সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: আজ থেকে ৯০ বছর আগে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাঁচ শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। সেই শপথ বাক্য মেনে ৭১তম প্রজাতন্ত্র দিবসে ফের যেন প্রয়োজন হয়ে পড়ছে গান্ধীজীর দেওয়া শপথ মনে করার।

১৯৩০ সালের ২ জানুয়ারি কংগ্রেসের নবগঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে স্থির করা হয় যে, যতদিন না ভারত পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করবে, ততদিন প্রতিবছর ২৬ জানুয়ারি ভারতের ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে পালিত হবে। এই সুবাদে মহাত্মা গান্ধী একটি শপথ নামা তৈরি করেন এবং ঠিক হয় যে, ২৬ জানুয়ারি এই শপথ নামা সারা ভারত জুড়ে সভা-সমিতিতে পাঠ করা হবে। এতে বলা হয়েছিল যে,

১)স্বাধীনতা ভারতবাসীর জন্মগত অধিকার।
২)এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।
৩)ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও আর্থিক বিপর্যয় ঘটেছে।
৪)এই সরকারের অবসান ঘটানো ভারতবাসীর কর্তব্য।
৫)ভারতবাসী বিশ্বাস করে যে, অহিংস অসহযোগ এর মাধ্যমে এই অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটবে এবং পূর্ণ স্বাধীনতা না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।

গান্ধীজীর পাঁচ অমর বাক্যের সঙ্গে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি কোথাও যেন মিলে যাচ্ছে। আজ যেন প্রয়োজন হয়ে পড়ছে দেশবাসীর গান্ধীজীর পাঠ করানো সমস্ত শপথ বাক্যকে আরও একবার ভালো করে পড়ে নেওয়া।

ফিরে যাওয়া যাক ১৯৩০ সালে। ওই বছর ২৬ জানুয়ারি সারাদেশে ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালিত হয়, ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং দেশবাসী স্বাধীনতার শপথ বাক্য পাঠ করে। এরপর থেকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত নানা অসুবিধার মধ্যে দিয়েও দেশবাসী ২৬ জানুয়ারি ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালন করে এসেছে। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই দিনগুলোর কথা মনে রেখে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ২৬ জানুয়ারী ভারতকে একটি ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা হয় এবং এই দিনেই আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতের সংবিধান গ্রহণ করা হয়।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে জানা যাচ্ছে ২৬ জানুয়ারির প্রকৃত ইতিহাস জানতে গেলে আরও ১১ বছর পিছিয়ে ১৯১৯ সালে পৌঁছে যেতে হবে। ওই বছর মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন-সংস্কার আইনে বলা হয়েছিল যে, এই আইনের কার্যকারিতা সম্বন্ধে অনুসন্ধানের জন্য ১০ বছর পরে একটি রাজকীয় কমিশন নিযুক্ত করা হবে।

কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এই আইনের ব্যর্থতার জন্য নির্ধারিত সময়ের আগেই ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে ৭ জন সদস্যের একটি কমিশন(সাইমন কমিশন) ভারতে আসে। এই কমিশনে কোন ভারতীয় সদস্য ছিল না। ভারতের সংবিধান তৈরির দায়িত্ব ভারতবাসীরই প্রাপ্য অথচ কেবলমাত্র ইংরেজদের নিয়ে গঠিত এই ‘all white’ কমিশন অনুসন্ধান করবে যে ভারত দায়িত্বশীল সরকার গঠনের উপযুক্ত হয়েছে কিনা। এই ব্যাপার ভারতবাসীদের কাছে ‘জাতীয় অপমান’ বলে মনে হয়েছিল।

এই ঘটনার যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্য ১৯২৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর, জাতীয় কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনে সর্বদলের গ্রহণযোগ্য একটি সংবিধান রচনার কথা বলা হল এবং সুভাষ চন্দ্র বসু ও জহরলাল নেহেরু ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’-র প্রস্তাব দাখিল করলেন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে-৩১শে অগাস্ট সর্বদলীয় সম্মেলনের লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে মতিলাল নেহেরু এই সংবিধানের খসড়া (নেহেরু রিপোর্ট) পেশ করেন। এই রিপোর্টে ভারতের জন্য ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস’ বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয়েছিল। এই রিপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্যের ফলে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে মার্চ মহম্মদ আলি জিন্নাহ মুসলিম লীগ এর তরফ থেকে ‘চৌদ্দ দফা দাবি’ পেশ করেন।

অন্যদিকে, ১৯২৯ সালের ৩১ অক্টোবর বড়লাট লর্ড আরউইন একটি ঘোষণাপত্র জারি করে বলেন যে,

১) ভারতকে উপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করাই সরকারের লক্ষ্য।
২) সাইমন কমিশনের রিপোর্ট পেশ হলে ওই রিপোর্ট ও নতুন সংবিধানের ব্যাপারে আলোচনার জন্য লন্ডনে ভারতীয় নেতৃবৃন্দকে একটি গোলটেবিল বৈঠকে আহ্বান করা হবে। কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসু এবং তার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের বামপন্থী দল এতে খুশি হননি এবং তাঁরা জানান যে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন বা গোলটেবিল বৈঠক তাঁরা চান না।

‘নেহরু রিপোর্ট’ কার্যকারী করার শেষ দিন ১৯২৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর হলেও সরকারের অবহেলায় সেটা কার্যকরী হয়নি। ফলে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাত্রে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে রাভি(ইরাবতী) নদীর তীরে জহরলাল নেহেরু স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করেন এবং ঘোষণা করেন যে, জাতীয় আন্দোলনের লক্ষ্য হল ‘পূর্ণ স্বরাজ’ অর্থাৎ পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন। এরপরেই চলে আসছে ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০ সালের ঘটনা।