সোয়েতা ভট্টাচার্য,কলকাতা : গড়িয়াহাটের ল্যান্ডমার্ক আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয় এবং ট্রেডার্স এসেম্বলি এখন শুধুই ধংসস্তপ। শহরবাসীর কাছে বিয়ের বাজার মানেই এই দুটি দোকানের নাম থাকত প্রথম সারিতে। এই দুটি দোকান থেকে যদি শাড়ি কেনা না হত তাহলে অনেকেই নিজের বিয়ের বাজারকে অসম্পুর্ণ মনে করতেন। দক্ষিন কলকাতার বাসিন্দা অর্পিতা পাল এই বছরেই বিয়ে করছেন। পাকা কথাও হয়ে গিয়েছে। এবার পালা ছিল বিয়ের বাজারের। বিয়ের পরে স্বামীর সঙ্গে তিনি বেঙ্গালুরু চলে যাবেন। সেই কারনে ভেবে রেখেছিলেন বেশ কিছু শাড়ি এখান থেকেই কিনে যাবেন৷

তিনি কলকাতা ২৪X৭ কে জানান,”ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটি নিয়ে আমার হবু স্বামী শহরে আসছেন।তাই দুই পরিবারই ঠিক করেছিল সেই সময় বিয়ের বাজারটা সেরে ফেলা হবে। আমি দুই বাড়িতে বলে রেখেছিলাম বেনারসী ট্রেডার্স এসেম্বলি থেকেই কিনব। রবিবার সকালে টিভি খুলে জানতে পারলাম এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। খুব মন খারাপ হয়ে গেল”।

অন্যদিকে বেহালার বাসিন্দা রিমা হালদার বলেন,”গত বছর আমার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম গড়িয়াহাট থেকে বিয়ের বাজার করব। সেই মতো এই দুটি দোকান থেকেই সমস্ত কেনাকাটা করেছি। এমনকি প্রণামীর শাড়িও কিনেছি এই দোকান থেকেই। সোমবার গড়িয়াহাট মোড় দিয়ে বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছিলাম৷ এই বহুতলের অবস্থা দেখে চোখা জল চলে আসল। মনে পড়ছিল এই তো সেদিন আনন্দ করে এলাম এই দোকানে। সমস্ত বাজার করেছিলাম। আমার মতো অনেকেই হয়ত ভেবে রেখেছিল এই দোকানগুলি থেকে বিয়ের বাজার করবেন। এটা ভেবেই খারাপ লাগছে”।

১৯৫০ সালের মাঝামাঝি এই দুটি দোকান শুরু হয়। প্রায় সাত দশক সফলতার সঙ্গে শাড়ির ব্যবসা করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ট্রেডার্স এসেম্বলি এবং আদি ঢাকেশ্বরি বস্ত্রালয়। তবে ভবিষ্যত পুড়ে ছাই হয়ে গেল শনিবারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে।

শহরের অধিকাংশ মেয়ে-বউরা তাদের বেনারসি পরেই জীবনের বিশেষ দিনটি কাটিয়েছেন। আবার সেই চেনা ছন্দে কবে ফিরতে পারবে এই দোকানটি সেই নিয়ে কোনও উত্তরই নেই কারুর কাছে। ১৯৪৪ সালে স্থাপিত হয় এই গুরুদাস ম্যানসন। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী জীবনকৃষ্ণ কুণ্ডু চৌধুরির মালিকানা ছিল এই বহুতলের। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এই বহুতলটিতে ইস্ট বেঙ্গল থেকে আসা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেন জীবনকৃষ্ণ বাবু। কিছু লোক ছেড়ে চলে গেলেও কিছু মানুষ এই বহুতলেই ভাড়াটে হিসেবে থেকে যান।

ট্রেডার্স এসেম্বলির চার তলার মাসিক ভাড়া ছিল ১৮০০ টাকা। অন্যদিকে আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের দুই তলা মিলিয়ে মাসিক ভাড়া ছিল মাত্র ৮০০ টাকা। বহুতলটিতে ২৫টি পরিবার বসবাস করে। কয়েকটি ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারলেও অধিকাংশ ফ্ল্যাটেই এখনও ভাড়াটেরা রয়েছেন।

জানা যাচ্ছে আগে মাত্র দশ টাকা ভাড়া দেওয়া হত।পরে সেটি পঞ্চাশ টাকা হয়ে দাঁড়ায়। মালিকদের ক্লেম কন্টেস্ট করতে ভাড়াটেরা আদালতের দ্বারস্থ হয়।সেখানেই ভাড়ার টাকা দেন তাঁরা৷ মালিকদের হাতে ভাড়ার কোনও টাকাই আসে না বলে জানা যাচ্ছে। এই বহুতলের মালিকপক্ষরা মনে করেন এই সঠিক ভাড়া না পাওয়ার ফলেই রক্ষণাবেক্ষণ করা যেত না৷ এই ঘটনার পর পুরোপুরি অনিশ্চয়তার দিকেই চলে গেল এই বহুতলটির ভবিষ্যত৷