সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : কখনও সিনেমার গান, কখনও পোস্টার। কখনও বা দুই বিখ্যাত চরিত্রকে সমাজকে সুস্থ রাখা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে ব্যাবহৃত হয়েছে উপেন্দ্রকিশোরের রায়ের দুই অসাধারন সৃষ্ট চরিত্র গুপি ও বাঘা। মূলত মানুষের কাছে এই দুই চরিত্রের বেশি পরিচিতি উপেন্দ্রকিশোরের নাতি তথা বিশ্ববরেণ্য চলচিত্র পরিচালক সত্যজিত রায়ের সিনেমার মাধ্যমে। করোনার লড়াইয়ে আবারও সামনে উঠে এল দুই চরিত্র। গুপি বাঘা গান গেয়ে, ঢোল বাজিয়ে বার্তা দিচ্ছেন করোনা থেকে বাঁচার।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে ও জনসাধারণকে সচেতন করতে কোচবিহার জেলা পুলিশের অন্তর্গত তুফানগঞ্জ থানার পক্ষ থেকে টোটো রিকশাতে করোনার সচেতনতা মূলক স্টিকার লাগিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। হীরক রাজা ছবির শেষ গানে গুপি গাইছে, ‘কারেও যদি ভুতে ধরে, মোদের যেন খবর পড়ে…মোরা আসব দু’জনায়।’। তেমন ভাবেই করোনাকে যদি বর্তমান সমাজের ভূত বলে ধরে নেওয়া হয়। তাঁকে তারাতেই যেন হাজির হয়েছে গুপি বাঘা। কোচবিহার পুলিশের ভাবনা যেন সেই কথাই বলছে। এই প্রসঙ্গে কোচবিহার পুলিশের পক্ষে জানানো হয়েছে , ‘আমরা বিভিন্ন ভাবে করোনা থেকে ,মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করছি। গুপি গাইন, বাঘা বাইন মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত দুই চরিত্র। তাই তাদের কাটআউট ব্যাবহার করা হয়েছে করোনা নিয়ে সচেতনতা গড়তে’। পুলিশের পক্ষে আরও জানানো হয়েছে, ‘করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশে লকডাউন চলছে। এই পরিস্থিতিতে কোচবিহার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে ঘরে থেকে সুস্থ থাকার জন্য দিনহাটা শহর , কোচবিহার সদর ও নিশিগঞ্জ এলাকার মূল রাস্তাগুলিতে ছবি এঁকেও অনুরোধ জানিয়েছে ওই সমস্ত থানার পুলিশ আধিকারিকরা।’

তাঁরা মনে করছেন এই প্রচেষ্টা মানুষকে সচেতন করবে। আশা, মানুষও পুলিশ প্রশাসনকে বাইরে না বেরিয়ে , সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। প্রসঙ্গত কলকাতা পুলিশ গুপি বাঘা সিরিজের বিখ্যাত গান, ‘ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল’ গানটির সুর একই রেখে ভাষা পরিবর্তন করে করোনা সচেতনতায় ব্যাবহার করেছে। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় সোশ্যাল মাধ্যমে।

১৯১৫ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাতায় গুপি গাইন বাঘা বাইন এর প্রথম আত্মপ্রকাশ। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সৃষ্টি। ১৯৬১ তে সত্যজিৎ রায় তাঁদের ফিরিয়ে আনেন। সন্দেশের পাতাতেই। পরে আসে সিনেমার পরিকল্পনা। সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ১৩ বছরের পুত্র সন্দীপ রায়ের অনুরোধও এই ছবি তৈরি একটা কারণ।

গল্পের দুই নায়ক। গুপি আর বাঘা। গুপি গান গাইতে খুব ভালোবাসে। বাঘা ঢোল বাজাতে। কিন্তু তাদের গান বেসুরো । ঢোল বেতালা । রাজামশাই তাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়। ঘুরতে ঘুরতে বনের মধ্যে তাদের দেখা হয় ভুতের রাজার সঙ্গে। ভূতের রাজা তাদের তিনটি বর দেন। প্রথম বরে তারা যেমন খুশি খেতে পাবে। দ্বিতীয় বরে দু’জোড়া জুতো আর হাতের তালিতে তারা যেমন খুশি ঘুরতে পারবে, আর তৃতীয় বরে তারা লোককে গান শুনিয়ে থামিয়ে দেবার ক্ষ্মতা পায়। এরপর দু’জনে শুণ্ডি রাজ্যে গিয়ে রাজাকে গান শুনিয়ে সেখানের সভাগায়কের পদ পায়। শুন্ডির প্রতিবেশি হাল্লা সেই রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তারা গুপ্তচর হয়ে সেখানে যায়। যুদ্ধবাজ মন্ত্রীকে পরাস্ত করে শান্তি স্থাপন করে। শুণ্ডির রাজকন্যা মণিমালা আর হাল্লার রাজ্যকন্যা মুক্তামালার সঙ্গে তাদের বিয়ে হয়। এইভাবে শুরু হয়েছিল চলচিত্রে গুপি গাইন বাঘা বাইন পর্ব। একে একে গুপি বাঘা ফিরে এল, হীরক রাজার দেশে মানুষের মনে দাগ কেটেছে।