দেবময় ঘোষ, কলকাতা: ক্ষয়িষ্ণু বামপন্থাকে জাগিয়ে তোলার জন্য কংগ্রেসের হাত ধরে লাভ নেই৷ বরং মানুষের মনের খোঁজ করুক বামপন্থীরা৷ মানুষের মনে আজ বামপন্থীদের জায়গা নেই৷ সেই জায়গা ফিরে পেতে জনতার দোরে পৌছে যেতে হবে৷ কোনও ‘শর্টকাট’ পথ নেই – মনে করেন প্রবীন বাম নেতা দেবব্রত বিশ্বাস৷ প্রাক্তন রাজ্যসভার সদস্য এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দেবব্রতবাবু মনে করেন, রাজনীতি কোনও পাটিগণিত মেনে চনে না৷ যাঁরা পার্টি অফিসে বসে ‘টু প্লাস টু ফোর’ করছেন তাঁরা বামফ্রন্টের সর্বনাশ করছেন৷ ‘‘তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষ বামফ্রন্টকে কেন গ্রহণযোগ্য মনে করল না? কারণ বামপন্থীরা মানুষের মনে পৌঁছতেই পারেনি৷ সহজ সত্যটা স্বীকার করি আমরা৷ মনে ব্যথা নিয়েই এই কথা আমাকে বলতে হচ্ছে৷’’

আজকালকার বামপন্থী আন্দোলন তো ‘হাঁটা আন্দোলন’ – মনে করেন দেবব্রতবাবু৷ ‘‘রাস্তায় বামপন্থীদের হাঁটতে দেখছি৷ হাঁটতে-হাঁটতেই তো ক্লান্ত হয়ে যাবে৷ পাশ থেকে তা দেখে লোকে মজা পাচ্ছে৷ যে সময়টা হাঁটার পিছনে ব্যায় করা হল, সেই সময়টাই পাড়ার রকে, বাড়ির উঠানে মিশে গেলে হতো না? মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা তো করা উচিত৷ বামপন্থীরা তা করছে না৷ একটা হতাশাজনক ভোট শেষ হতে না হতেই ভ্রান্ত আত্মসমীক্ষা শুরু হয়েছে৷ সামনে আসছে কেএমসি (কলকাতা পুরসভা’র) ভোট৷ কোনও আপাত সহজ পথ অবলম্বন করে সাফল্য আসবে না৷’’

দেবব্রতবাবু এও মনে করেন, ভাটপাড়ার ঘটনা সেকালে ঘটলে ‘জ্যোতিবাবু’র একটা স্টেটমেন্টই যথেষ্ঠ ছিল৷ গণ্ডোগোল বন্ধ হয়ে যেত৷ কিন্তু আজ কোনও বামপন্থী নেতা কলকাতায় বসে বার্তা দিলে ভাটপাড়ার গণ্ডোগোল থামবে? থামবে না৷ কারণ মানুষের মনেো বামপন্থীদের জন্য সেই সম্মান নেই৷’’ চলতি সময়ে নির্বাচন দিয়ে বামফ্রন্টকে ব্যাখ্যা করতে চাননি রাজ্যসভার এই প্রাক্তন সাংসদ৷ তার সাফ কথা, ‘‘কংগ্রেসের সঙ্গে মিলেমিশে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না৷ জিরো প্লাস জিরো জিরো-ই হবে৷’’

রাজনীতি সরলরেখায় চলে না৷ ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়েই রাজনীতির বিবর্তন এসেছে৷ ফরওয়ার ব্লকের রাজনীতি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর দেখানো পথের এগিয়ে চলেছে৷ কিন্তু দেবব্রতবাবু স্বীকার করে নেন, ‘‘আমরা সুভাষবাদী হিসাবে কাজ করতে পারিনি৷ আমরা ব্যর্থ হয়েছি৷ সে আরেক আলোচনা …৷’’

দেবব্রতবাবুর কথায়, কংগ্রেস একসময় প্রধান জাতীয়তাবাদী মঞ্চ ছিল৷ কিন্তু ৪৭ সালে স্বাধীনতার পর কংগ্রেস কেন তাদের জাতীয়য়তাবাদী ভাবধারা থেকে পিছিয়ে এলো? কেন আপএসএস-জনসঙ্ঘ ধীরে ধীরে ‘হঠাৎ জাতিয়তাবাদী’ হয়ে উঠল? চোখের সামনেই কংগ্রেস থেকে বল্লবভাই প্যাটেল যেন ‘হাইজ্যাক’ হয়ে গেল৷ গান্ধী হত্যাকারী হয়ে উঠল নায়ক৷ নেহরু-গান্ধীকে বাঁচাতেই কী বল্লবভাই প্যাটেলকে লঘু করতে হল কংগ্রেসকে? কংগ্রেস কী অস্বীকার করতে পাতে গোটা ভারতবর্ষে আরএসএসের দাপটের একমাত্র কারণ তারাই? দেবব্রত বিশ্বাস মনে করেন, ‘‘৩৪-বছর বাম শাসনে কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন ছিল না৷ কংগ্রেস ৩৫ শতাংশ ভোট পেত৷ কংগ্রেসের ভোটই তৃণমূলে গিয়েছে৷ কংগ্রেস নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেনি৷ মাঝে লুম্পেন সরকার ক্ষমতায় এসেছে৷ মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে৷’’

১৯, ২০, ২১ জুলাই দিল্লিতে ফরওয়ার্ড ব্লকের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক রয়েছে৷ দেবব্রতবাবু বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পরই আসন সমঝোতার বিষয়ে মতামত দিতে পারব৷ তবে যা বললাম, মনের বেদনা থেকে৷ বামফ্রন্ট একটা কর্মসূচি৷ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন মতামত থাকতেই পারে৷ আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, বামপন্থীরা মানুষের মন থেকে সরে গিয়েছে৷ আবার জায়গা তৈরি করতে হবে৷ কোনও ‘শর্টকাট রুট’নেই৷ মানুষের মধ্যে পৌছে যেতে হবে৷’’