সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: পাড়ায় পাড়ায় এখন বাড়ছে গণেশের দাপট আর কারখানায় ক্রমশ মলিন হচ্ছেন বিশ্বকর্মা৷ বাংলায় এখন বহু কারখানায় লাল বাতি জ্বললেও, পাড়ায় পাড়ায় সিদ্ধিলাভ চাইছে বাঙালি৷ এ যেন এক অন্য পরিবর্তনের ডাক ৷ বছর আটেক আগে রাজ্য থেকে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটেছে ৷ ফলে পুজো আচ্চাও বাড়ছে ৷ দুর্গা বা কালী পুজো করেই ক্ষান্ত নয়, জীবনে সিদ্ধিলাভ করতে এবার বাঙালি ক্রমশ গণপতির দিকে ঝুঁকছেন৷

সাধারণত শারদোৎসবের ঠিক আগেই বাঙালি মেতে উঠত বিশ্বকর্মা পুজোতে৷ তেমন ব্যতিক্রম না হলে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখ ( এবারে মতো কখনও কখনও বা ১৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্বকর্মা পুজো হতে দেখা যেত ৷তবে ইদানিং কারখানা বন্ধের জেরে এবং গণেশের চাপে পিছু হটছেন বিশ্বকর্মা? এখন শারদোৎসবের প্রাক্কালে বিশ্বকর্মার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন যেন গণেশ৷ শুধু তাই নয় পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে ,এলাকার পর এলাকা জুড়ে গণেশ অনুগামীদের যেরকম প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ছে তাতে আগামী দিনে বাঙালি সমাজে মা দুর্গারও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন তারই বড় পুত্রটি ৷

সংস্কৃত, তেলুগু, তামিল ও কন্নড় ভাষায় গণেশকে বিনায়ক বলা হয়। পুরাণ মতে গণেশ হর-পার্বতীর পুত্র।আর তাঁর বাহন মূলত মূষিক বা ইঁদুর। বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর রূপ নিয়ে নানা বর্ণনাও রয়েছে। কোথাও কোথাও সিংহকেও তাঁর বাহন হিসেবে দেখা যায়।তবে গজমুণ্ড মনুষ্যকার দেবতা হিসেবে তাঁকে পুজো করা হয়।গণেশ মানুষের বুদ্ধি, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। বলা হয়ে থাকে, সকল কাজের আগে গণেশ স্মরণ বা পুজো করা মঙ্গলজনক এবং তা করলে কার্যে সিদ্ধি নিশ্চিত৷

হিন্দু পঞ্জিকা মতে, ভাদ্রমাসের শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গণেশের পূজা হয়। এই পুজোকে ঘিরে দশদিনব্যাপী গণেশ উৎসবের সমাপ্তি হয় অনন্ত চতুর্দশীর দিনে।ভারতের বাইরে নেপালে এবং শ্রীলঙ্কার তামিল হিন্দুরাও গণেশ পুজো করে থাকেন। দেশের ভিতর এই উৎসব মূলত মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাট, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে পালন করা হয়। তবে মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজো জাতীয় উৎসব রূপে পালন করা হয়। প্রথমে মহারাষ্ট্রে এই উৎসব পারিবারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা বিস্তার করে। প্রসঙ্গত, ১৮৯৩ সালে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক এই উৎসবকে মহারাষ্ট্রের এক জাতীয় উৎসবে পরিণত করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুধর্মের জাতিভেদের সংকীর্ণতা দূর করে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয় আন্দোলনকে সুসংবদ্ধ ও সংগঠিত করা। তিলকই প্রথম বারোয়ারি মণ্ডপে গণেশ প্রতিমা স্থাপন করেন ও দশদিন বাদে গণেশ বিসর্জনের প্রথার সূচনা করেছিলেন।

তবে বহুদিন ধরেই বাঙালির কাছে সিদ্ধিদাতা কেমন যেন ব্রাত্য থেকেছেন৷ দুর্গা-কালী পুজো বাদ দিলে মূলত বাঙালি সরস্বতীর আরাধনায় ব্যস্ত থাকে ৷ দুর্গাপুজোর ঠিক পরেই পাড়ার পাড়ায় ভাঙা প্যান্ডেলের একাংশে লক্ষ্মী পুজো হলেও তাতে জৌলুসের অভাব বড্ড চোখে পড়ে৷ এজন্যই প্রবাদ রয়েছে বাংলায় অবহেলিত লক্ষ্মী৷ অনেকের ধারণা লক্ষ্মী এখানে চঞ্চলা হওয়ায় আর্থিক দিক থেকে বেহাল দশা বাংলার৷

আগে শিল্পের অবস্থা যখন ভাল ছিল তখন বরং বিভিন্ন কারখানায় রমরমিয়ে চলত বিশ্বকর্মা পুজো৷ কিন্তু কয়েক দশক ধরে কারখানার দরজায় দরজায় তালা ঝোলায় এখন বিশ্বকর্মা পুজো সেই কৌলিণ্য হারাচ্ছে ৷ যদিও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বেড়া টপকে প্রকৃত উৎসবের পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে বঙ্গদেশে সরস্বতী এবং বিশ্বকর্মা পুজোই উদাহরণ৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি দিতে যেমন অহিন্দু ছাত্রদেরও দেখা যায় তেমনই কারখানায় বিশ্বকর্মা পুজোর দিন অন্য সম্প্রদায়ের শ্রমিক ও তার পরিবারের লোকেরা হুল্লোড়ে মাতে৷

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই আস্তে আস্তে মুম্বইয়ের অনুকরণে কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া’ ধ্বনি উঠছে ৷ প্রবাদ ছিল- বাংলা আজ যা ভাবে বাকি ভারত কাল তা ভাবে৷ কিন্তু ক্রমশ পিছতে পিছতে বাঙালি আজ ভারতের অন্য অঞ্চলকে অনুকরণ করতে শুরু করেছে৷ ভিন রাজ্য থেকে এ রাজ্যে আমদানি হয়েছে ধনতেরাস উৎসব৷ আগে ওই দিনে সোনা কেনার তেমন রেওয়াজ ছিল না বঙ্গদেশে৷ কিন্তু দেশের অন্য অঞ্চলকে অনুকরণ করে গত ৮-১০ বছর ধরে ওই দিনে ক্রমশ পাল্লা দিয়ে সোনা কিনতে নেমে পড়ে এখন বাঙালি৷ তেমনই ইদানিং ভিন রাজ্যের প্রভাবে বাংলায় গণেশ আসছেন৷

উল্টোদিকে বরং হারিয়ে যাচ্ছে সেই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে প্যান্ডেলকে কেন্দ্র করে জাত ধর্ম নির্বিশেষে কারখানার শ্রমিকদের তরল নেশায় মেতে ওঠার ছবিটা৷ কয়েক দশক আগেও এমন ঘটা করে পাড়ায় পাড়ায় খুঁটিপুজো হতে দেখা যেত না ৷ বরং দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগে এই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনেই যেন শারদোৎসবের আভাস মিলত ৷ আর এই দিনটিতে শ্রমিক -মালিকের চেনা সম্পর্কের সমীকরণটা অন্যরকম থাকত ৷

বেতন বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদী দায় না নিতে চাইলেও কিছুটা সহৃদয় মালিকপক্ষ তুলনায় দরাজ হস্ত ছিল কারখানার এই উৎসবে অর্থ বরাদ্দে ৷ হয়তো কিছুটা ধর্মভয় কিংবা কিছুটা সহানভূতির কারণে তখন মালিক পক্ষ বিশ্বকর্মা পুজোর খাতে খরচ নিয়ে তেমন দর কষাকষি করতেন না৷ তাছাড়া এই পুজোর দিনে সব আয়োজনের দায়িত্ব তো থাকত শ্রমিকদের হাতেই ৷ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা আসতেন যেন নিমন্ত্রিত হয়ে৷

গোটা বছরের মধ্যে একমাত্র এই দিনটাতে যেন বোঝান হত কারখানাটা শ্রমিকদের৷ একদিনের জন্য হলেও বিশ্বকর্মা পুজোয় অন্য মর্যাদা আর স্বীকৃতি পেত শ্রমিকরা৷ শ্রমিক -মালিকের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এর থেকে ভাল কোনও চিত্র ছিল না৷ যদিও সময়ের তালে এদের মধ্যকার প্রতিদিনের সম্পর্ক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়, অবনতির জেরে অনেক কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া বের হওয়া বন্ধ হয়েছে ৷ জানি এক হাতে তো তালি বাজে না, শিল্পবিরোধের জন্য উভয় পক্ষই দায়ী ছিল৷ যুক্তি পাল্টা যুক্তি উভয়েরই আস্তিনে রয়েছে৷ আর কারখানাই যদি না থাকে তাহলে বিশ্বকর্মাই বা কোথায় এসে উঠবেন ৷ যন্ত্রপাতি মেশিনপত্রের মধ্যেই তো বিরাজ করেন বিশ্বকর্মা৷ ফলে বিশ্বকর্মার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে এখন বড় ভরসা হল গ্যারাজ, বাসের গুমটি অটো স্ট্যান্ড ইত্যাদি ৷

মে দিবসকে শ্রমিক দিবস পালন করতে উৎসাহী বামেরা ৷ বঙ্গজ কমিউনিস্টরা জন সংযোগের জন্য পুজোর আয়োজনে পক্ষপাতি নন৷ তাই ৩৪ বছরের শাসনেও উপলব্ধি করতে পারেনি বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটাই এক অর্থে শ্রমিক দিবস৷ শুধু তাই নয় শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক স্থাপন তথা শিল্পে শান্তি স্থাপনে এই দিনটাকে প্রতীকি হিসেবে কাজে লাগানোর প্রয়োজন বোধ করেননি ৷ ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে ৷

বিজেপি মাঝে মাঝে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটিকে শ্রমিক দিবসের দাবি তুললেও তার মধ্যে কতটা প্রকৃত উপলব্ধি আর কতটা রাজনৈতিক গৈরিকায়নের উদ্দেশ্য, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে৷ অন্যদিকে রাজ্যে অ-কমিউনিস্ট নেতারা জন সংযোগের জন্য সাধারণত দুর্গা-কালী পুজোর আয়োজন করলেও বিশ্বকর্মা নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখায়নি৷ বরং নেতাদের বর্তমান আচরণ দেখে মনে হচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেস, সব দলের নেতারাই জন সংযোগের জন্য গনেশকেই আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চাইলে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷