আভাসটা লোকসভা ভোটের আগেই পাওয়া গিয়েছিল৷ ২৩ মে ফলাফল প্রকাশের পর তা প্রকাশ্যে এল৷ দু’দিন মৌনব্রত পালন করার পর তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী সাংবাদিক সন্মেলন করার পরই রাজ্যে ঘাসফুলের শোচনীয় অবস্থাটা একদম জলের মতো পরিস্কার হয়ে গেল৷ তারপর থেকেই কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ ভায়া কাঁকিনাড়া হয়ে তৃণমূলের ভাঙন শুরু হল৷ ছোট-বড়-মাঝারি নেতা-কর্মী-কাউন্সিলর-বিধায়ককে দিল্লিতে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে গেরুয়া বসন পরিয়ে দেওয়া হল৷ টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ দেখে বঙ্গ-বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা যেন জয়ের স্বাদ পেল৷ উচ্ছ্বাসে গদগদ ভাব৷ কিন্তু, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন, এতে কী দলের ভালো না মন্দ হল বা হচ্ছে?

রানা দাস
এডিটর-ইন-চিফ
কলকাতা24×7

আমার এই উত্তর সম্পাদকীয় পড়ে কেউ কেউ বলতেই পারেন, আমি তৃণমূলের দালালি করছি৷ আবার কেউ কেউ ঠিক বলবেন যে, আমি বিজেপির দালালি করছি৷ একজন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিকে এই সব কথা শুনতেই হয়৷ এই বদনামটা যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে৷ তবে, একটা কথা বলতে পারি, আমার ২০ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকেই এই উত্তর সম্পাদকীয়টি লেখা৷ এটা একান্তই আমার নিজস্ব ভাবনা৷ তা ভুল হতে৷ আবার সঠিকও হতে পারে৷ সবটাই আমার নিজস্ব মতামত৷ তো মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসছি৷

লোকসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরেই তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে দলে দলে নেতা-কর্মী বিজেপিতে নাম লেখাতে শুরু করেছে৷ ভাবটা এমন যেন, তৃণমূল কংগ্রেস একটা রাজনৈতিক দলই নয়৷ দলত্যাগীদের মুখে একটাই বুলি, ঘাসফুলের দলটা চলছে এক নায়কতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে৷ দলে তোলাবাজ-দুর্নীতিবাজে ভরে গিয়েছে৷ দুর্দিনের কর্মীরা দলে কল্কে পাচ্ছে না৷ আনকোরা নতুন মুখদের দলের মাথায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ তারই পাচ্ছে ভোটে দাঁড়ানোর টিকিট৷ বাধ্য হয়েই তারা সেই দল ত্যাগ করে বাংলার বিকল্প বিজেপি দলে নাম লেখাতে বাধ্য হয়েছেন৷ হয়তো দলত্যাগীদের কারও কারও যুক্তিকে সমর্থমন করতেই হয়৷ তবে, তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন, দলের এই অবস্থানের কথা কী আপনার আগে জানা ছিল না৷ যদি জেনেই থাকতেন, তবে এতদিন কেন ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ করেছেন?

যদি লোকসভা ভোটের পূর্ববতী অবস্থা নিয়ে আলোচনা করে দেখা যায়, তবে এটা স্পষ্ট হবে যে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং সেই দলের নেতাদের একাংশের আচার-আচরণ- মন্তব্যের কারণে বাংলার গোকূলে বাড়ছিল গেরুয়ার দাপট৷ মালদহের কালিয়াচক, হাওড়ার ধূলোগড়, উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাটের মতো হিংসার ঘটনাগুলিকে শাসকদলের পক্ষে থেকে প্রচ্ছন্ন মদত দেওয়াটাকে মানুষ ভালো চোখে নেয়নি৷ সংবাদমাধ্যমে ঘটনার সবটা জানতে না পারলেও, এলাকার মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছেন৷ আর সংবাদমাধ্যম চুপ করে থাকলেও, নানা সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ঘটনাগুলি প্রকাশ্যে এসেছিল৷ মানুষ তা দেখেছে, বুঝেছে আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷

শুধু এসব হিংসার ঘটনায় নয়৷ রাজ্যের পঞ্চায়েত ভোটের নাটকও মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে৷ রাজ্যজুড়ে বিরোধীদের মনোনয়নপত্র পেশ করতে দেওয়া হয়নি৷ যেখানে মনোনয়নপত্র পেশ করা গিয়েছে, সেখানে ভোটের নামে প্রহসনও মানুষ সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে৷ সাধারণ মানুষ তা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি৷ বর্তমান পত্রিকায় চারটি জেলা সংবাদদাতার কাজ করার সুবাদের রাজ্যের বেশ কিছু রাজ্যনৈতিক উত্তেজনা প্রবণ এলাকায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল৷ তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর, গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, চমকাইতলা, সবং, পিংলা, পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম, খেঁজুরি, ভগবানপুর, ময়না, তমলুক, হলদিয়া, কাঁথি, হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর, আমতা, বাগনান, হুগলির আরামবাগের মতো এলাকা৷ সেই সব এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করে একটা জিনিস স্পষ্ট যে, কলকাতার বাবুদের থেকে এরা রাজনীতিটা বেশ ভালো বোঝে৷

এরা আগাম বুঝতে পারে রাজনীতির হাওয়া কোনদিকে বইছে৷ তাই, গ্রামবাংলার মানুষকে এত বোকা ভাবাটা খুব ভুল সিদ্ধান্ত হবে৷ আর এই গ্রামবাংলার রায়েই কিন্তু ২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারকে রাজ্য থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল৷ মানুষ আর বাম নেতার ঔদ্ধত্য মেনে নিতে পারছিল না৷ মুখে বামের কথা বললেও, চুপচাপ ঘাসফুলেই ছাপ মেরেছিল৷ আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ম্যানেজারদের সব হিসেব-নিকেশ তছনছ করে দিয়েছিল৷ বামশাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে একটা পরিবতর্ন এনেছিল এই গ্রামবাংলার মানুষই৷

২০১১ থেকে ২০১৬৷ তৃণমূলের শাসন ব্যবস্থা তাও মোটামুটি মানুষের পক্ষেই ছিল৷ না হলে, সারদা-নারদ-কান্ডের পর তৃণমূল ভালো করতে পারত না৷ কিন্তু, ২০১৬ বিধানসভার পর তৃণমূলের ব্যাপক সাফল্যের তারা যেন আরও বেশি ঔদ্ধত্য হয়ে উঠে পড়েছিল৷ ধরাকে সরা জ্ঞান করতে করেছিল৷ কান পাতলেই শোনা যায়, শাসকদলের নেতার তোলাবাজি, রাতারাতি রাজসিক আচরণ প্রতিবেশি খেটে খাওয়া মানুষটির নজর এড়ায়নি৷ রাজ্যের পরিবর্তন চাওয়া মানুষটির মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল৷ মন থেকে এই শাসককে তারা মেনে নিতে পারেনি৷ ৩৪ বছরে বামশাসকের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে তৃণমূলকে যারা সরকারে এনেছিল, তারা কেউ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে জন্ম নেয়নি৷ ক্ষিপ্ত-বঞ্চিত বাম সমথর্করাই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ম্যানেজারদের শায়েস্তা করে মমতার সরকার গড়েছিল৷

সদ্য সমাপ্ত লোকসভা ভোটের ফলাফলে বিজেপির জয়জয়কারের পিছনেও কিন্তু সেই মানুষগুলির হাত রয়েছে৷ আমি আমার আগের একটা উত্তর সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, এত ভালো ফলাফলে জন্য বিজেপির এত উচ্ছ্বসিত হওয়ার কোন কারণ নেই৷ কারণ, গত আট বছরে তৃণমূলের শাসনে বিরক্ত মানুষ বিকল্প হিসেবেই পদ্মফুলের সুবাস নিয়েছে৷ এরা তারা, যারা একদিন বামদের বাংলা তাড়া করেছিল৷ লোকসভার ফলাফলের পরই আমরা দেখতে পাচ্ছি, একের পর এক তৃণনেতা পিঠ বাঁচাতে বা নিজের ব্যবসা রক্ষা করতে গায়ে গেরুয়া বসন চড়াচ্ছেন৷ মানুষ কিন্তু এটা দেখছে৷ কারা দল বদল করছেন? সেই সব রাজনেতা, যারা একদিন শাসকের সঙ্গে থেকে সাধারণ মানুষকে মানুষই বলে মনে করেনি৷ আর সেইসব নেতাতেই এখন ভরতে বিজেপির পার্টি অফিস৷

লোকসভা ভোটের ফলাফল যদি বিশ্লেষণ করা যায় তবে দেখা যাবে, উত্তরবঙ্গের ছয় জেলার রঙ প্রায় পুরোটাই গেরুয়া৷ মালদার একমাত্র আসন ছাড়া সব বিজেপির দখলে৷ ভোটের অনেক আগেই আমি আমার সহকর্মীদের কাছে বলেছিলাম, উত্তরবঙ্গে একটাও আসন তৃণমূল কংগ্রেস পাবে না৷ এমন কী উত্তর দিনাজপুরের মুসলিম অধ্যুষিত রায়গঞ্জ কেন্দ্রটিও সিপিএমের মহম্মদ সেলিম রক্ষা করতে পারবে না৷ উত্তরবঙ্গে বিজেপির এই ভালো ফলের জন্য কিন্তু, আজকে দলবদল করে আসা নেতাদের জন্য হয়নি৷ হয়েছে একটাই কারণে৷ মানুষ শাসকদলের নেতার ঔদ্ধত্য মন থেকে মেনে নিতে পারেনি৷ তাই বিজেপির এই জয় আক্ষরিক অর্থে মানুষের জয়৷ মানুষ চায়নি বলে বলেই লোকসভা ভোটে শোচনীয় পরাজয় হয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস৷

কিন্তু, গত কয়েকদিন ধরে আমরা কী দেখতে পাচ্ছে? ভোটে ফলাফলে হাওয়া বদলে যেতেই, পালের হাওয়া পেতে শুরু হয়েছে দল-বদলের খেলা৷ এলি-বেলি-তেলি-মাওয়ালি, যাকে পাচ্ছে বিজেপিতে যোগ দেওয়ানো হচ্ছে৷ বাংলার মানুষ গেরুয়া শিবিরে পক্ষে রায় দিয়ে কি এই ছবিটা দেখতে চেয়েছিল? যারা গত আট বছর মানুষকে মানুষ বলে মনে করেনি, যার প্রতিবাদে তারা বিজেপির প্রতিকি বোতাম টিপেছে, সেই সব নেতা-বিধায়ক-কর্মীরাই আবার তাদের গলা টিপে ধরতে বিজেপিতে নাম লেখাচ্ছে৷

আমি একটা বিষয় বুঝতে পারছি না, আর এস এস নিয়ন্ত্রিত বিজেপি একটি রেজিমেন্টেড পার্টি৷ সেখানে কী করে মুরি-মুরকির মতো দলত্যাগী তৃণমূল কংগ্রেস নেতা-বিধায়ক-কর্মীকে দলে যোগ দেওয়াচ্ছে৷ এই সুযোগ সন্ধানী দলত্যাগীদের একাংশের অত্যাচারে বীতশৃদ্ধ হয়েই বঙ্গবাসী বিকল্প হিসেবে বিজেপির হাত শক্ত করেছে৷ আমার মনে হয়, এই ভাবে তৃণমূল ভাঙিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়ালে, সেই শক্তি বেশিদিন স্থায়ী হবে না৷ যেমন ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে পরে কংগ্রেস ভাঙিয়ে শক্তি বাড়ানো তৃণমূল বেশিদিন ধরে রাখতে পারল না৷ তাই ‘অর্গানিক’ ভাবে গেরুয়া বাহিনির যে শক্তি তলে তলে বাড়ছিল, সেটা বেশিদিন স্থায়ী করত৷ নয়তো এই সুযোগ সন্ধানীদের দল আবার নিজের আখের গোছাতে অন্যদলে ভিড়বে৷ গত আটটি বছর যেভাবে মানুষকে অমানুষ ভেবে এসেছে, আবার সেই কম্মিটি করবে৷ বাংলার আমজনতা আবার এই বিজেপির বিমুখ হবে৷ এই প্রতিবেদনটি লেখার ঠিক শেষ মুহূর্তে আমার সংবাদকর্মী ফেসবুক বন্ধু এক লাইনের মেসেজ করে জানাল, ‘এখনই লাগাম না ধরলে, বাংলা বিজেপি শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাবে। বেনোজল আসছে…৷