত ভীর বলেছেন, “হাথরাস বা আলীগড়ের কোনও চিকিৎসকই তরুণীর যৌন নির্যাতনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেননি। তবে বিষয়টি চিকিৎসকরা ফরেনসিক পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করবেন।”

ভীর আরও বলেছিলেন যে, “তরুণীর জিভ কাটার খবরটি ভুয়ো ছিল। এছাড়াও এমন খবরও পাওয়া গিয়েছিল যে তাঁর মেরুদণ্ডটি ভেঙে গিয়েছে। যদিও এটি ভুল, তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘাড়ের অস্থিতে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। আর যা নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্বস্তি। “

হাসপাতালে ঠিক কী হয়েছিল?

নির্যাতিতার পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের মেয়েকে প্রথমে আলীগড়ের জেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হলে ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁকে দিল্লির এইমসে ভরতি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু পুলিশ এইমসের বদলে তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে এনে ভরতি করেন। অভিযুক্তেরা নির্যাতিতার জিভ, ঘাড়ের হাড় এবং মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে তাঁকে সারাজীবন চুপ করিয়ে রাখতে চেয়েছিলো কিন্তু শেষরক্ষা আর হল না। টানা দু সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মঙ্গলবার হার মানেন ওই তরুণী। আর গোটা ঘটনায় প্রথম থেকেই যোগী পুলিশের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয়তা এবং সহায়তা না করার অভিযোগ তুলে আসছেন তরুণীর পরিবার৷

দলিত তরুণীর উপর ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে সরব বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল

হাথরাসের দলিত তরুণীকে গণধর্ষণ এবং নৃশংস অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভীম সেনাবাহিনীর দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ রাওয়ান। এদিন তিনি বলেন, ” নির্যাতিতা তরুণী দলিত ছিল এবং হামলাকারীরা তথাকথিত উচ্চ বর্ণের ছিল বলে জানা গিয়েছে। “

ঘটনায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এদিন ভীম আর্মি পার্টির সমর্থকেরা ঘন্টা খানেক উওরপ্রদেশের জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে অবশ্য পুলিশ এসে হটিয়ে দেয় অবরোধকারীদের।

নৃশংস এই ঘটনায় কংগ্রেস, বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) এবং সমাজবাদী পার্টি (এসপি) সহ বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলি উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনায় সরব হয়েছেন।

এই ঘটনায় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী হাথরাসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে উদ্দেশ্য করে একটি টুইটও করেছেন৷ এদিন তিনি টুইটারে লিখেছেন,” রাজ্যের মহিলাদের সুরক্ষার জন্য মুখ্যমন্ত্রী দায়ী … খুনীদের সবচেয়ে কঠোরতম শাস্তি পাওয়া উচিত।”

মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের পূর্বসূরি এবং এসপি সভাপতি অখিলেশ যাদব বলেছেন, উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার জনগণের জন্য কোনও আশা ছাড়াই “সংবেদনশীল” হয়ে উঠেছে। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী এই মামলাটি ফার্স্ট ট্র্যাক আদালতের মাধ্যমে দ্রুত শুনানির দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি মৃতার পরিবারকে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।