সম্প্রতি শোভন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন৷ আর প্রেমের জোয়ারে ভেসেই যেন তিনি এই পদ ছেড়েছেন বলে কদিন ধরে তোলপাড় সংবাদ মাধ্যম৷ শোভনের বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁর স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায় শুধু বিরক্ত নন, দেখা গিয়েছে আদরের ভাই কাননের উপর বিরক্ত হয়েছেন খোদ মমতা৷

যা পরিস্থিতি হয়েছিল তাতে তিনি প্রেম করবেন না মেয়রগিরি করবেন সেটা বেছে নিতে বলা হয়েছিল৷ কিন্তু বান্ধবী বৈশাখীকে ছাড়তে পারবেন না বার বার সেকথা বলেছিলেন সদ্য পদত্যাগী মেয়র৷ আর সেটা তাঁর নিছক মুখের কথা নয়, শোভন তা কাজে করে দেখিয়ে দিলেন৷ পদের মোহের জন্য দ্বিধা করলেন না বরং প্রেমের জন্য এমন রাজত্বও কুরবানি দিতে পারলেন৷

অবশ্য এমন ঘটনা ব্যতিক্রমী হলেও তেমনটা যে আগে কখনও হয়নি তা নয়৷ আট দশক আগে প্রেমের জন্য রাজত্ব ছেড়েছিলেন অষ্টম এডওয়ার্ড ৷ পৃথিবীর ইতিহাসে প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন ব্রিটেনের রাজা৷ ১৯৩৬ সালের ১০ ডিসেম্বর এডওয়ার্ড সিংহাসনের মায়া ত্যাগ করে প্রেমকে জিতিয়ে প্রমাণ করেছিলেন রাজমুকুটের চেয়েও ভালবাসা বড়।

১৯৩৬ সালের ২০ জানুয়ারি এডওয়ার্ডের বাবা রাজা পঞ্চম জর্জের মৃত্যু হয়। তাঁর পুত্র রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড নাম ধারণ করে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী সিংহাসন ব্রিটিশ কমনওয়েলথ’র সিংহাসনে বসেন৷ রাজা হওয়ার অনেক আগেই অবশ্য ১৯৩১ সালের ১০ জানুয়ারি ব্রিটেনে এক পার্টিতে মার্কিন কন্যা ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে এডওয়ার্ডের পরিচয় হয়েছিল।

সেই পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে প্রেম। অন্যদিকে অত্যধিক মদ্যপানের কারণে ওয়ালিসের প্রথম স্বামী মার্কিন নৌ-বাহিনীর সদস্য লেফটেন্যান্ট আর্ল উইনফিল্ডকে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে ডিভোর্স দিয়েছিলেন ওয়ালিস। তারপরে তিনি ১৯২৮ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ-আমেরিকান জাহাজ ব্যবসায়ী আর্নেস্ট সিম্পসনকে বিয়ে করেছিলেন। অর্থাৎ এডওয়ার্ড যখন ওয়ালিসকে দেখেন তখন এই মহিলা তার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে ঘর করছেন লন্ডনে। কিন্তু ১৯৩৪ সালে যুবরাজ এডওয়ার্ডে সঙ্গে ওয়ালিসের সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হয়।

এরপর এডওয়ার্ড সিংহাসনে বসার পর ওয়ালিসরে সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি আর এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ এডওয়ার্ড আবার ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। সেক্ষেত্রে একজন মার্কিন সাধারণ পরিবারের ডিভোর্সি মেয়েকে বৃটিশ রাজ পরিবারে বিয়ের করার সিদ্ধান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ান ইংল্যান্ডের চার্চ।

প্রসঙ্গত,এই এডওয়ার্ডই ছিলেন ইংল্যান্ড চার্চের প্রধান আর এডওয়ার্ডের এমন সিদ্ধান্ত চার্চের নীতি বিরোধী।ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলে বল্ডউইনও এডওয়ার্ডের এই অন্ধ প্রেমের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। কারণ একজন ডিভোর্সি এবং দ্বিতীয় স্বামীর ঘরণী মেয়েকে রাণী হিসেবে মেনে নেবে না তার প্রশাসন।

সেই সময় ইংল্যান্ডে রাজবংশের এমন প্রেমের ঘটনা রীতিমতো গোটা দুনিয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল৷ পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রীরাও এডওয়ার্ডের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।

গুগল থেকে প্রাপ্ত ছবি ( ফাইল)

তখন প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলে বল্ডউইন রাজা এডওয়ার্ডকে তিনটি প্রস্তাব দেন৷ প্রথমত, ওয়ালিসকে বিয়ে করার চিন্তা বাদ দেয়া। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করা। তৃতীয়ত, সিংহাসন ত্যাগ করা ৷ আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই সময় রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড তৃতীয় প্রস্তাবটি বেছে নেন।

ফলে ১৯৩৬ সালের ১০ ডিসেম্বর অষ্টম এডওয়ার্ড পার্লামেন্টে ‘abdication’ সাবমিট করেন। পরের দিনই পার্লামেন্ট অষ্টম এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগ অনুমোদন করে। সিংহাসনের ছাড়ার আগে এডওয়ার্ড জানিয়েছিলেন, তিনি উপলব্ধি করেছেন- যে নারীকে তিনি ভালবাসেন তার সমর্থন ছাড়া রাজা হিসেবে রাজ্য পরিচালনার করার কঠিন দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্তের ফলাফল জেনে বুঝেই সেদিন তিনি সিদ্ধান্তটা একাই নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।

মাত্র ৩২৬ দিনের মাথায় প্রেমকে জিতিয়ে এভাবে সিংহাসন ত্যাগ করে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন অষ্টম এডওয়ার্ড। তারপরে তাঁর ছোট ভাই ষষ্ঠ জর্জ রাজা হন। আর এডওয়ার্ড ফ্রান্সে চলে যান এবং ইতিমধ্যে ওয়ালিস সিম্পসনের দ্বিতীয় বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে৷ ১৯৩৭ সালের ৩ জুন এডওয়ার্ড ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করে প্যারিসে বসবাস শুরু করেন।