প্রসেনজিৎ চৌধুরী: হিসেবটা সেই ৩৪ বছরের। পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে এই ৩৪ বছর এখন বিরাট চালু শব্দ। কথায় কথায় উপমাটি ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণে। গঙ্গার পারে তখন জ্যোতিবাবুর নেতৃত্বে বামেদের শাসনের ভিত প্রবল শক্ত। আর পদ্মাপারে অন্য ছবি- বাংলাদেশে চলছিল হুসেন মহম্মদ এরশাদের একনায়ক শাসনতন্ত্র।

এই ৩৪ বছরে গঙ্গা-পদ্মা সমান তালে বয়ে চলেছে। সেটা ১৯৮৫ সালের কথা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে সর্বশেষ কলকাতায় মুখোমুখি হয় ভারত ও বাংলাদেশ। সেই ম্যাচেও ছিল প্রবল উন্মাদনা। হই হই কাণ্ড। ম্যাচে ২-১ গোলে পরাজিত হয় ঢাকাইয়ারা। ফুটবলের মক্কা কলকাতায় নিজেদের সম্মান ধরে রাখে ভারত।

৩৪ বছর পর আবার সেই একই লড়াই। কাতার বিশ্বকাপে যোগ্যতা নির্ণয় ম্যাচে যুব ভারতীতে মুখোমুখি দুই দেশ। জানা যাচ্ছে ম্যাচটির ৬০ হাজার টিকিট বিক্রি। একেবারে সুপারহিট অবস্থা।
স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনায় ফুটছেন সবাই।

ঢাকাইয়া-কলকাত্তাইয়াদের মধ্যে যাঁদের নাড়ির টান রয়ে গিয়েছে সীমান্তের ওপারে, তাঁদের বুক দুরুদুরু। কারণটা এনআরসি ইস্যু। সেসব নিয়েই ফুটবলের রণভূমিতে আজ সোল্লাসে গলা মিলবে জন গণ মন…আমার সোনার বাংলা…

ম্যাচটি নিয়ে দুই দেশের কোচই সিরিয়াস। ভারত ও বাংলাদেশ আগেই অন্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে দুটি করে ম্যাচ খেলে নিয়েছে। পয়েন্ট টেবিলে ভারতের সংগ্রহ ১ ও বাংলাদেশের সংগ্রহ শূন্য।

আগামী বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হবে কাতারে। আর আয়োজক দেশকেই তাদের ঘরের মাটিতে রুখে দিয়ে ভারত পরের রাউন্ডে কোয়ালিফাই করার আশা রেখেছে। অন্যদিকে ঢাকাতেই ঘাম ঝরানো লড়াইয়ের পরেও কাতারের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে হারতে হয়েছে বাংলাদেশ। চাপে তারা।

জিততে মরিয়া দুই দেশ। ভারতীয় কোচ ইগর স্টিমাচ বলেন, বাংলাদেশকে দুর্বল ভাবার কোনও কারণ নেই। পিছিয়ে থাকলেও, কিন্তু কড়া টক্কর দেবে বাংলাদেশ। তবে যাঁর দিকে সব থেকে নজর থাকবে, সেই সুনীল ছেত্রী বলেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গোল নয়, তিন পয়েন্টই মূল লক্ষ্য।

ফুটবল সমীকরণ বাদেও থাকে আরও কিছু অন্যদিক। ১৯৮৫ সালের বাংলাদেশ তখন টালমাটাল পরিস্থিতি। খুন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রপতি জিয়া উর রহমানের পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার দখল নিলেন হুসেন মহম্মদ এরশাদ। শুরু হল সামরিক শাসন। দমবন্ধকর পরিস্থিতি। পরে এরশাদই তাঁর দল জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। সেই এক নায়ক শাসকের প্রয়াণ হয়েছে সম্প্রতি।

‘৮৫ সালের সময় মানে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে জয়ী ভারতের দাপট শুরু হয়েছে। তবে পশ্চিমবাংলায় তখনও ফুটবলের রমরমা। মরশুমের সময় দল বদলের কেরামতিতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহমেডানের চমক নিয়ে খবরের কাগজের পাতায় পাতায় চমক। পাড়ায় পাড়ায় গলি মহল্লায় আলোচনা।

ফুটবল আলোচনা তখনও বাংলাদেশে জমজমাট। ঢাকার লিগে উত্থান পতন নিয়েও চলে চর্চা। ‘ঢাকা মোহামেডান’ এর খেলা থাকলে তো কথাই নেই। আসলে বাঙালি মানেই ফুটবল আবেগ।

পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ক্রমে ফুটবলের স্থানে দখল নিতে শুরু করে ক্রিকেট উন্মাদনা।বাংলাদেশ উঠে আসতে থাকে দ্রুত। এখন তো দুই দেশের মধ্যে ক্রিকেট মানেই মন্তব্যের ঝড়।

এসব ছড়িয়েই মঙ্গলের সন্ধে নামবে যুব ভারতীতে। অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপের ম্যাচ গরিমায় গর্বিত গ্যালারি-মাঠ গমগম করবে ব্লু টাইগার্স বনাম বেঙ্গল টাইগার্সের লড়াইয়ে।