সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তিনি বাংলার নবজাগরণের রূপকার। ব্রাহ্ম সমাজ এবং একেশ্বরবাদের জনক । সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেছিলেন তিনিই। তিনি রাজা রামমোহন রায়। দেশব্যাপি তাঁর প্রতিপত্তি। জীবনের ১৪টি বছর কাটিয়েছিলেন এই শহরেই। বানিয়েছিলেন শহরের বুকে এক অসাধারণ বাড়ি। সেই বাড়িও একসময় অর্থের প্রয়োজনীয়তায় তাঁকে বিক্রি করতে হয়েছিল। বাড়ি খদ্দের পেতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছিল তাঁকে।

এখন কলকাতায় একটু ঠাণ্ডা বাতাস পেতে গেলে সেই জায়গা খুঁজে পাওয়া দায় কিন্তু আজ থেকে ২০০ বছর আগে শহরে প্রচুর খালি জমি। তাই রামমোহন রায় যখন কলকাতায় বাড়ি তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তখন বেশ ভালো করে সাজিয়ে গুছিয়ে সেই বাড়ি তৈরি করেছিলেন।

কলকাতায় জায়গার অভাব ছিল না। বাড়িটি গড়ে উঠেছিল প্রায় ১৫ বিঘা জমি নিয়ে। আপার সার্কুলার রোডের উপর তৈরি করেছিলেন তাঁর বাড়ি। রামমোহনের বাড়িটি ছিল এই রাস্তার উপরেই সুকিয়া স্ট্রিটের কাছাকাছি। ১৮১৬ থেকে ১৮৩০ পর্যন্ত চোদ্দ বছর বসবাস করেছিলেন রামমোহন। বাড়িতে ছিল তিনটে পুকুর। চারপাশে বাগান আর গাছপালা।

বাড়ির দোতলায় রামমোহন নিজে থাকতেন। গান, বাজনা, আলোচনাসভা সবমিলিয়ে প্রাণচঞ্চল থাকত রামমোহনের কলকাতার বসত বাড়ি। এক কথায় বলা যেতে পারে উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ধারক ছিল এই বাড়ি।

ব্রিটিশ পর্যটক ফ্যানি পার্কস এই বাড়ির সম্বন্ধে ব্যখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, ” The house was very handsomely furnished, everything in European style, with the exception of the owner.”। সুদূর ওয়েলস থেকে ভারতে এসেছিলেন। ভারতের বহু রাজা , জমিদারের বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কলকাতার ‘৯৩, আপার সার্কুলার রোড’ ঠিকানার এই বাগানবাড়ির ব্যাপারস্যাপারই আলাদা।

চমকে গিয়েছিলেন ফ্যানি। নিকি নামে তৎকালীন বিখ্যাত নর্তকী সেই বাড়িতে তাঁর নৃত্যশৈলী প্রদর্শন করত। কয়েক ঘন্টার নাচের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ছিল এক হাজার টাকা। সেই সময় হাজার টাকা মানে আজকের জুগে লাখ টাকার বেশী তো কম নয়। রামমোহনের যশ এবং প্রতিপত্তির প্রমাণ এইসব ইতিহাস থেকেই মেলে।

এমন রাজকীয় বাসভবনও বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল রামমোহনকে, । তখন তাঁর ইংল্যান্ডে পাড়ি দেওয়ার কথা। তাই বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিলেত যাবেন টাকারও প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি বাড়িটি বিক্রি করে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় বাড়ি বিক্রির সেই বিজ্ঞাপন তিনি দিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল ,“৯ই জানুয়ারি ১৮৩০/২৭ পৌষ ১২৩৬৷ ইশতেহার – স্থাবরধন পাবলিকসেলে অর্থাৎ নীলামে বিক্রয় হইবেক ।

সন ১৮৩০ সালে আগামি ২১শে জানুয়ারি বৃহস্পতিবার টালা কোম্পানির সাহেবরা তাহাদের নীলামঘরে নীচের লিখিত স্থাবরধন পাবলিক অক্সেন অর্থাৎ নীলাম করিবেন বিশেষতঃ আপার সার্কুলার রোড সিমলার মানিকতলাস্থিত বাটী ও বাগান যাহাতে এক্ষণে বাবু রামমোহন রায় বাস করেন । ঐ বাটির উপরে তিন বড় হাল অর্থাৎ দালান ছয় কামরা দুই বারান্দা ও নীচের তলায় অনেক কুটরী আছে এবং ঐ বাটীর অন্তঃপাতি গুদাম ও বাবুর্চিখানা ও আস্তাবল প্রভৃতি আছে । এবং ১৫ বিঘা জমির এক বাগান ও বাগানে অতিউত্তম সমভূমি ও পাকা রাস্তা ও তাহাতে নানাবিধ ফলের গাছ ও তিনটা পুষ্করিণী আছে।

ওই বাগানে কলিকাতার সীমার মধ্যস্থ গভর্নমেন্ট হাউস হইতে গাড়িতে বিংশ মিনিটে পৌঁছন যায় । ঐ বাটি ও ভূমির চতুঃসীমা এই বিশেষতঃ উত্তরদিগে গদাধর মিত্রের বাগান দক্ষিণদিগে সুকেশের স্ট্রীট নামে রাস্তা পূর্বদিগে সার্কুলার রোড নামে সড়ক এবং পশ্চিমে ও উত্তরপশ্চিমে রূপনারায়ণ মল্লিকের বাগান । ঐ বাটী ও বাগান যিনি দেখিতে চাহেন তাঁহার দেখিবার কিছু বাধা নাই।”

বাড়ি বিক্রি করতে মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল রামমোহনের। এদিকে বিলেত যাওয়ার সময় এগিয়ে আসছে, হাতে টাকার প্রয়োজন। বাড়ি বিক্রি হয় না। এই বাড়ি বিক্রি কাণ্ডের তথ্য মেলে কলিকাতা দর্পণ’ পত্রিকাতেই বিপ্লবী রাধারমণ লেখায়। বিজ্ঞাপন প্রকাশের বেশ কিছুকাল পরে এক আর্মেনিয়ান এক ব্যক্তি বাড়িটি কেনেন। সরকার বাড়িটি ভাড়া নেয় আরও অনেক পরে।

কলকাতা পুলিশের সঙ্গে এ বাড়ির যোগসূত্র ১৮৭৪ সাল থেকে। সুকিয়া স্ট্রিট থানার কাজকর্মের জন্য ভাড়া নেওয়া হয় বাড়িটি।ভাড়াবাড়িতেই থানার কাজ চলেছিল বেশ কিছুদিন। ১৯১৮ সালের পয়লা এপ্রিল তদানীন্তন সরকার বাড়িটিকে কিনেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময়ে দাম পড়েছিল ১৫,৯০৯ টাকা। ঠিকানা ততদিনে বদলে গিয়ে হয়েছে ১১৩,আপার সার্কুলার রোড। আরও বছর দশেক পরে, ১৯২৮ সালে সুকিয়া স্ট্রিট থানা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। নামও বদলে হয় আমহার্স্ট স্ট্রিট।

তবে মাঝে অনেকটা সময় এই বাড়ি সেই পুলিশের কার্যালয় হিসাবেই ব্যবহৃত হত। নয়ের দশকের শুরুর দিকে বাড়ির জরাজীর্ণ হয়ে যায়। বাড়ি সংস্কার এবং সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয় কলকাতা পুলিশ। পুলিশেরই সংগ্রহশালা নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রামমোহনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি কলকাতা পুলিশের সংগ্রহশালা রূপে আত্মপ্রকাশ ১৯৯৬ সালে।

রামমোহন রায়ের দ্বিশতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক বাড়ি। যার চার দেওয়ালের মধ্যে এখন একত্রে বসবাস বহু নথির, ইতিহাসের অচেনা-অদেখা নানা সম্ভারের। রয়েছে আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার অস্ত্রশস্ত্র-বোমা-গুলি। তৎকালীন চিফ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যা করার জন্য বিপ্লবীরা তৈরি করেছিলেন যে বইবোমা, সেটিও রয়েছে সংরক্ষিত।

১৯৪৭ সালে দাঙ্গার সময় মহাত্মা গান্ধীর অনুরোধে তাঁর কাছে জনসাধারণ কর্তৃক সমর্পণ করা অস্ত্রশস্ত্র আছে এখানে, আছে ১৯১০ সালের ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার নথি। রয়েছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের তৎপরতায় উদ্ধার করা প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য মূর্তি কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতার বুকে জাপানিদের ছোড়া বোমার খালি খোলও।
তথ্যসূত্র – কলকাতা পুলিশ