কলকাতা: নক্ষত্রপতন চলছেই। গতকাল ইরফান খানের পর বৃহস্পতির সকালটা শুরু হয়েছিল বলিউডের প্রথম চকোলেট হিরো, রুপোলি পর্দার কিংবদন্তি অভিনেতা ঋষি কাপুরের প্রয়াণের খবর দিয়ে। বিকেল গড়াতেই বয়ে এল আরেক দুঃসংবাদ। ক্ষেত্র ভিন্ন হলেও জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে ইতি টেনে তারাদের দেশে চলে গেলেন প্রবাদপ্রতিম ফুটবলার চুনী গোস্বামী। গত মাসেই দীর্ঘ রোগভোগের পর হাল ছেড়েছিলেন বন্ধু প্রদীপ বন্দোপাধ্যায়। ৮২ বছর বয়সে ইহলোকের মায়া কাটিয়ে ‘৬২-র এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী ফুটবল দলের অধিনায়ক চললেন একদা জাতীয় দলের সতীর্থ পিকে’র কাছে।

১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে জন্ম প্রবাদপ্রতিম ফুটবলার সুবিমল (চুনী) গোস্বামীর। ১৯৪৬ মাত্র ৮ বছর বয়সে মোহনবাগান জুনিয়র দলের হয়ে পথ চলা শুরু চুনীর। ১৯৪৬-১৯৫৪ জুনিয়র দলের হয়ে খেলার পর ১৯৫৪ মোহনবাগানের হয়েই সিনিয়র ফুটবলে কেরিয়ার শুরু হয় তাঁর। বর্ণময় ফুটবল কেরিয়ারে ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে কিংবদন্তীর জাতীয় দলের হয়ে অমর ফুটবল কীর্তিগুলোও।

জাতীয় দলে মাত্র ৮ বছরের সংক্ষিপ্ত কেরিয়ারে ৫০ ম্যাচ খেলেছিলেন সুবিমল ওরফে চুনী গোস্বামী। ভারতীয় দলের জার্সিতে ৯টি গোল করা প্রবাদপ্রতিম এই স্ট্রাইকার ক্লাব কেরিয়ারে আজীবন খেলেছেন মোহনবাগানের হয়ে। ১৯৫৪-৬৮ সময়কালে বাগানের হয়ে খেলার সময় একাধিক ক্লাবের লোভনীয় প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও মোহনবাগান থেকে কখনও চুনীকে টলাতে পারেনি কেউ। বিশ্বমানের স্ট্রাইকার চুনীর ফুটবল প্রতিভার ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল বিদেশেও। একবার মোহনবাগানের ঘরের ছেলের কাছে ইংলিশ ফুটবল ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারেরও অফার এসেছিল বলেও খবর। তাতেও সাড়া দেননি তিনি।

১৯৫৪ মোহনবাগানের হয়ে ক্লাব ফুটবলে সিনিয়র কেরিয়ার শুরু করেছিলেন চুনী গোস্বামী। এর ঠিক দু’বছর পর ১৯৫৬ চিনের অলিম্পিক দলের বিরুদ্ধে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল চুনী গোস্বামীর। জোড়া এশিয়ান গেমস (১৯৫৮, ১৯৬২), রোম অলিম্পিক (১৯৬০), এশিয়া কাপ, মারডেকা কাপের মত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ফুটবল খেলেছেন স্ট্রাইকার চুনী। ১৯৬২ জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর সবচেয়ে উজ্জ্বলতম বছর। ওই বছরই তাঁর অধিনায়কত্বে জাকার্তা এশিয়াডে সোনা জেতে ভারত। একই বছর চুনীর মুকুটে যোগ হয় এক অনন্য পালক। ১৯৬২ এশিয়ার সেরা স্ট্রাইকারের তকমা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন চুনী।

জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের খাতায় রয়ে যাবে ১৯৬৪ এএফসি এশিয়া কাপে রানার্স-আপ হওয়ার ঘটনা কিংবা ১৯৫৯,৬৪ মারডেকা কাপে রুপো জয়ও। মাত্র ২৮ বছর বয়সে (১৯৬৪) জাতীয় দল থেকে অবসর গ্রহণের পর মোহনবাগানের জার্সিতে আরও ৪ বছর চুটিয়ে ফুটবল খেলেছিলেন তিনি। ১৯৬৮ মোহনবাগানের জার্সি গায়েই ক্লাব ফুটবলকে বিদায় জানান দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার।

এতো গেল ফুটবলার চুনীর কেরিয়ারের কথা। বাংলাকে রঞ্জি ট্রফিতে রানার্স করা অধিনায়ক চুনী গোস্বামীর ক্রিকেট কেরিয়ারও বেশ উল্লেখযোগ্য। জাতীয় দলের হয়ে না খেললেও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে একজন দাপুটে অল-রাউন্ডার হিসেবে পরিচিতি ছিল চুনীর। ৪৬টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ১টি শতরান ও ৭টি অর্ধশতরান সহযোগে ১৫৯২ রান ও ৪৭ উইকেট রয়েছে চুনীর নামের পাশে। ১৯৬৬ সালে গ্যারি সোবার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিজের দলের বিরুদ্ধে ইনিংসে হার বাঁচাতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন চুনি গোস্বামী। ওই ম্যাচে বল হাতে এক ইনিংসে তাঁর ৮ উইকেট কেরিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

ক্রিকেটেও বাংলা দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১-৭২ সালে তাঁর নেতৃত্বে রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে উঠেছিল বাংলা। তবে ব্রোবোর্ন স্টেডিয়ামে বোম্বের কাছে হেরে রানার্স হয়েই সন্তুষ্ট হতে হয় বাংলাকে। ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য দক্ষতার জন্য তিনি ১৯৬৩ ‘অর্জুন’ ও ১৯৮৩ ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন। ১৯৯১-৯২ জাতীয় ফুটবল দলকে কোচিংও করিয়েছেন অল্প সময়ের জন্য।

গত কয়েকমাস ধরে সুগার, সিস্টেরেট এবং স্নায়ুজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক। পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে তাঁকে যোধপুর পার্কের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই বিকেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন তিনি।

কলকাতার 'গলি বয়'-এর বিশ্ব জয়ের গল্প