স্টাফ রিপোর্টার, তমলুক: গোবরের নাম শুনলেই অনেক লোক নাক কোচকায়৷ কিন্তু এই গোবর দিয়েই তৈরি হয় ঘুঁটে৷ আর এই ঘুঁটেকেই শিল্প ভাবে গড়ে তুলেছেন পেশায় শিক্ষক রাধাকান্ত চক্রবর্তী৷ বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ডিজাইনের ঘুঁটে তৈরি করে তিনি চমকে দিলেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সুতাহাটা থানার জুনাটিয়া গ্রামকে৷

এলাকাবাসীরা জানান, রাধাকান্তবাবু দীর্ঘদিন ধরে ঘুঁটে নিয়ে বিভিন্ন চিন্তাভাবনা করে আসেছেন৷ বর্তমানে তিনি ঘুঁটের নানা প্রকার কারুকার্য করে শুরু করেছেন ‘‘ঘুঁটে উৎসব’’৷ তিনি জানিয়েছেন, ২৭ মে উৎসবের সূচনা হয়েছিল। চলবে আগামী ৫ জুন পর্যন্ত। এমন বাহারি ঘুঁটের সমারোহে মজলেন নবীন থেকে প্রবীণ, শিক্ষক থেকে বিজ্ঞানী, ছাত্র থেকে গৃহবধূ, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক থেকে সাধারণ মানুষ।

গ্রামাঞ্চলের চিরাচরিত বোম ঘুঁটে, চাপড়া ঘুঁটে, লাঠি ঘুঁটের পাশে ঘুঁটে নিয়ে এমন শিল্পভাবনার প্রকাশ ঘটানো যেতে পারে, তা দেখে রীতিমত চমকে উঠতে হয়। ঘুঁটেকে কেন্দ্র করে লোকশিল্পের প্রদর্শনী শুধু নয়, তার নেপথ্যে থাকা তথাকথিত ‘ঘুঁটেকুড়ুনি’দেরও আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে তুলে সম্বর্ধনাও জানানো হয়৷ রবিবার ঘুঁটে নিয়ে এরকম একটি উৎসবের আয়োজন করা হয় হলদিয়ার সুতাহাটায়।

উৎসব সম্পাদক রাধাকান্তবাবু এদিন বলেন, ‘‘১৯৫৭ সালে আমি যখন তমলুক কলেজে পড়তাম সেইসময় আমার এক অধ্যাপকের স্ত্রীকে ঘুঁটে দিতে দেখে আমি চমকে যাই। ঘুঁটে গ্রামবাংলার মহিলাদের স্বনির্ভতার একটা বড় হাতিয়ার। সেই দিনই আমার মাথায় ঘুঁটেকে গুরুত্ব দিতে, এর পিছনে থাকা মহিলাদের সম্মানিত করতে একটা উৎসবের আয়োজন করার কথা মাথায় আসে। তারপর থেকেই গ্রামাঞ্চলের এই শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সুতাহাটার বিভিন্ন গ্রামের মহিলাদের উৎসাহিত করতাম। গ্রামে গ্রামে এখন আমার পরিচয় ‘ঘুঁটে দাদু’।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘ঘুঁটেকে বাঁচিয়ে রাখার তিনটি কারণ৷ প্রথমত, মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা৷ দ্বিতীয়ত, ফসিল ফুয়েল অর্থাৎ তেল গ্যাস বাঁচাতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি হিসাবে ঘুঁটের সঠিক ব্যবহার করা৷ সঙ্গে কম দূষণকারি এই লোকশিল্পটি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।’’

এদিন প্রদর্শনীতে সুতাহাটার কৃষ্ণনগর, জুনাটিয়া, শঙ্করপুর সহ একাধিক গ্রামের ৪২ জন মহিলা তাঁদের ঘুঁটে শিল্প নিয়ে হাজির ছিলেন। উৎসবের আয়োজন করতে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। উৎসব দেখতে মহিষাদল, নন্দীগ্রাম, তমলুক, পাঁশকুড়া, মেদিনীপুর থেকেও মানুষজন এসেছিলেন৷ ঘুঁটে তৈরি করে এমন সম্মান পাওয়া যাবে স্বপ্নেও কোনদিন ভাবেননি জানালেন রাধাকান্তবাবু৷ তবে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ধরনের গ্যাসের কারণে ঘুঁটের চাহিদা কমলেও এমন একদিন আসবে ঘুঁটেকেই মানুষ তার ব্যবহারিক জীবনে ব্যবহার করবেন বলেও জানান তিনি।