স্টাফ রিপোর্টার: খেন্তি পিসির দিদি শাশুড়ি তিন বোন থাকে কালনায়। এই ছিল সুকুমার রায়ের কবিতা। তবে ভবতারিণী, কৃপাময়ী আর ব্রহ্মময়ী এঁরা কিন্তু কালনার বাসিন্দা নন। এনারা থাকেন বরাহনগর ও তার কাছাকাছি এলাকায়৷ তিন বোনের বাড়ি খুব কাছাকাছি৷ ভবতারিণী থাকেন নদীর ওপাড়ে। আর কৃপাময়ী ও ব্রহ্মময়ী থাকেন নদীর এপাড়ে৷ ব্রহ্মময়ী বাড়ি কৃপাময়ীর বাড়ি থেকে হাঁটা পথে দশ মিনিট৷ ভাবছেন তো আদ্যিকালের নামওয়ালা এই বোনেরা আসলে কারা?

হেঁয়ালি না করে বলি, ভবতারিণী, কৃপাময়ী আর ব্রহ্মময়ী হলেন আসলে মা কালীর তিন রূপ। ভবতারিণী হলেন দক্ষিণেশ্বরের কালী, কৃপাময়ী হলেন বরাহনগরের জয় নারায়ণ মিত্তির বাড়ির কালী এবং ব্রহ্মময়ী হলেন কাশীপুরের প্রামাণিক ঘাট রোডের কালী। লোক কথানুযায়ী একই কোষ্ঠী পাথর থেকে তৈরি হয়েছিল ভবতারিণী, কৃপাময়ী আর ব্রহ্মময়ীর বিগ্রহ। মূর্তির কারিগরও নাকি একই মানুষ।

সর্বপ্রথম তৈরি হয় জয়মিত্তিরের কৃপাময়ীর মূর্তি। এরপর তৈরি হয় ব্রহ্মময়ী ও মা ভবতারিণীর বিগ্রহ। এক্ষেত্রে বড় বোন-ছোট বোনের হিসাব হয় তৈরি বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার সময়কালের বিচারে নয়, বিগ্রহের উচ্চতার বিচারে। সেই অনুযায়ী ভবতারিণীর মূর্তি সবথেকে বড়। তাই সে বড় বোন। মেজ ও ছোট হলেন মা কৃপাময়ী ও মা ব্রহ্মময়ী। এই তিন দেবী মূর্তির নামকরণও করেন একই মানুষ। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব।

জয় মিত্তিরের কৃপাময়ী কালী: ইংরেজির ১৮৪৮ সালে বরাহনগরের জমিদার জয়নারায়ণ মিত্র তৈরি করেন এই কালীমন্দির। মন্দিরে ছিল ১২ টি শিব মন্দির ও একটি বড় কালীমন্দির। শোনা যায়, এই মন্দির দেখেই নাকি রানি রাসমনী দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়েছিল জয়মিত্তিরের এই মন্দির৷ ফলে কিছু বছর আগে এক প্রমোটরকে মন্দিরের জমির কিছু অংশ বিক্রি করে দেয় মিত্তির পরিবার। পরিবর্তে মন্দিরটি সারানোর চুক্তি অর্থ সাহায্য করে সেই প্রমোটর৷ মন্দিরের নতুন রূপ এক কথায় অসাধারণ।

ব্রহ্মময়ী কালী: ১৮৫৩ সালে মাঘী পূর্ণিমায় তৈরি হয়েছিল এই মন্দির৷ সেই রীতি অনুযায়ী, প্রতিবছর মাঘী পূর্ণিমায় বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয় মন্দিরে৷ মা ব্রহ্মময়ী তিন বোনের তুলনায় উচ্চতায় খাটো, তবে ঐতিহ্যে সমসাময়িক৷ কালীপূজোর দিন দেবীকে সাজানো হয় বিশেষ বসনে৷ মন্দিরে নিষিদ্ধ পশুবলি৷ দেওয়া হয় বিশেষ ভোগ, তবে অন্ন ভোগ নয়৷ বর্তমানে মন্দির রক্ষণা-বেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ট্রাস্টি বোর্ড৷

দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিনী কালী: ১৮৫৫ সালে নির্মিত হয় ১০০ ফুটের এই মন্দির৷ জানা যায়, কৈবর্তের গড়া মন্দির — তখনকার ব্রাহ্মণ সমাজ বয়কট করলেন। কোন ব্রাহ্মণ পূজারী হতে না চাওয়ায় অবশেষে হুগলীর কামারপুকুর থেকে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন পূজারী হয়ে। রামকুমারের পর তাঁর ভাই গদাধর দায়িত্ব নিয়েছিলেন পুজোর। কালে কালে এই গদাধরই হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব৷