ছোটা রাজনের ধরা পড়ার পর সব মিলিয়ে একটা নতুন মিডিয়া হাইপ দেখা দিয়েছে৷ বিশেষ করে এই মাফিয়া ডনের সঙ্গে দাউদ ইব্রাহিমের রেষারেষি, সেইসঙ্গে উভয়কে বোড়ে করে আইএসআই এবং র-এর লড়াই, তার উপর মাফিয়াদের সম্পত্তির হিসাব ইত্যাদি, সব মিলিয়ে একেবারে টান টান রহস্য-রোমাঞ্চ৷যদিও এইসব কাহিনির পিছনকার অনেক কাহিনিই যাঁদের আস্তিনের তলায় তুরুপের তাসের মতো লুকানো থাকে, বলা বাহুল্য মন্ত্রগুপ্তির শপথ নেওয়ায় তাঁরা মুখ খুলবেন না৷বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা যদি বেশ জোরে জোরে হুইসল বাজাতে আরম্ভ করেন, তাহলে অনেক মান্যগণ্য দেশবরেণ্যর গজদন্তমিনার একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

খবরে প্রকাশ, ছোটা রাজনের মতো তার বউও কম কীর্তি গড়েনি৷তার বিরুদ্ধেও তোলাবাজি এবং রুপিয়া ধোলাইয়ের (কালো টাকা সাদা করার কারবার) মামলা রয়েছে৷ সাধারণত মাফিয়াকুলেও দাম্পত্যে হামেশাই রাজযোটক মেলে৷সেই শরদিন্দুর সৃষ্ট ব্যোমকেশের ভাষায় ‘বাঘ যেমন বাঘিনীকে খুঁজে পায়’, অনেকটা সে রকমই৷

কিন্তু এখানে ভাবনার বিষয় অন্য৷ এই অপরাধ জগত এখন কেবল কিছু খুন, তোলাবাজি কিংবা অস্ত্র পাচারের অপরাধমূলক মামলাতেই ঘুরপাক খায় না৷তাদের জাল সমাজের অনেক গভীরে বিস্তৃত হয়েছে৷ সব কিছু কি এদেশের নাগরিকদের জানার অধিকারের আওতায় পড়বে? ক্যাসিনোর কারবার থেকে শুরু করে হাওয়ালা racket, অনলাইন লটারি থেকে মানি লন্ডারিং, পাইরেটেড সামগ্রীর কারবার থেকে শুরু করে হোয়াট নট! সবেতেই রয়েছে মাফিয়াদের ‘করুণাময়’ হস্তের প্রলেপ৷বলা বাহুল্য, দেশে দেশে মাফিয়াদের ‘সাদা টাকা’র ফলাও কারবারে চার্জার হিসাবে সব থেকে বেশি কাজ করছে ড্রাগ মানি৷সৌজন্যে ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে চলা রুশ-মার্কিন ছায়াযুদ্ধ৷আজকের দিনের যাবতীয় মাফিয়া অভিশাপের সূত্রপাত তখন থেকেই৷

কিন্তু তার চাইতেও যেটা চিন্তার তা হল, এই মাফিয়াদের সব থেকে লোভনীয় ওপেন কারবারে পরিণত হয়েছে ডেভেলপার অ্যান্ড রিয়েলটি বিজনেস, হোটেল চেনের ব্যাবসা, দেশে দেশে স্পা-রিসর্টের বিস্তার, আর ক্যাসিনোর প্রসপেক্ট তো সেই কবে আমেরিকার মাটিতে দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সখের রাঁধুনি ‘বাগসি’ সিগেল৷ সে ছিল বলেই না খাঁ খাঁ মরুভূমির বুকে গড়ে উঠেছিল জুয়ার মহানগর লাস ভেগাস! আমেরিকার মাটিতে মাফিয়া দৌরাত্ম্য এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে৷কার্যত সেদেশে তারা যাতে আর দাঁত ফোটাতে না পারে তার জন্য তাদের নখ-দাঁত ভাঙার ব্যবস্থা বহু দিন আগেই আমেরিকার প্রশাসন করে ফেলেছে৷কিন্তু ভারতের মতো দেশের তো আর এই উপদ্রব থেকে নিস্তার পাওয়ার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই৷বিশেষ করে পলিটিশিয়ানরাই যেখানে মাফিয়াদের মেন্টর কিংবা প্রটেকটর৷choto-rajan

আড়ালে থেকে আবাসন নির্মাণের কারবারে টাকা ঢালার মতোই এদেশে ছোটা রাজন কিংবা দাউদ ইব্রাহিমদের আর একটি লোভনীয় কারবার হল সিনেমা প্রোডাকশন৷ হাওয়ালার মাধ্যমে কোথাকার টাকা কোথায় ঢুকছে, হয়তো এদেশের গোয়েন্দাদের তা অজানা নয়৷ কিন্তু ওই যে, মন্ত্রগুপ্তিই হোক কিংবা অন্য কিছুই থাক, অবসরের পরেও তাঁরা যে হুইসল বাজাবেন না৷হয়তো জীবন সংশয়ের প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে৷ না হলে কোথাকার জল কোথা থেকে কোন খাতে গড়ায়, সে কথা তাঁদের চাইতে ভালো আর কারও পক্ষে জানা অসম্ভব৷

শেষ করার আগে শুধু এটুকুই বলার, এক, আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন নামকরা তারালাঞ্ছিত হোটেলে রুম বুক করে কী কী কারবার চলছে, সেদিকে একটু বেশি মনোযোগ দিলে গোয়েন্দারা হয়তো আরও অনেক কিছুর হদিশ পাবেন৷দুই, মুম্বইয়ের সাংবাদিক জ্যোর্তিময় দে-কে হত্যা করার অপরাধে ছোটা রাজন আর তার গ্যাং যেন শাস্তি পায়৷

দাউদকে ধরতে পারলে অবশ্যই তাকে ফাঁসিতে লটকাতে হবে, তা বলে ছোটা রাজনকেও ছেড়ে দিলে চলবে না৷