তিনি জাতির জনক, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে বাঙালির অনেক ক্ষোভ৷ অভিমানও৷ খানিকটা অভিযোগও আছে৷ কেন সুভাষের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি? কেনই বা দেশভাগ আটকাতে আরও কড়া হাতে রাশ ধরলেন না তিনি? প্রশ্ন থাকে, তবে তার উত্তর খুঁজতে দ্বন্দ্বের আবহ নয়, ডুব দেওয়া উচিত যুক্তির গহিনে৷ আমরা যেন ভুলে না যাই, ক্ষমতা হাত বদলের  সময় স্বাধীনতার উৎসবমুখর দিল্লি থেকে অনেক দূরে তিনি একাকী বিষণ্ণ বসেছিলেন এই কলকাতাতেই৷ লিখছেন সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

নেতাজি সুভাষচন্দ্রের প্রতি বাঙালির অমোঘ আকর্ষণের জেরে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি যেন সাধারণ বাঙালির এক উদাসীনতা রয়েছে৷ শুধু উদাসীনতা নয় একটা ক্ষোভও থাকতে দেখা যায়৷ প্রাথমিক ভাবে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দেশের এই দুই নেতাই স্বাধীনতার প্রাক্কালে দুই মেরুতে অবস্থান করতেন ফলে এক সময় একে অপরের চরম বিরোধী হয়ে পড়েন ৷ সেখানে গান্ধীর তুলনায় নেতাজির দিকে বাঙালির ঝোঁকার বেশ কিছু কারণ আছে অবশ্যই ৷ ১৯৪৭ সালে গোটা দেশের স্বাধীনতা মিলেছিল দেশভাগের যন্ত্রণার বিনিময়ে৷ অর্থাৎ দেশের অনেকাংশ যখন শুধুই স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করেছে তখন বাঙালির কাছে তা বিস্বাদ হয়ে ওঠে দেশের সীমারেখা টানা ব়্যাডক্লিফ লাইনটির জন্য৷ কিন্তু বাঙালিরা একটা কথা মনে রাখতে চায় না স্বাধীনতার মূহূর্তে দেশের আর পাঁচজন নেতার মতো সেদিন দিল্লিতে উৎসবে মাতেননি মহাত্মা৷ বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্তে তিনি একাকি রইলেন দিল্লি থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে এই কলকাতাতেই ৷ জাতির জনকের তখন কয়েকদিনের ঠিকানা ছিল বেলেঘাটার গান্ধীভবন৷

gandhi-bhavan
বেলেঘাটার গান্ধীভবন৷ ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট এখানেই ছিলেন জাতির জনক৷

১৯৩৮ সালে গান্ধীর বিরোধিতা থাকলে শেষমেশ হরিপুরায় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন সুভাষচন্দ্রই। কিন্তু তারপরে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য সুভাষ ত্রিপুরি সেশনে কংগ্রেসের সভাপতি হতে উদ্যোগী হন। তখন গান্ধীজির সমর্থনে সুভাষের বিরূদ্ধে পট্টভি সিতারামাইয়া দাঁড়ালেও তাঁকে হারিয়ে দেন নেতাজি ৷ তবে সেই নির্বাচনের ফল জানার পর তিনি যে সুভাষের কতটা বিরোধী তা বোঝাতে গান্ধী বলেওছিলেন "পট্টভির হার আসলে আমার হার"৷ ফলে জিতলেও গান্ধী অনুগামীদের বাধার চোটে ঠিকমতো কাজ করতে পারলেন না সুভাষ৷ পরিস্থিতি এমনই দাঁড়াল যে তখন নেতাজি বাধ্য হলেন সভাপতি পদ ও দল ছাড়তে এবং নতুন দল ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করলেন। গান্ধী-সুভাষের এই বিরোধ তো বাঙালি ভুলতে পারে না৷ তাছাড়া সেনাবাহিনীর দিকে নজর করলেই বোঝা যায় তেমন ব্যতিক্রমী না হলে বঙ্গসন্তানেরা এখনও তেমন ভাবে যুদ্ধে উৎসাহী নয়৷ তবে নিজে যুদ্ধে যেতে তেমন আগ্রহী না হলেও মনে মনে বীরের প্রতি একটা শ্রদ্ধা ও আগ্রহ থেকেই যায়৷ এই বিষয়ে কেউ খোঁচা দিলে বাঙালিদের বীর যোদ্ধা কোনও একটা আইকন তো দরকার৷ সেক্ষেত্রে সুভাষই যে বড় উদাহরণ তা বলাই বাহুল্য ৷ তাছাড়া সুভাষের অন্তর্ধান রহস্য, মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক সব মিলিয়ে বাঙালি কাছে তিনি আজও যেন জীবিত থেকে যান ৷ তাই সম্প্রতি তাঁর সম্পর্কে গোপন ফাইল প্রকাশ খবরের শীরনাম হয়৷ সুভাষ ঘরে না ফেরার জন্য নতুন করে অভিযোগের আঙুল উঠছে নেহরু পরিবারের দিকে ৷ আর জাতিরজনক তো চিরকালই নেহরুর দিকে বলেই মনে করে বাঙালি৷ ফলে গান্ধীর প্রতি শুধু বাঙালির ক্ষোভ নয়, অনেক সময় অবজ্ঞা তাচ্ছিল্য এসে পড়ে ৷


যেমন কৌরব -পান্ডবদের ভাতৃঘাতী যুদ্ধ কি কৃষ্ণ থামাতে পারতেন না, এ প্রশ্ন তো তুলেছিলেন গান্ধারী৷ এমনকী কৃষ্ণকে ভারতযুদ্ধের জন্য দায়ী করে অভিশাপও দিয়েছিলেন৷তেমনই গান্ধীজি কেন সিদ্ধান্তহীন হয়ে মৌনব্রত নিলেন, কেন দেশভাগ রুখতে আরও সচেষ্ট হলেন না, সে প্রশ্নই আজও বাঙালিরা করে চলেছে জাতির জনককে৷ তবে গান্ধীজির মতো রাজনৈতিক নেতারা কী সিদ্ধান্ত নেন, কেন যে তাঁদের চুপ করে থাকতে হয়, কেনইবা আটকাতেও গিয়েও দাঙ্গা আটকাতে পারেন না, সে বিচার একমাত্র করতে পারে ইতিহাসই৷


দেশভাগ হয়েছিল, পাশাপাশি হয়েছিল বাংলা ভাগ৷ যার ফলে আর্থ-সামাজিক দিক থেকে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এপার বাংলা৷ উদ্বাস্তু সমস্যায় বাঙালির অর্থনীতিটাই তো বদলে গেল৷ আজও বাঙালির ক্ষোভ কেন গান্ধী দেশভাগ মেনে নিলেন ? যেখানে পরাধীন ভারতে গান্ধীজি বার বার বলেছিলেন তিনি দেশভাগকে সমর্থন করেন না৷ শুধু তো তাই নয় তিনি বলেছিলেন- যদি দেশভাগ করতে হয় তা যেন হয় তার শরীরের উপর দিয়ে৷ গান্ধীর জীবিত অবস্থাতেই তো দেশ স্বাধীন হল আর বাংলাও ভাগ হল৷ কেন তিনি পারলেন না দেশভাগ আটকাতে৷ অর্থাৎ বাঙালির মনে হয় গান্ধী কথা রাখেননি৷ হ্যাঁ তিনি দেশ ভাগ আটকাতে পারেননি কিন্তু পাকিস্তান ও ভারতের একদল নেতার মতো ধর্মের ভিত্তিতে এ ভাবে দেশভাগের সিদ্ধান্তও তিনি মেনে নিতেও পারেননি৷ তাই তো তিনি যেন ‘একলা চলো রে’ পথে হেঁটেছেন৷ তাই তো স্বাধীনতার মুহূর্তে জওহরলাল, প্যাটেলের রাজেন্দ্রপ্রসাদের দিল্লিতে উৎসবের আনন্দে মাতলেন, সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি জাতির জনককে ৷ এখানেই তাঁর সঙ্গে তফাৎ আর পাঁচজন তৎকালীন কংগ্রেস নেতার৷

বাপুজির সরঞ্জাম
বাপুজির সরঞ্জাম

স্বাধীনতার ঠিক আগে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের আগুনে তখন জ্বলছিল নোয়াখালি, কলকাতা। দেশ স্বাধীন হওয়ার দু-দিন আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন সোদপুরের খাদি আশ্রম-এ। গান্ধীজি বেলেঘাটায় দাঙ্গাক্রান্ত এলাকা পায়ে হেঁটে ঘুরলেন ৷ তখন দুই ধর্মের মানুষই তাঁর কাছে নিরাপত্তা চায়। পরিস্থিতি বিচার করে তিনি তখন ঠিক করলেন বেলেঘাটায় থাকবেন৷ ১৩ আগস্ট বেলেঘাটার বাড়িতেই এলেন তিনি। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হল আর রাত বারোটার পর ১৫ আগস্ট স্বাধীন হল ভারত। মধ্যরাতে জন্ম হল স্বাধীন ভারতের৷ দিল্লিতে উড়ল ভারতের জাতীয় পতাকা৷ প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু সহ আরও অনেক তাবড় নেতারা স্বাধীনতা স্বাদ নিতে উৎসবে মাতোয়ারা৷ তখন কিন্তু গান্ধীজিকে পাওয়া গেল এই হায়দরী মঞ্জিলে মৌন-অনশনে থেকে চরকা কেটেছেন। এই হায়দরি মঞ্জিল পরে পরিচিত হয় বেলেঘাটার ‘গান্ধীভবন’ বলে। এর কয়েকদিন পরে পয়লা সেপ্টেম্বর ধর্মান্ধদের ছুরিকাঘাতে খুন হন গান্ধী-অনুগামী শচীন মিত্র। সেদিন থেকে ফের ওই বাড়িতে টানা অনশন শুরু করেন গান্ধীজি। চৌঠা সেপ্টেম্বর দুই ধর্মের বিশিষ্টজনেরা তাঁর কাছে ক্ষমা চান ও দাঙ্গার বদলে শহরে শান্তি ফেরানোর অঙ্গীকার করায় পর তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। ৭ সেপ্টেম্বর তিনি কলকাতা ছাড়েন।

আসলে আমরা ইতিহাস নিয়ে যতটা মুখর চর্চায় ততটা গভীর নই৷ তাহলে হয়তো অন্য অনেক সত্য গভীরভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হত৷ তবে দেশভাগ কিংবা দাঙ্গার দায় যে গান্ধীজির উপর বাঙালি চাপিয়ে দিয়েছে তা অনেকটাই একতরফা৷ পালটা প্রশ্ন তো করা যায়, তৎকালীন বাংলার হিন্দু-মুসলিম নেতারাই বা কী করছিলেন? যেমন কৌরব -পান্ডবদের ভাতৃঘাতী যুদ্ধ কি কৃষ্ণ থামাতে পারতেন না, এ প্রশ্ন তো তুলেছিলেন গান্ধারী৷ এমনকী কৃষ্ণকে ভারতযুদ্ধের জন্য দায়ী করে অভিশাপও দিয়েছিলেন৷ যেমন আপামর ভারতবাসী তো আজও কপিল দেবের দিকে আঙুল তোলেন, – কেন তিনি শেষ ওভারে চেতন শর্মার হাতে বল তুলে দিলেন, আর শেষ বলে ছয় মেরে জাভেদ মিঁয়াদাদ সারজায় চাম্পিয়ান হল? অথচ ওই একটা ছয় না হলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত৷ তেমনই গান্ধীজি কেন সিদ্ধান্তহীন হয়ে মৌনব্রত নিলেন, কেন দেশভাগ রুখতে আরও সচেষ্ট হলেন না, সে প্রশ্নই আজও বাঙালিরা করে চলেছে জাতির জনককে৷ তবে গান্ধীজির মতো রাজনৈতিক নেতারা কী সিদ্ধান্ত নেন, কেন যে তাঁদের চুপ করে থাকতে হয়, কেনইবা আটকাতেও গিয়েও দাঙ্গা আটকাতে পারেন না, সে বিচার একমাত্র করতে পারে ইতিহাসই৷ নেতাজি-গান্ধীজি দ্বন্ন্দ্বের  সরল সমীকরণে বাঙালি অভ্যস্ত ঠিকই, কিন্তু যুক্তি দিয়ে আরও গভীরে গিয়েই তাঁকে বিচার করা উচিত বলে মনে হয়৷ যে মানুষটা নিজের শরীরের উপর দিয়ে দেশভাগ হওয়ার কথা বলেছিলেন, তাঁকেই যে কেন চুপ করিয়ে দিল, সে ইতিহাস বোধহয় গোপনই থেকে গিয়েছে৷ জানি না, হয়ত কোনও গোপন নথি আবার আলো ফেলবে সেই রহস্যে, হয়ত মোহ কাটিয়ে বাঙালিও আবার ইতিহাসের আলোয় সঠিকভাবে চিনে নিতে পারবে জাতির জনককে৷