সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়:  পুরভোটের ফল দেখিয়ে দিল, রাজনীতিতে সদ্য আসা নবীন দেবরাজ চক্রবর্তী যা পারেন, বর্ষীয়ান নেতা গৌতম দেব তা পারেন না৷ তার কারণ একজন রাজশক্তির সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে নেমে প্রকৃত অর্থে লড়ছেন৷ আর অন্যজন টিভিতে মুখ দেখিয়ে শুধু ফাঁকা আওয়াজ দিয়েছেন৷ যেমন কাজ তেমন ফল, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই ৷ দেবরাজের সঙ্গে গৌতম দেবের ফারাক এখানেই৷ মাটি কামড়ে পড়ে থাকার ফল পেয়েছেন দেবরাজ, যদিও তাঁকে শাসক তৃণমূলের সৌজন্যে কম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি৷ এমনকী জেলে পুরেও বিধাননগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কংগ্রেস প্রার্থী দেবরাজের জয় আটকাতে পারল না রাজ্যের শাসক দল৷ অন্যদিকে পুরভোটে গো হারান হেরে যথারীতি গৌতম দেব সেই ভোট লুঠ হওয়ার অভিযোগই আনলেন৷ একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই বাম নেতা কেন বহিরাগতদের আটকাতে পারলেন না, তার কোনও সদুত্তর নেই ৷ এমন কথা বলায় যে একদিক থেকে তাঁর তথা সিপিএমের অক্ষমতা প্রকাশ পায় তা এই বয়েসে কমরেড গৌতম অনুভব করতে পারলেন না৷

সদ্য রাজনীতিতে যোগ দেওয়া এই যুবক কিন্তু বুঝিয়ে দিয়েছেন তৃণমূলকেও ঘায়েল করা সম্ভব৷ ৩ অক্টোবর ভোটের দিন নবীন এই কংগ্রেস প্রার্থী নিজের দলবল নিয়ে প্রাণপণে সকাল থেকে বুথ আগলে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ ঘেঁষতে দেননি বহিরাগতদের। যদিও গোলমাল পাকানোর অভিযোগে ভোটের দিন বিকেলেই রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর আপ্ত সহায়ককে আটক করে পুলিশ। সেদিন সন্ধ্যার পরই তাকে ছেড়ে দিলেও পরদিন গ্রেফতার করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে খবর, দেবরাজের গ্রেফতারির পিছনে তাঁর প্রভাবশালী ‘জেঠু’ তথা কৃষিমন্ত্রীর হাত রয়েছে। দেবরাজ অবশ্য CPIM-leader-Gautam-Debপূর্ণেন্দুবাবুর নিজের ভাইপো নন, তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জেরে তাঁকে ‘জেঠু’ সম্বোধনই করে থাকেন তাঁর প্রাক্তন আপ্ত সহায়ক । উভয়ের মধ্যে মনোমানিল্যের জেরে আপ্ত সহায়কের চাকরি ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন দেবরাজ। তারপর কংগ্রেসের টিকিটে ভোট ময়দানে নেমে পড়েন। এই তরুণের এলাকায় জনসংযোগ ভালই ছিল৷ যদিও দেবরাজকে হারানো মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সাংসদ দোলা সেনের প্রেস্টিজ ফাইট হয়ে ওঠে। ফলে নেপথ্য থেকে তাঁদের অঙ্গুলিহেলনেই ভোটের দিন দক্ষিণ দমদম পুরসভার এক কাউন্সিলর বহিরাগতদের বিশাল বাহিনী সেখানকার বিভিন্ন বুথে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। কিন্তু সেই হানা ব্যর্থ করে দেয় দেবরাজের অনুগামীরা। ভোটের শেষলগ্নে সেখানে বহিরাগতরা মরিয়া হয়ে গুলিও চালায়। পাল্টা প্রতিরোধে বহিরাগতদের বাইকে আগুন লাগায় এলাকার লোকজন। তারপর গোটা বিষয়টির দায় দেবরাজের উপর চাপিয়ে পুলিশ গ্রেফতার করে৷ যা কি না পূর্ন্দেন্দু- দোলার কারসাজি বলেই অভিযোগ কংগ্রেসের। এত কিছুর পরেও ভোটের ফল জানিয়ে দিল দেবরাজের জয়৷ কংগ্রেস যে অনেক দিন আগেই রাজ্যে সাইনবোর্ডে পরিণত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ অর্থাৎ ওই দলের সংগঠন থেকে রাজনীতিতে নবীন কেউ তেমন বিরাট কিছু সাহায্য পাবেন, এমন আশা করাটাই বৃথা৷ অরুণাভ ঘোষদের মতো নেতারা টিভিতে মুখ দেখিয়ে অনেক লম্বা চাওড়া কথা বললেও, বাস্তবে শাসক তৃণমূলের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার ক্ষমতা এদের যে নেই তা কারও অজানা নয় ৷ হতে পারে ছোট পরিসরে তবুও বলতে হয় এবারের পুরভোটে দেবরাজ একটা ব্যতিক্রমী নাম ৷


ভোটে জিতে অনেকে পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়, আর গৌতমবাবু আপনারা এই বিষয়ে এক নজির গড়লেন, ভোটে জেতা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলেন না, তার আগেই সব কিছু ভুলে মেরে দিলেন ৷ ভাবুন ভোটের দিনই যে দলের এমন অবস্থা তাকে ভরসা করে ভোট দেওয়া উচিত কিনা৷


টিভিতে মুখ দেখিয়ে হাত নেড়ে ফাঁকা আওয়াজ দিতে ইদানিং সিপিএম নেতা গৌতম দেবকেও দেখা যায়৷ কিন্তু ১০-১২ বছর আগে তিনি একেবারেই টিভিতে মুখ দেখাতে উৎসাহী ছিলেন না৷ উৎসাহী ছিলেন না বললেও কম বলা হয় বরং বলা ভাল টিভির ক্যামেরাকে তিনি এড়িয়ে চলতেই ভালবাসতেন৷ এমনকী সে সময় তাঁর দফতরের প্রেস কন্ফারেন্সের সময় কোনওরকমে বিবৃতিটি জানিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারকে বসিয়ে দিতেন সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত ব্যাখার জন্য ৷ তখন তাঁর কাছ থেকে বাইট নিতে গেলে তিনি অনেক সময় টিভি সাংবাদিকদের হাতে ধরা বুম দেখিয়ে মন্তব্য করতেন, ‘‘ ওই সব চোঙা ফোঙার সামনে আমি কিছু বলি না৷’’ কিন্তু দিন বদলেছে তাঁর আর সে দাপট নেই, তাঁর তথা দলের পিছনে এখন আর নেই সেই জন সমর্থন৷ ফলে আগের মতো তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার বদলে এখন তিনি বোকা বাক্সকেই আঁকড়ে ধরতে চান৷ প্রায়ই তাঁকে বিভিন্ন চ্যানেলে কথা বলতে দেখা যায়৷ হয়তো আগের মতো জনসংযোগ না থাকায় মানুষের কাছে তাঁরা বার্তা পৌঁছে দিতে টিভি চ্যানেলগুলোকেই তিনি ব্যবহার করতে চান৷ কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে – তখন তিনি জনগনকে যা প্রতিশ্রুতি দেন তা সৎভাবে পালন করার চেষ্টা আদৌ কি তিনি করেন ? তিনি তো বিধাননগর পুরসভার ভোটের আগে জনগনকে কথা দিয়েছিলেন , ভোটের দিনে তাঁর চার হাজার ছেলে হাজির থাকবে শাসক তৃণমূলের বহিরাগত বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য৷ আওয়াজ তুলেছিলেন, ওইসব বহিরাগতদের বাইকগুলোকে কেষ্টপুর ও বাগজোলা খালে ফেলে দেবেন৷ আসলে এতো ছিল একদম ফাঁকা আওয়াজ৷ নইলে ওই ভোটের দিন শাসক দলের মদতপুষ্ট বহিরাগতরা সল্টলেক রাজারহাটে দাপিয়ে বেড়াল অথচ গৌতমবাবুর দলের ছেলেদের দেখাই পাওয়া গেল না ৷ তাঁর দলের লোকেরা কোথায় ছিলেন যখন এই বহিরাগতদের ছবি তুলতে গিয়ে একের পর এক সাংবাদিকরা আক্রান্ত হচ্ছিলেন? ভোটের আগে বহিরাগতদের আটকাবেন বলেই প্রচার করে আসল দিনে লড়াইয়ের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া _debrajসময়   আপনার কি মনে হয়নি -এটাও একটা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ৷ জানি ভোটে জিতে অনেকে পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়, আর গৌতমবাবু আপনারা এই বিষয়ে এক নজির গড়লেন, ভোটে জেতা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলেন না, তার আগেই সব কিছু ভুলে মেরে দিলেন ৷ ভাবুন ভোটের দিনই যে দলের এমন অবস্থা তাকে ভরসা করে ভোট দেওয়া উচিত কিনা৷ ছিচকাঁদুনে ন্যাকাদের মতো ‘ভোট লুঠ হচ্ছে’ , ‘ওরা মারছে আমরা কী করব’ , ‘আমাদের সব বুড়ো’ এই সব কথা বলতে লজ্জা হচ্ছিল না৷ মনে পড়ে একটা সময় গণিখান চৌধুরি বলতেন- সিপিএমকে বঙ্গোপাসাগরে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন৷ যা শুনে আপনারা কেন ওঁর দলের লোকজনও হাসতেন ৷ এখন আপনার মুখে বাগজোলা খালে বহিরাগতদের বাইক ফেলে দেবেন কথাটা শুনে শাসক দলের শুধু নন আপনার দলেরই অনেকে হাসা হসি করে ৷
আসলে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকে এতটাই সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন গৌতমবাবুরা তাই কষ্ট করতে ভুলে গিয়েছেন৷ কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়৷ অথচ আপনারা আজ লড়তে চান না৷ জানি না ভুলে গিয়েছেন নাকি মনে আছে – ক্ষমতায় আসার আগে আপনাদের পূবর্সূরীদের কতটা আন্দোলন করতে হয়েছে, কেমন করে পুলিশের লাঠি খেতে হয়েছে ? তাই তো তখন হত  দরিদ্র কমিউনিস্টরা সম্মান পেতেন ৷ কিন্তু আপনারদের জীবনযাত্রা, আচরণ, বাম আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং মিথ্যা বুলির জন্য সেই সম্মানটাও হারিয়েছেন৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে একেবারে আপনাদের শেখান পথেই আপনাদের ঘায়েল করছেন ৷ একদিন আপনাদের দলের নেতা সুভাষ চক্রবর্তী বহিরাগতদের নিয়ে ভোট করাতেন ঠিক একই কায়দায়, এরাও জেতার জন্য সে পথই নিয়েছে ৷ আপনাদের অস্ত্রই এখন ব্যুমেরাং হয়ে ফিরছে ৷ মনে পড়ে, আপনাদের জমানায় বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে কতটা লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল৷ এটাও বুঝি এখন গৌতমবাবু আপনাদের মতো বয়েসের নেতাদের পুলিশের লাঠি জেল এসব সহ্য হবে না ৷ কিন্তু দলে পরবর্তী প্রজন্মরা কী করছে ? শুধুই পাউডার মেখে সন্ধেবেলায় টিভি চ্যানেলে বসলেই পরের বিধানসভা ভোটে জনগণ আপানাদের পাশে এসে দাঁড়াবে এমন আশা করলে সে গুড়ে বালি৷ পাড়ায় পাড়ায় নতুন প্রজন্মের অক্ষম কমরেডদের ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম দেবরাজের উদাহরণটাই তুলে ধরুন৷