কিছুদিন আগে এই পোর্টালে চিয়া বীজ নিয়ে আমার প্রতিবেদনের পর অনেকেই প্রশ্ন করেছেন যে এই চিয়া বীজ আর flax seed কি এক? দুটোর উপকারিতা কি এক? আপনাদের এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য আজ আমি এই তিসির বীজ বা flax seed নিয়ে কিছু কথা বলব।

নিউট্রিশনিস্ট অঙ্কিতা সাহা।

তিসি বা “Linseed/Flax seed” আদতে একই জিনিস। এই বীজ থেকে নিষ্কাশিত তেল হল তিসির তেল বা linseed oil, আমরা বাঙ্গালীরা এর সাথে পরিচিত। এর তন্তু থেকে তৈরি জামাকাপড়ই আজ লিনেন (linen) নামে বহুল প্রচলিত। আর ইদানীং কালে এই বীজ Super food হিসেবেও প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এর কারণ হল, এই বীজ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। আসুন দেখে নিই, কি কি পুষ্টি উপাদান আছে এই বীজটিতে।

১. প্রতি ১০০ গ্রাম এই বীজ থেকে আমরা ৫৩৪ কিলো ক্যালরি শক্তি বা এনার্জি পাই। অর্থাৎ, প্রতি ১০ গ্রামে বা এক টেবিল চামচে পাই প্রায় ৫৫ কিলো ক্যালরি এনার্জি।

২. প্রতি ১০ গ্রাম চিয়া বীজে থাকে প্রায় ২ গ্রাম প্রোটিন, ৪ গ্রাম ফ্যাট (যার ৭৩% হল PUFA বা পলি আন-স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, ২৭% MUFA বা মনো আন-স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, আর বাকিটা স্যাচুরেটেড ফ্যাট) এবং ৩ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট (যার মধ্যে ২.৮ গ্রামই হল তন্তু বা fibre)। অর্থাৎ বলা যেতে পারে যে, ৩ গ্রাম কার্বোহাইড্রেটের পুরোটাই fibre। এই কারণেই এটি স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের কাছে এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

৩. এতে উপস্থিত মোট ফাইবারের ২০-৪০% হল মিউসিলেজ জাতীয় সলিউবল ফাইবার যা রক্তে শর্করার মাত্রা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি আমাদের অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটিরিয়ার মাত্রা ঠিক রাখে ও আমাদের হজমশক্তি বাড়ায়।

৪. প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকার কারণে এই flax seed ওয়েট লস ডায়েটের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫. এই মিউসিলেজ জাতীয় ফাইবার জলের সাথে মিশে খুব থকথকে জেলে পরিণত হয় যা flax seed এ উপস্থিত ৬০%-৮০% ইনসলিউবল ফাইবার এর সাথে মিশে ন্যাচারাল ল্যাক্সেটিভের কাজ করে ও কন্সটিপেশনের সমস্যা দূর করে।

৬. Flax seed এর ১৮% প্রোটিন, এবং এই প্রোটিন সয়াবিনের প্রোটিনের সমতুল্য। এতে আর্জিনিন ও গ্লটামিনের মত অ্যামাইনো অ্যাসিড প্রচুর পরিমাণে রয়েছে যা আমাদের হার্ট ভালো রাখতে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

৭. এছাড়া এই বীজে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে আলফা লিনলেনিক অ্যাসিড যা বিভিন্ন ক্রনিক রোগ সারাতে সক্ষম।

৮. এতে উপস্থিত লিগন্যান (এক ধরণের পলিফেনল) antioxidant হিসেবে কাজ করে যা ব্লাড প্রেশার, বিভিন্ন ধরণের কান্সার (প্রস্টেট ক্যান্সার, ইউটেরাইন ক্যান্সার, স্তনের ক্যান্সার) প্রতিরোধে গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এটি স্ট্রেস ও কমায়।

১০. এছাড়াও এতে রয়েছে ভিটামিন বি১, ম্যাগনেসিয়াম, কপার, ফসফরাস প্রভৃতি গুরুত্ব পূর্ণ পুষ্টি উপাদান।

কীভাবে খাবেন এই তিসির বীজ বা flax seed-

যে কোন স্যালাড, স্যুপ বা স্যান্ডুইচের ওপরে এই বীজ গুড়ো করে ছড়িয়ে খাওয়া যেতে পারে। অথবা সকালের ব্রেকফাস্টে টক দই ও অন্যান্য ব্রেকফাস্ট সিরিয়ালের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। কোন ভাজাভুজির ক্ষেত্রে চিরাচরিত বিস্কুটের গুড়োর বদলে এই বীজের গুড়ো ব্যবহার করা যায়। যদি কোনও রান্নায় আপনি ডিমের ব্যাটার ব্যবহার করতে চান, ডিমের বদলে ২ টেবিল চামচ এই flax seed গুঁড়ো ২ টেবিল চামচ জলের সাথে মিশিয়ে সহজেই ব্যবহার করা যায়।

আপনারা ভাবতে পারেন যে, গোটা বীজ না খেয়ে আমি কেন বারবার এই বীজ গুঁড়ো করে খেতে বলছি। এর কারণ হল, এর মধ্যে যে আলফা লিনলেনিক অ্যাসিড রয়েছে তা এই বীজের শক্ত খোলের মধ্যে বদ্ধ থাকে। তাই গুঁড়ো না করে নিলে এই পুষ্টি উপাদানটি আমাদের শরীর ব্যবহার করতে পারে না। টি এই বীজ গোটা খেয়ে কোনও লাভ হয় না।তাই বাজার থেকে কিনে এনে এই বীজ বাড়িতে গুঁড়ো করে রাখুন এবং খাবারের সাথে মিশিয়ে খান।

কিন্তু আমি বারবার যেমন বলি, যে কোনও এক ধরণের খাবারের ওপরই নির্ভরশীল না হতে, সেরকম এই ক্ষেত্রেও বলব অন্য খাবার বাদ দিয়ে শুধু এই বীজই খেলে হবে না, রোজকার সুষম খাবারের সাথে মিশিয়ে flax seed খেতে হবে। নিজের পুষ্টিবিদের সাথে কথা বলে তবেই এটিকে আপনার ডায়েটে রাখুন। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV