কলকাতা: ‘সুর তো ফকির, চলে ধুলোপায়ে গ্রাম থেকে গ্রামে’- সুরের তাই কোনও দেশ হয় না৷ মানুষ থেকে মানুষে সে মাধুকরী করে ফেরে মুগ্ধতা৷ আর বিলিয়ে দেয় আনন্দ৷ তাই সুরের ভূমিতে অনায়াসে মিশে যেতে পারে কলকাতা ও কানাডা৷ লোকসুরের মেলবন্ধনে দুই দেশ এক হতে চলেছে কলকাতার মাটিতেই৷ আয়োজনে- ‘সুরজিৎ ও বন্ধুরা’৷ তাঁদের সঙ্গে পারফর্ম করবেন কানাডার ‘মোজেইক’ ব্যান্ডের সদস্যরা৷ লোকসুরের এই আন্তর্জাতিক আসর বসবে ১০ জানুয়ারী, দেশপ্রিয় পার্কে৷ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুই ব্যান্ডের সম্পর্কে আরও খুঁটিনাটি জানালেন সঙ্গীতশিল্পী সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়

‘মোজেইক’-এর সঙ্গে তোমার যোগাযোগ কবে থেকে?
সুরজিৎ: সেই ২০০৬ সাল থেকে৷ আমি কানাডায় গিয়েছিলাম পারফর্ম করতে৷ তখন থেকেই যোগাযোগ৷ ‘মোজেইকে’র ৮ জনের মধ্যে একমাত্র বাঙালি সদস্য জয়ন্ত ঘোষ৷ সেবারের পর থেকে বহুবার ওদের সঙ্গে নানা জায়গায় অনুষ্ঠান করেছি৷ ২০০৮ সালে ‘ভূমি’ যখন কানাডায় যায়, তখনও আমরা একসঙ্গে অনুষ্ঠান করেছি৷ তারপর গতবছর আমি যখন আবার কানাডায় গেলাম, তখনই ভাবনাটা এসেছিল যে ভারতের মাটিতে যদি একসঙ্গে কিছু করা যায়৷ সেই ভাবনাই এ বছর সত্যি হতে চলেছে৷ ১০ জানুয়ারী দেশপ্রিয় পার্কে ‘সুরজিৎ ও বন্ধুরা’, ‘মোজেইক’ ও কার্তিক দাস বাউল একসঙ্গে একসঙ্গে পারফর্ম করবে৷ ওদের দেশের লোকসঙ্গীতের সুর, কার্তিক দাসের বাউল আর আমি কনটোমপোরারি ফোক গাই৷ এই তিনের সম্মিলন এক আসরে৷ এরকম আন্তর্জাতিক লোকগানের আসর আগে হয়েছে বলে আমি তো জানি না৷ মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার অনোক সহযোগিতা করেছেন যাতে এই অনুষ্ঠানটা হতে পারে৷

দুই দেশের ভাষা তো আলাদা৷ একসঙ্গে এরকম একটা কাজ করতে গিয়ে কোনও অসুবিধে হয়নি?
সুরজিৎ: না, কাজ করার সময় দেখেছি সঙ্গীতে ভাষাটা কোন ব্যারিয়ারই নয়৷ ‘মোজেইক’-এর এক সদস্যকে যখন আমি ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গেয়ে শোনালাম, দেখলাম ও কেঁদে ফেলেছে৷ অথচ ও তো ভাষাটা জানে না৷ এটাই সঙ্গীতের শক্তি৷ কানাডাতেও যখন পারফর্ম করেছি তখন ক’জনই বা বাঙালি শ্রোতা থাকতেন৷ তবু ‘ময়না রে’ বা ‘বারান্দায় রদ্দুর’ যখন গেয়েছি, তখন ওঁরা আপ্লুত হয়েছেন৷ হাততালি দিয়েছেন৷ সুর, সঙ্গীতের সত্যিই কোনও দেশ হয় না৷

তোমার নিজের কাজে কানাডার লোকসুরের কোনও প্রভাব কি পড়ছে?
সুরজিৎ: প্রভাব বলতে, কনসাশলি কিছু করছি না৷ মানে কানাডার একটা লোকগানকে বাংলায় অনুবাদ করা বা গাওয়া এরকম কিছু করছি না৷ তবে সুর তো ভিতরে থেকে যায়৷ সেভাবে যদি কখনও কিছু হয় তো হবে৷ তবে প্রভাব যদি বলো, তবে একটা ঘটনায় আমি খুবই মুভড৷ ‘মোজেইক’-এর একজন সদস্য ওভিড, ও জন্মান্ধ৷ কিন্তু অসাধারণ গিটার বাজায়৷ ২১ বছর মাত্র বয়স,নানা ধরনের বাজনা বাজাতে পারে৷ ম্যান্ডোলিন থেকে ট্রাম্পেড সব বাজাতে পারে৷ আর এতও নিপুণ বাজায় যে চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবে না কেউ৷ আমি নিজেও নানা ইনস্ট্রুমেন্ট বাজাতে ভালোবাসি৷ ওভিডের এই দক্ষতা আমাকে দারুণ নাড়া দিয়েছে৷ আসলে ব্যান্ডের প্রত্যেক সদস্যই অসম্ভব ট্যালেন্টেড মিউজিসিয়ান৷

দুই ব্যান্ড মিলে অ্যালবামের কোনও পরিকল্পনা আছে?
সুরজিৎ: একটা অ্যালবামের কাজ অলরেডি চলছে৷ এই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির মাঝেই রেকর্ডিংয়ের কাজ এগোচ্ছে৷ ‘ময়না রে’ গানটা মোজেইকের এক সদস্যকে শিখিয়েছি৷ শুধু সুর নয়, একেবারে মানে বুঝিয়েই৷

কী নাম হবে অ্যালবামের?
সুরজিৎ: এখনও ঠিক করা হয়নি৷ তবে ‘ময়না রে’ নামটাই রাখা যায় কি না, তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছে৷

‘সুরজিৎ ও বন্ধুরা’র পক্ষ থেকে এবারের বইমেলায় কি প্ল্যান?
সুরজিৎ: এবার বইমেলায় একটা অনুগল্পের বই বেরোচ্ছে৷ এটা আমাদের চতুর্থ বই৷ অনেক নতুন লেখক-লেখিকার গল্প আছে৷ আর খুব আনন্দের যে, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় আমাদের একটা অনুগল্প লিখে দিয়েছেন৷ তাঁর গল্প দিয়েই বই শুরু হবে৷ পত্রভারতী থেকে বেরোবে বইটি৷

গান-গল্প-কবিতা নানাদিকে থেকে ‘সুরজিৎ ও বন্ধুরা’-কে অন্যরকম একটা প্ল্যাটফর্ম করে তোলাই কি তোমার লক্ষ্য?
সুরজিৎ: একটা ফেসবুক পেজ থেক শুরু হয়েছিল৷ কবিতা ক্লাব হল৷ কতজন লিখতেন৷ নতুনরা লিখত৷ অনেকে আবার চাকরি-বাকরি সামলে এসে লেখালেখি করতেন৷ তারপর একদিন মনে হল, এত লেখা সংরক্ষণ করা উচিত৷ নচেৎ যে কোনওদিন হারিয়ে যেতে পারে৷ সেই ভাবনা থেকেই বই প্রকাশ করা৷ সম্প্রতি অনুগল্পের পর পরমানু গল্প নিয়েও সকলে দারুণ উৎসাহ দেখালেন৷ অনেকে পার্টিসিপেট করল৷ পত্রভারতীর ত্রিদিবদা তো বলছেন, পরমানু গল্প নিয়ে পরেরবার বইমেলায় একটা বই করবেন৷ এভাবেই একটু একটু করে এগোচ্ছে৷ আমি নিজের কাজের মধ্যে যতটা পারি সময় দিই৷ তাছাড়া ‘সুরজিৎ ও বন্ধুরা’র কাজকম্মের পিছনে ডেডিকেটেড একটা টিম আছে৷ তাঁরা কুব আনন্দের সঙ্গে কাজগুলো করেন৷ একটা কথা বলতে পারি. আমাদের রোজগার না থাক, অফুরন্ত আবেগ আছে৷ ভালোবাসাই ‘সুরজিৎ ও বন্ধু’দের বড় মূলধন৷

সাক্ষাৎকার: সরোজ দরবার  ৷৷ কলকাতা24×7