স্টাফ রিপোর্টার: টাকা, পেশি শক্তির এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এক ককটেলের ফসল আজকের রাজারহাট ৷আশি নব্বইয়ের দশক থেকে উত্তর ২৪ পরগণার এই অঞ্চল দাপিয়ে বেড়িয়েছে রাজনৈতিক মতদপুষ্ট জমি হাঙরেরা৷ রাজনৈতিক রঙ বদলালেও বছরের পর বছর চলেছে লুঠতরাজ৷ প্রথমে মাছের ভেড়ি ছিল এই অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত৷ কিন্তু রাজারহাটে নিউটাউন প্রকল্পের কথা সরকার ঘোষণা করতেই বদলে গেল চিত্রটা৷ পরিবর্তন হয়ে গেল এলাকার আর্থ সামাজিক কাঠামো৷ এই উপনগরী আয়তনে সল্টলেকের থেকে তিনগুণেরও বেশি বড় ৷ফলে রাজারহাটের জমি হয়ে উঠল এক সোনার খনি৷ একেবারে জেট গতিতে বাড়তে লাগল জমির দাম৷ স্থানীয় গুণ্ডারা রাতারাতি প্রোমোটারে পরিণত হল৷পাশাপাশি শুরু হয়ে যায় সিন্ডিকেটের নামে তোলাবাজি এবং নানা রকম ইমারতি জিনিস সরবরাহের কাজ৷

অভিযোগ ওঠে সিপিএমের সহায়তায় জোর করে জমি কিনতে নেমে পড়েছিলেন কমল গান্ধী, অরুণ মাহেশ্বরীর মতো লোকেরা৷ প্রথম সিপিএমই মূলত রাজ করত এলাকায়৷ চলত ছলে বলে কৌশলে জমি দখল৷ তখনকার বাজারদরের চেয়ে বেশি দামের লোভ দেখিয়ে ওই সব চাষিদের কাছ থেকে জমি কিনে নিতে থাকে যদিও সেই জমিই পড়ে বিক্রি হয়েছে আরও কয়েকগুণ বেশি দামে৷ তবে কেউ জমি দিতে অস্বীকার করলে ফল ভাল হত না৷ অর্থাৎ পরে বেশি দাম পাবার আশায় জমি ধরে রাখতে চাইলেও উপায় নেই ৷ নজরে পড়লে জমি এদের দিতেই হবে৷ আর না চাইলে জোর করে জমি নেওয়া শুরু হয়৷

রাজারহাটে নিউটাউন গড়ে তুলতে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় গুণ্ডাদের মধ্যে এক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে যায়৷ গৌর মণ্ডল , রুইস, সুশান্ত ওরফে হংসের মতো গুণ্ডাদের জমি দখলের কাজে সহায়তা করতে নেমে পড়ে আশেপাশে গ্রামে থাকা বেশ কিছু সিপিএম সমর্থক যুবক৷ এরাই এলাকায় একচেটিয়া মাল সরবরাহ করার নামে গড়ে তোলে সিন্ডিকেট৷ এদের নিয়ন্ত্রক রবীন মণ্ডল, তাপস চট্টোপাধ্যায় রমেশ বরের মতো সিপিএম নেতারাও ফুলে ফেঁপে ওঠেন৷

তবে ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটের পর তৃণমূলও ঢুকে পড়ে এই সব এই সব কার্যকলাপে ৷ কিছুদিন পরে দেখা যায় তৃণমূলের তন্ময় মণ্ডল সিপিএমের দাপুটে নেতা রবীন মণ্ডলের সঙ্গে সমঝোতা করে নেন হিডকোকে মাল সরবরাহে৷ পাশাপাশি জমি দখলের কাজও মিলেমিশে চলতে থাকে৷ তন্ময়ের এই সমঝোতার কথা জানতে পারেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ জানতে পেরেই তন্ময়কে দল থেকে তাড়ান তিনি৷ সেই সময় রাজারহাটে কৃষকদের স্বার্থে সভা করতে দেখা যেত মমতাকে।

তবে তন্ময়কে তাড়ালে কি হবে, ততদিনে ভাঙড়ের বিধায়ক হয়ে আরাবুল ইসলাম বিরাট সম্পত্তি করে ফেলে রাজারহাটের সিন্ডিকেটে ঢুকে পড়েছেন ৷ পাশাপাশি সল্টলেক থেকে আসা তৃণমূলের সব্যসাচী দত্তের বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছিল রাজারহাটে৷ এর কিছু দিন পরে অবশ্য ২০০৯ সালে স্থানীয় খেলার মাঠের গন্ডোগোলের জেরে বৈদিক ভিলেজে অগ্নিকান্ডে ঘটে ৷ রাজারহাট অঞ্চলের জমি হাঙরদের কথা ছড়িয়ে পড়ে৷

সিপিএমের মদতে গরীবের জমি কেড়ে নিয়েছে বৈদিক ভিলেজের মালিক রাজকিশোর মোদী এই অভিযোগ তুলে তখন তার গ্রেফতারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন মমতা। জমি-হাঙরদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেন। বৈদিক ভিলেজ কাণ্ডে আরাবুলের নাম উঠলেও সেই সময় আরাবুলকে আড়ালই করে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ পুরো ঘটনা সিপিএমের ঘাড়ে চাপিয়ে পাল্টা অভিযোগ করেছিলেন ৷ বৈদিক ভিলেজের মালিক রাজকিশোরের গ্রেফতারির দাবিও জানান মমতা। তার কয়েকদিন পরেই অবশ্য জোর করে জমি নেওয়া এবং বেআইনি ভাবে আগ্নেয় অস্ত্র মজুত রাখার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন রিয়েল এস্টেটের কারবারি রাজকিশোর মোদী।তাছাড়া গ্রেফতার হয় বৈদিক ভিলেজের প্রজেক্ট ম্যানেজার বিপ্লব বিশ্বাস, গফফর মোল্লা, মইনুদ্দিন মোল্লা, কেলো বাবু সহ আরও কয়েকজন।

ইতিমধ্যে রাজ্যে পালাবদল ঘটে গিয়েছে ৷মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজারহাটের অনেক সমীকরণই বদলে গিয়েছে৷ সেদিন যারা জমি-হাঙরদের মদতদাতা ছিল, সেই রেজ্জাক মোল্লা, তাপস চট্টোপাধ্যায় গফফর মোল্লার মতো লোকেরা শিবির বদল করে হাতে তুলে নিয়েছে তৃণমূলের পতাকা। এরফলে ইদানিং রাজারহাটে সিন্ডিকেট তোলাবাজি নিয়ে তৃণমূলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের খবর মাঝে মাঝেই উঠে আসে সংবাদ মাধ্যমে৷ সেই মাটি মাফিয়া গফফর তো এখনও তৃণমূলের অন্যতম ভরসা ভাঙড়ে। জমি হাঙরদের বিরুদ্ধে ভাঙড় আন্দোলনকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালাচ্ছে এই মাটি মাফিয়া। অভিযোগ, আবার তৃণমূল নেত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন রাজকিশোর মোদী৷ একটি সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেল সম্প্রতি প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে সেদিনের শত্রু রাজকিশোর মোদীর কাছ থেকে ভাইপো অভিষেক টাকা নিয়েছেন৷ এমন সংবাদ জানাজানি হওয়ার পর সংসদে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তৃণমূলকে ৷