স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: তিনি ফিরলেন৷ কিন্তু কফিন বন্দী হয়ে৷ তারই সাথে রেখে গেলেন একাধিক প্রশ্ন৷ আর তাঁর শেষকৃত্যের দিনই সেই প্রশ্ন সংবাদমাধ্যমের সামনে রেখে বিতর্ক উসকে দিলেন তাঁর স্ত্রী৷ প্রশ্ন তুললেন মাওবাদী সমস্যা সমাধানে কেন্দ্র সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে৷ কারণ তিনি মনে করেন ‘সরকার চাইলেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে৷ এটা ইচ্ছাকৃত জিইয়ে রাখা সমস্যা’৷

এদিকে, শুক্রবার হাজার হাজার শোকস্তব্ধ মানুষের মাঝে কফিন বন্দী হয়ে নিজের বাড়ি ফিরলেন সিআইএসএফের হেড কনষ্টেবল দীনাঙ্কর মুখার্জ্জী৷ ২০ নভেম্বর ফেরার কথা ছিল তাঁর৷ কিন্তু তার আগেই বাড়ি ফিরলেন ছত্তিশগড়ে মাও হামলায় নিহত জওয়ান৷ শুক্রবার ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ২টো বেজে ৬মিনিট। কলকাতার গার্ডেনরিচ হয়ে কফিন বন্দি মৃতদেহ বর্ধমান শহরের ৩নং ইছলাবাদের ঘোষপাড়ার মুখার্জ্জী বাড়িতে যখন এল, তখন গোটা এলাকা যেন জনসমুদ্রের চেহারা নিয়েছে।

এদিন সকাল ১১টা থেকেই ইয়ুথ ক্লাবের মাঠে শান্ত মানুষের নীরব ভিড়। কারও মুখে কোনও কথা ছিল না৷ সব ভাষাকে হারিয়ে দিয়েছিল একটা মৃত্যু৷ দুপুর ২টো নাগাদ মৃত জওয়ানের কফিনবন্দী দেহকে এয়ারকন্ডিশন গাড়িতে নিয়ে আসা হল। সিআইএসএফের জওয়ানরা কফিনের ঢাকনা খুললেন। কান্নায় ভেঙে পড়ল গোটা পরিবার৷ বাড়িতেও তার মৃতদেহে দেওয়া হল হরিনাম লেখা নামাবলী। দেওয়া হল ফুলের মালা।

দেহ নিয়ে যাওয়া হল ইয়ুথ ক্লাবের মাঠে। চারিদিকে তখন শুধু মানুষ৷ অঘোষিত রাস্তা বন্ধ। সকলেই একবার চোখের দেখা দেখতে চান তাঁদের এই বীর সেনানিকে। একে একে শেষ শ্রদ্ধা অর্পণ করলেন সিআইএসএফের অ্যাসিস্ট্যাণ্ট কমাণ্ডাণ্ট এ কে ঝা, সিনিয়র কমাণ্ডাণ্ট শারদ রায়, বর্ধমানের অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ) অরিন্দম নিয়োগী, জেলা পরিষদের সভাধিপতি শম্পা ধাড়া, সহকারী সভাধিপতি দেবু টুডু, জেলা পরিষদের সদস্য গার্গী নাহা, প্রাক্তন কাউন্সিলার খোকন দাস, পরেশ সরকার প্রমুখরা।

শেষবারের মত স্বামীকে বিদায় জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন স্ত্রী মিতা দেবী, ছেলে দেবজিত। এখানে সিআইএসএফের পক্ষ থেকে শহিদ জওয়ানকে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বর্ধমানের নির্মল ঝিল শ্মশানে। সেখানে বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে জুনিয়র ওয়ারেণ্ট অফিসার এম পি বিজুরাজ এবং সার্জেণ্ট এস কে দত্তের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল জানালেন শেষ শ্রদ্ধা।

পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকেও তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সিআইএসএফের পক্ষ থেকে গ্যান স্যালুটের মাধ্যমে তাঁকে বিদায় জানান। এদিন সিআইএসএফের পক্ষ থেকে ভারতের জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয় মৃত জওয়ানের ছেলের হাতে।

যদিও এদিন দেবজিত জানিয়েছে, সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চায় না। বর্ধমানের একটি ইংরাজী মাধ‌্যম স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র দেবজিত জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তাঁর ইচ্ছা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। চোখের সামনে মাওবাদী হামলায় বাবার এই মৃত্যুই কি তার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ – সে প্রশ্নে নীরব থেকেছে দেবজিত।

মুখার্জ্জী পরিবারের ইতিহাসে দীনঙ্করবাবুই প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। যদিও পরিবারে বিশেষত দীনঙ্করবাবুর বাবা দেবাদী মুখার্জ্জী ছিলেন বর্ধমান জেলা পুলিশের কর্মী। দীনঙ্করবাবুর দাদা দীপংকর মুখার্জী বর্ধমান জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এসআই পদে বর্তমানে কর্মরত।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সকালে ছত্রিশগড়ের দান্তেওয়াড়ায় বিধানসভা নির্বাচনের ডিউটি করতে গিয়ে মাওবাদীদের পাতা ল্যাণ্ডমাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারান দীনাঙ্কর বাবু৷ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ সেনা জওয়ানদের মেসের বাজার সেরে বাসে বাড়ি ফেরার পথে মাওবাদীদের আইইডি বিস্ফোরণে প্রাণ হারান তিনি। এই ঘটনায় ওই বাসের চালক, কনডাকটর এবং খালাসির মৃত্যু হয়েছে। আহত হন অন্য দুই জওয়ানও।