পূজা মণ্ডল: লোকে বলে কোলকাতা স্বপ্নের শহর। চোখে স্বপ্ন নিয়ে এ শহরের বুকে ভিড় করে রোজ বহু মানুষ। লোকমুখে আবার এ কথাও শোনা যায়, এ শহর যার স্বপ্ন পূরণ করে সে পায় দুহাত ভরে, আবার যার করে না তার কাছে সব কেড়ে নেয়। এ কথা শুনেও রোজ স্বপ্ন উড়ানে ভর করে শয়েশয়ে মানুষ হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে আসেন স্বপ্ন কিনতে।

তেমনই আজ থেকে ৪০ বছর আগে স্বপ্ন বুকে নিয়ে এক বাঁশিওয়ালা পাড়ি দিয়েছিলেন মায়ানগর-মহানগর। বর্ধমানের মন্তেশ্বর থেকে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে গঙ্গা পেরিয়েছিলেন বাঁশিওয়ালা অনিলবাবু। আজ বয়স ষাট ছুঁয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হয় নি। এমনকি এই বিরাট কলকাতার বুকে এক চিলতে বাসস্থানটুকু জুটিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যও হয় নি।

তবুও এই দীর্ঘ ৪০ বছর কলকাতার যাদুঘরের পাশে বাঁশি বাজিয়ে চলেছেন তিনি। চল্লিশটা বছর কলকাতার বুকে ভেসেছে তাঁর সুর, জোটেনি পরিচিতি। সুরের নেশায় এই বয়সেও কলকাতায় বাঁশি বাজিয়ে ফেরেন তিনি। বয়স হয়েছে, তাই এখন আর রোজ হয়ে ওঠে না। কিন্তু এখনও সপ্তাহে অন্তত তিন দিন কলকাতার যাদুঘরের পাশে দেখা মেলে বাঁশিওয়ালা অনিল মাহাতোর। বর্ধমান থেকে সপ্তাহে অন্তত দুদিন আসেন কলকাতায়। আশ্রয় নেই, তাই রাতটুকু খোলা আকাশের নিচেই কাটাতে হয় অনিল বাঁশিওয়ালাকে।

শুরুটা হয়েছিল ছেলেবেলায়। যখন অনিল যাত্রাদলে ছোটদের চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তখনই যাত্রাদলের সমস্ত বাজনার মধ্যে অনিল বাবুর মন কেড়ে নেয় বাঁশির ধুন। যাত্রাদলের বাঁশি কাকুর কাছেই শিখতে শুরু করেন বাঁশি। তারপর বিভিন্ন পেশাদার শিল্পির কাছে তালিম নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর নিজের পেশাদার হয়ে ওঠা হয় নি। মন্তেশ্বরে কিছু জমিজমা আছে। সেখান থেকে কিছুটা আয় হয়।

তবে বাঁশি তার রোজগারের মাধ্যম হয়ে ওঠে নি কোনকালেই। সংসার আছে। আছেন স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ছেলের বৌ, নাতি সকলেই। কিন্তু সংসার তাঁকে বেঁধে রাখতে পারে নি। অনিল বাবুর কথায়, “আমায় বলে আর কি করবে! ওরা বুঝে গেছে বাঁশিই আমার সব।“

কলকাতার যাদুঘরের পাশেই দেখা মেলে অনিল মাহাতোর। ভর দুপুরে যার বাঁশির সুর তৃষ্ণা মেটায় ক্লান্ত পথিকের। বাঁশির যাদুতে যাদুঘরের পাশে ভিড় জমে যায় শ্রোতাদের। অনিলবাবুর ঝোলায় থাকে হরেকরকম বাঁশি। কোনটার দাম ১০০, তো কোনটার আবার ২৫০, ৬০০ টাকার বাঁশিও আছে। বাঁশি শুনে হৃদয় মজলে কেউ দর করে ঘরে নিয়ে যান বাঁশি। অনিলও যত্ন করে শিখিয়ে দেন বাঁশি বাজানোর প্রাথমিক ধাপগুলি।

বাঁশির সুরে মন ভরিয়ে মনে সেই রেশ সঙ্গী করে ঘরে ফিরে যান পথিকরা। আর খোলা আকাশের নিচে অনিলের বাঁশি বাজতে থাকে, সুর উঠতে থাকে “যদি আরও কারে ভালোবাসো যদি আরও ফিরে নাহি আসো তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো……