স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: পুজোয় মানেই শপিং। তবে দোকানে দোকানে ঘুরে মার্কেটিং করার আর সময় কোথায়। তাই অনলাইনই এখন অনেকেরই ভরসা। তবে একটু অসাবধান হলেই অনলাইন শপিং ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ। তেমন ঘটনা কিন্তু কলকাতা শহরেও আকছার ঘটছে। ব্যাংকগুলির তরফ থেকে বারবার বলা হয়, যাতে কেউ এটিএমের পিন শেয়ার না করেন। তবে শুধু এটিএমের পিন নম্বর দিলেই যে আপনি প্রতারণার শিকার হবেন, তা কিন্তু নয়। প্রতারণার অনেক অভিনব উপায় রয়েছে। যাতে আপনার অজান্তেই আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা গায়েব হয়ে যেতে পারে।

সম্প্রতি এরকমই একটি ঘটনা ঘটেছে কলকাতার বাসিন্দা শুভাশিষ তালুকদারের সঙ্গে। অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেই সামনে আসে লোভনীয় দামে চমকদার জামাকাপড়ের ছবি। সেরকমই একটি ওয়েবসাইট থেকে শাড়ি অর্ডার দিয়েছিলেন শুভাশিস বাবুর স্ত্রী পম্পা তালুকদার। অগাস্ট মাসে সেই শাড়ির অর্ডার দেন তিনি। nareevastra.com নামের সেই ওয়েবসাইটে ১৬ অগস্ট শাড়ি অর্ডার করার পর, ২৪ অগস্ট প্রোডাক্ট পৌঁছে যায় তাঁর বাড়িতে। জিনিস হাতে পেয়েই তবেই টাকা দেন তিনি। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল।

এই সেই ওয়েবসাইটের ছবি

কিন্তু প্যাকেট খুলেই অবাক হয়ে যান এয়ারপোর্ট এলাকার বাসিন্দা পম্পা দেবী। ১০৯৯ টাকার যে শাড়ি এসেছে, তা মোটেই ওই দামের হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ, শাড়ীটির মান মোটেই খুব একটা ভালো নয়, ছবির সঙ্গে মিলই নেই সেই শাড়ীর। সঙ্গে সঙ্গে সেটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওয়েবসাইটে দেওয়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে রিটার্ন করার কথা বলেন। সংস্থা থেকে জবাবে একটি ঠিকানা পাঠানো হয়, যেটি সুরাতের। বলা হয় ওই ঠিকানায় শাড়ীটি পাঠালেই টাকা রিটার্ন পাওয়া যাবে। সেইমত শাড়ী পাঠিয়ে দেন পম্পা দেবী। কিন্তু টাকা ফেরত পাওয়ার কোনও আশা দেখছিলেন না। বারবার মেসেজ করেও কোনও লাভ হয়নি।

টাকা ফেরত আসছে না দেখে গুগল থেকে ই-মেল অ্যাড্রেস নিয়ে মেল করেন শুভাশিস বাবু। কোনও রিপ্লাই না পেয়ে গুগল থেকে কাস্টমার কেয়ার নম্বর খুঁজে বের করে সেখানে সরাসরি ফোন করেন তিনি। ঘটনাটি গত ১৯ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের। আর এই ফোন নম্বরটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের জন্য। ফোন করার কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাকাউন্টের সমস্ত টাকা উধাও। আর যেভাবে এই প্রতারণা হল, তা কিন্তু চিন্তায় ফেলে দেবে আপনাদেরও।

সকালে তিনি ফোন করার পরই তাঁকে বলা হয়, ‘আপনি যে অ্যাকাউন্টে টাকাটা ফেরত নেবেন, সেই অ্যাকাউন্টের শেষ চারটি সংখ্যা বলুন।’ শুভাশিস বাবু কোনও জটিল বিষয় না ভেবেই সেই সংখ্যা বলে ফেলেন। এরপর বলা হয়, ‘ওই নম্বরের সঙ্গে UPI নম্বরের যোগফলটা বলুন।’ শুভাশিসবাবু টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় হিসেব কষেই এসএমএস করে দেন সংখ্যাটা। ওই যোগফল থেকে অ্যাকাউন্ট নম্বরের চারটি ডিজিট বাদ দিলে যে UPI পিনটাই থাকে, তা যখন বুঝেছেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মিনিট কয়েকের মধ্যেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও ২৬,৫০০ টাকা। ওই অ্যাকাউন্টে ওই পরিমাণ টাকাই ছিল।

এখানেই শেষ নয়। টাকা ডেবিট হয়ে যাওয়ার পর যখন শুভাশিসবাবু ফোন করেন, তখন তাঁর কাছে ওই টাকার হিসেব না দিয়ে উল্টে অন্য একটি অ্যাকাউন্টের শেষ চার ডিজিট চাওয়া হয়। বারবার ফোন করে বলা হয়, ‘আপনার অন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বরের শেষ চার ডিজিট দিন।’ যদিও ততক্ষণে শুভাশিস বাবু বুঝে গিয়েছেন, এটা আসলে একটা ফাঁদ। আর তাতেই পা দিয়ে দিয়েছেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ছোটেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ও থানায়। নিউ টাউন থানায় ওই সংস্থার নামে একটি এফআইআর করেন ওই ব্যক্তি, সাইবার ক্রাইমের দ্বারস্থও হয়েছেন তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, ‘ঘটনাটির তদন্ত চলছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

প্রতারণার শিকার শুভাশিস তালুকদার

১০৯৯ টাকা ফেরত পেতে গিয়েছে পুজোর মুখে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়েছেন শুভাশিসবাবু। এরকম ঘটনা ঘটতে পারে যে কারও সঙ্গে। একদিকে যখন ডিজিটাইজেশনের হাওয়ায় সব কাজই অনলাইনে করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, নগদের ব্যবহার কমে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা তৈরি করে। সুতরাং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত যে কোনও নম্বর শেয়ার করার আগে দু’বার ভাবা উচিৎ।