সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: একটা সময় এ রাজ্যের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের মুখে শোনা যেত- বিদেশে কালো ব্যাজ পরে ঘুরলেই ম্যানেজমেন্ট নড়েচড়ে ওঠে৷ কিন্তু এই পোড়া দেশে সেটা হয় না৷ তাই বাধ্য হয়ে ধর্মঘট করতে হয়৷ আত্মপক্ষ সমর্থনে দেওয়া এমন সাফাই আদৌ কতটা যুক্তিসঙ্গত তা বিতর্কের বিষয়৷ তবে তারই যেন প্রতিধ্বনি গত কয়েকদিন ধরে শোনা যাচ্ছে৷ একার অভিযোগে কিছুই হয় না৷ সুবিচার পেতে হলে সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করাটা একান্ত জরুরি- এই ধারণাটা ক্রমশ যেন চেতনে অথবা অবচেতনে অনেকের মনের মধ্যে দানা বাঁধছে৷ সম্প্রতি শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্যক্ষেত্র সর্বত্রই যা ঘটছে তাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে প্রশাসনের আচরণ যেন জনরোষ নামক এক সামাজিক ব্যাধির দিকে ঠেলে দিচ্ছে জনসমাজকে৷ প্রতিবাদ হল বলেই যেন গত কয়েক মাসে অ্যাপোলো হাসপাতালের রুপালি বসু থেকে জি ডি বিড়লা স্কুল থেকে শর্মিলা নাথের অপসারণের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে৷

৬০-৭০ দশকে জনরোষ কারখানা চত্বর থেকে রাজপথে নেমে আসত৷ এখন সেটাই যেন হাসপাতাল কিংবা স্কুল চত্বর থেকে রাজপথে নেমে আসছে৷ তবে এটাও ঘটনা, সময়ের তালে এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বেসরকারিকরণ অনেকটাই হয়ে গিয়েছে৷ ফলে সেদিনের চটকলের মালিকদের হাতেই এখন হাসপাতাল কিংবা স্কুলের নিয়ন্ত্রণ৷ আর স্কুল কিংবা হাসপাতালে গড়ে মালিকেরা মুখে সেবার কথা বললেও এগুলিকে আসলে তাঁদের মুনাফা করার যন্ত্র হিসেবেই ব্যবহার করেন৷

তবে ৫০-৬০ বছর আগে শ্রমিকদের প্রতি মুনাফাখোর শিল্পপতির শোষণের আচরণের কথা জেনেও প্রশাসনের দুর্বলতা বা ব্যর্থতার জেরে ক্রমশ শ্রমিক কর্মচারিরা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন৷ আর প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে শিল্পপতিদের শায়েস্তা করতে নেমে হরতাল, ধর্মঘটের রাস্তায় হেঁটেছিল ট্রেড ইউনিয়ন৷ কিন্তু পরে দেখা গিয়েছিল সেই সমাধানের পথটাও আত্মঘাতী ছিল৷ বাংলা থেকে পুঁজি সরে যাওয়ার জন্য এখনও তাই ওই শ্রমিক আন্দোলনকেই দায়ী করা হয়৷ ঠিক তেমনই ক্ষিপ্ত মানুষের বিচারশালায় যদি কারও বিচার শুরু হয়, সেটা যেমন একদিক দিয়ে আদৌ আদর্শ পরিবেশ নয় তেমনই সেটা কাঙ্খিত নয়৷

সপ্তাহ খানেক ধরে শহর উত্তাল দু’টি বেসরকারি স্কুলে একেবারে শিশু দুই ছাত্রীর যৌন হেনস্তার অভিযোগ ঘিরে৷ জি ডি বিড়লা স্কুলে এবারের মতোই একইরকম অভিযোগ তিন বছর আগেও উঠেছিল৷ তখন যে যে পদক্ষেপ করার আশ্বাস স্কুল কর্তৃপক্ষ দিয়েছিল তার অনেক কিছুই এই তিন বছরেও করে উঠতে পারেনি৷ শুধু তাই নয় এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরেও ওই স্কুলের প্রিন্সিপাল প্রথম থেকে বিষয়টি চেপে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন৷ তিনি বিষয়টি লঘু করতে বলেছেন, ‘‘দুষ্টুমী করেছে৷’’ এমন হতাশজনক উক্তি ওই পরিস্থিতিতে পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছিল৷ অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের গ্রেফতারের পাশাপাশি এই প্রিন্সিপালের অপসারণ ও গ্রেফতারের দাবি ওঠে৷ অভিভাবকদের বিক্ষোভ, পথ অবরোধের জেরে সরকার প্রশাসন নড়েচড়ে বসে৷ অভিযুক্ত শিক্ষকরা গ্রেফতার হয় এবং অবশেষে প্রিন্সপালকে অপসারিত করে স্কুল কর্তৃপক্ষ৷

অন্যদিকে এম পি বিড়লা স্কুলে একই রকম ঘটনা ঘটে আড়াই তিন মাস আগে৷ স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের তখন আশ্বাস দিলেও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি৷ কিন্তু জি ডি বিড়লার ঘটনা দেখে বলা চলে অনুপ্রাণিত হয়ে এম পি বিড়লা স্কুলের অভিভাবকরাও আন্দোলনে নামেন এবং এক অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়৷
এখন এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি এভাবে পথে না নামলে অভিযোগ গ্রহণ হবে না, সুবিচার পাওয়া সম্ভব নয়৷ বিশেষত জি ডি বিড়লা স্কুলে অভিভাবকদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ফের খুঁচিয়ে তোলা হল এম পি বিড়লা স্কুলে সেপ্টেম্বর মাসের ঘটানাটি৷ কিন্তু এই ধরনের প্রণবতা বৃদ্ধি সমাজের পক্ষে শুভ নয়৷ কারণ আদালতের বাইরে মানুষের বিচারসভায় যদি কারও বিচার শুরু হয় সেটা তো মারাত্মক৷ গ্রামগঞ্জে ডাইনি অপবাদে মেরে ফেলার কথা শুধু নয়, শহরের বুকে পথ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘাতক গাড়ির চালকের গণপিটুনির শিকার হওয়ার কথা তো কারও অজানা নয়৷

আসলে বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসনের প্রতি আস্থা আছে মুখে বললেও, মনে মনে বেশির ভাগ মানুষই সেটা মনে করেন না৷ তাঁদের অনেকেরই ধারণা, প্রভাবশালীরা তাদের অর্থ ও ক্ষমতার জোরে প্রমাণ লোপাট থেকে শুরু অনেক কিছুই বদলে দিতে পারেন৷ ফলে অন্তরের সেই মনোভাব থেকেই আইনকে হাতে তুলে নেওয়ার একটা প্রবণতা জাগে৷ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে প্রশাসন তথা বিচারব্যবস্থাসহ সব মহলের এবার এমন সামাজিক সমস্যা বাড়বাড়ন্ত নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করা দরকার৷ নইলে সেটাও আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে৷

ঘটনার প্রেক্ষিতে অসহায় বাচ্চাদের সুবিচারের কথা বললেও অনেক অভিভাবক এই আন্দোলনকে সমর্থন করেননি৷ আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ৩-৪ বছরের বাচ্চা আদৌ কতটা এই ধরনের যৌন হয়রানি বলতে বা বুঝতে সক্ষম৷ নিশ্চয়ই তাঁদের কথায় যুক্তি আছে৷ ঠিকই, বিচারের আগে যেমন কাউকে জনতার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়, তেমনই এমন গুরুতর অভিযোগের পর কোনও রকম তদন্ত ছাড়াই কাউকে নির্দোষ দাবি করাও তো ঠিক নয়৷ যদি ৩-৪ বছরের শিশুটির সমস্যার কথা সত্যি স্কুল কর্তৃপক্ষ অনুভব করত, তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না৷ অসুখের গভীরে না গিয়ে প্রথম থেকেই সাজানো ঘটনার তত্ত্ব চালাতে গেলে উল্টে বিশ্বাস হারিয়ে সন্দেহটাই শুধু বাড়তে দেওয়া হয়েছে৷

এটা ঘটনা, সরকার যত বেশি শিক্ষা ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে ততই পয়সা দিয়ে শিক্ষা কেনার প্রবণতা আরও প্রকট হচ্ছে৷ ‘সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে ’- এই বিশ্বাস নিয়ে থাকা শিক্ষিত ও ভালো পদে নিযুক্ত রয়েছেন দাবি করা এই সব অভিভাবকের মনে রাখা উচিত, সব শিক্ষা কিন্তু স্কুলে পাওয়া যায় না৷ পরিবার, পরিবেশ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে শিশুরা৷

স্কুল বন্ধ রাখা নিয়ে ছাত্রী তথা অভিভাবকদের মধ্যে বিভাজনটাও এই সময়ে নজরে এসেছে৷ পড়া এবং পরীক্ষার টেনশনের জন্যই হয়তো এই ইস্যুতে স্কুল বন্ধ থাকা অনেকের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছিল৷ কিন্তু সেটাও আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতিফলন নয় তো? ছোটবেলা থেকেই কেরিয়ার এবং পরীক্ষাসর্বস্ব করে মানুষ করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন হয়ে উঠছে না তো, যারা মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছে৷ তাহলে সেটাও তো বাঙালির জীবনে এক ধরনের আত্মঘাতী৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ