মানব গুহ, কলকাতা: ১১ ই জুন৷ ২৭ বছর আগে ঠিক আজকের দিনেই ভারতে শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত ও হাস্যকর বিচারব্যবস্থা৷ সেদিনটা ছিল ১১ ই জুন, ১৯৯১৷ একটি নয় ভোল্টের ব্যাটারি কিনে সেদিন থেকেই অন্ধকার জীবনে তামিলনাড়ুর পেরারিভালান৷ ২৭ বছর পরেও তার মুক্ত জীবনের আশায় পথ চেয়ে তার মা৷

পেরারিভালান, ডাকনাম আরিভু৷ ২৭ বছর জেলের জেলের কালকুঠিতে কাটানোর পর তামিলনাড়ুর ঘরে ঘরে এখন পৌঁছে গেছে তাঁর নাম৷ ২১ মে ১৯৯১, তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুরে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে মারা যান কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী৷ রহস্য সন্ধানে রাজ্য জুড়ে শুরু হয় পুলিশ ধরপাকড় ও পরে সিবিআই তদন্ত৷

সেই তদন্তের সূত্রেই, ১৯৯১ সালের ১১ জুন মা নিজেই ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন রাজীব-হত্যার তদন্তকারী বিশেষ দলের কাছে। তার পর ভেলোর জেলের বিশেষ সেলে কিছু মুহূর্ত ছাড়া আর তাঁর দেখা পান নি পেরারিভালানের মা আরাপুথাম। অভিযোগ ছিল, একটি নয় ভোল্টের ব্যাটারি কিনেছিল ১৯ বছরের তরুণ পেরারিভালান৷ আর সেই ব্যাটারিই নাকি ব্যবহৃত হয়েছিল রাজীব গান্ধীকে হত্যা করতে আত্মঘাতী বোমার মধ্যে৷

জীবনে জন্ম থেকে যতদিন জেলের বাইরে ছিলেন তার চেয়েও ৮ বছর বেশি জেলের ভিতরে আছেন৷ ১৯ বছর বয়সে জেলে গিয়েছিলেন৷ ২৭ বছর অন্ধকারে থেকে আজ ৪৬ বছর বয়সেও জেলের অন্ধকারে পেরারিভেলান৷ অপরাধ মারাত্মক৷ যদিও জিজ্ঞাসাবাদ, প্রমাণপত্র সব নিয়েই ২৭ বছর ধরে রয়েছে অজস্র ফাঁক ফোকড়৷

১৯৯১ সালের ১১ ই জুন, তাঁর বাবা মা তাকে পাঠিয়েছিলেন বিশেষ তদন্তকারী দলের কাছে৷ কথা ছিল, দু চারটে প্রশ্ন করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে৷ তারপর, কেটে গেছে ২৭ বছর৷ ছাড়া পান নি পেরারিভালান৷ রাজীব গান্ধী হত্যায় তাঁর মৃত্যুদন্ড হয়েছিল৷ পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়৷

তারপর থেকে পেরারিভালান জেলের অন্ধকারে৷ কিন্তু তাতে হতাশ হননি ৬৭ বছরের ওই মহিলা। নানা মঞ্চে কেবল পেরারিভালান নয়, সব ফাঁসির আসামির সাজা মকুবের আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। চেন্নাই বই মেলাতেও স্টল নিয়ে মৃত্যুদণ্ড মকুবের পক্ষে বই, ডিভিডি বিলি করেছেন। ২৭ বছর ধরে পেরারিভালানের পরিবার তাঁর মুক্তির জন্য সমস্ত দরজায় কড়া নেড়েছেন এখনও নেড়ে চলেছেন৷

এই বিশ্বাসে এখনও লড়ে যাচ্ছেন তাঁরা, যে রাজীব গান্ধী হত্যা নিয়ে পেরারিভালানের কোন হাত নেই৷ কি অভিযোগ ছিল পেরারিভালানের বিরুদ্ধে? অভিযোগ পেরারিভালান একটি নয় ভোল্টের ব্যাটারি কিনেছিলেন যেটা রাজীব গান্ধী হত্যার যুক্ত আত্মঘাতী বোমার ডিটোনেটরে ব্যবহার করা হয়েছিল৷

নয় ভোল্টের ব্যাটারি, খুব সহজেই প্রায় সমস্ত দোকানেই পাওয়া যায়৷ অদ্ভুত এটাই, অভিযোগকারী দোকানদার একটা ব্যাটারি কেনার জন্য পেরারিভালানকে কয়েক মাস পরেও ঠিক মনে রাখল৷ অদ্ধুত ব্যাপার এটাই যে, সিবিআই ১৯ বছরের পেরারিভালানের পকেট থেকে একটা ছোট ব্যাটারি কেনার রসিদও পেল ঘটনার কয়েক মাস পর৷

অভিযোগ ছিল, ফাঁকা কাগজে জোর করে মারধর করে ১৯ বছরের ছেলেকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হয় এই হত্যাকান্ডে তাঁর জড়িয়ে থাকার কথা৷ তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হয়, সেই ব্যাটারি কিনে তা তুলে দিয়েছিল রাজীব গান্ধী হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড শিবরাসানের কাছে৷ আর এই স্বীকারোক্তি দেখেই পেরারিভালানকে মুত্যুদন্ড দেওয়া হয় বাকি অভিযুক্তদের সঙ্গেই৷

২৬ বছর পর ২০১৭ র ২৭ অক্টোবর, এই ঘটনায় বয়ান নেওয়া অফিসার ভি, থিয়াগারাজন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছেন তিনি একটা লাইন জিজ্ঞাসাবাদ থেকে বাদ দিয়েছিলেন৷ সেই লাইনটা হল, পেরারিভালান জানিয়েছিলেন, ‘এই ব্যাটারি কি কাজে ব্যবহার করা হবে তা তিনি জানতেনই না’৷

আর সুপ্রিম কোর্টে প্রমাণও হয়ে যায়, এই লাইনটা থাকলে রাজীব গান্ধী হত্যাকান্ডে নামই জড়াত না পেরারিভালানের? ১৯৯১ সালে হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড শিবারাসন এলটিটিই জঙ্গীদের জানান, তিনি, শুভা আর ধানু ছাড়া কেউই তাদের পরিকল্পনা নিয়ে কিছুই জানতো না৷ এত কিছু প্রমাণ হবার পরও ছাড়া পান নি পেরারিভালান৷

শুধুমাত্র একটা ১৯ বছরের ছেলের কাছ থেকে জোর করে লিখিয়ে নেওয়া জবানবন্দী দিয়েই মৃত্যদন্ড দেওয়া হয় পেরারিভালানকে৷ অনেকবার তাঁর ফাঁসির দিন ঠিক হয়৷ তারপর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়৷ সবকিছু প্রমাণ হয়ে যাবার পরও এখনও ভুল বিচারে গারদের অন্ধকারে পেরারিভালান৷

বারবার ফাঁসির আদেশ হয়েছে৷ যে কোনদিন ফাঁসির দড়ি গলায় পরে ঝুলতে হত তাঁকে৷ তবু, নিজের সাহসীকতা হারান নি৷ ২৭ বছর পর আজও হাসিমুখে পেরারিভালান৷ মৃত্যুর মুখেও বেড়েছে দৃঢ়তা৷ ২৭ বছর গারদের অন্ধকারও তাঁর মুখ থেকে হাসি কাড়তে পাড়ে নি৷

তামিলনাড়ুর জোলারপেট এ সামান্য স্কুল শিক্ষকের ছেলে রাজীব গান্ধী হত্যা কান্ডে জড়িত, একটা পরিবারকে ভেঙে গুড়িয়ে দেবার পক্ষে এটাই ছিল যথেষ্ট৷ কিন্তু নিজেও ভেঙে পরেন নি, পরিবারকেও পরতে দেন নি পেরারিভালান৷

জেলে বসেই প্রায় ৯২ শতাংশ নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সে৷ তামিলনাড়ু ওপেন ইউনিভারসিটি থেকে গোল্ড মেডেল নিয়ে ডিপ্লোমা কোর্স পাশ করে পেরারিভালান৷ কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে মাস্টার ডিগ্রী করে সে জেলের অন্ধকারে বসেই৷ শুধু তাই নয়, জেলের পরিক্ষার্থীদের টিউশন দেয় সে৷ এরপরেও সে একটা নিউজিক ব্যান্ড চালায় জেলের মধ্যে৷

তার নামে আছে পেরারিভালান এডুকেশন্যাল ট্রাস্ট৷ পেরারিভালানের মা আরপুথামও ছেলের জন্য যা লড়ছেন তাও তামিলনাড়ু ছাড়িয়ে গোটা দেশের পক্ষে একটা গৌরবজনক অধ্যায়৷ ৭১ বছর বয়সেও ছেলের মুক্তির জন্য লড়ে চলেছেন৷ জেল, আদালত, উকিলের চেম্বার করে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের ২৭ টি বছর৷

মা আরপুথাম এখন তামিলনাড়ুর একটা মুখ৷ লড়াইয়ের মুখ হিসাবে পেরারিভালান ও আরপুথামের নাম এখন তামিলনাড়ুর বাড়িতে বাড়িতে৷ ভারতীয় আইন কি এতবছর পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে৷ মা ও ছেলে আইনের পথে লড়েই কি জয়ী হতে পারবে? এমন আরও অনেক প্রশ্ন নিয়ে ২৭ টা বছর পার হয়ে যাবার পর আর কটা ১১ ই জুন আসবে সেটাই এখন দেখার৷